জামিল দেহলভী: এক বৈশ্বিক চলচ্চিত্রকারের শৈল্পিক ও রাজনৈতিক মহাকাব্য

অর্ক চৌধুরী | সোমবার , ২০ এপ্রিল, ২০২৬ at ৬:১১ পূর্বাহ্ণ

পর্ব ১

বিংশ শতাব্দীর বিশ্ব চলচ্চিত্রে যে কজন নির্মাতা নিজের স্বকীয়তা, রাজনৈতিক সাহস এবং আধ্যাত্মিক গভীরতার মাধ্যমে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছেন, জামিল দেহলভী তাদের মধ্যে অগ্রগণ্য। একজন পাকিস্তানিফরাসি চলচ্চিত্রকার হিসেবে তার পরিচয় কেবল একটি ভৌগোলিক সীমারেখায় আবদ্ধ নয়, বরং তার কাজের পরিধি এশিয়া থেকে ইউরোপ এবং আমেরিকা পর্যন্ত বিস্তৃত। দেহলভীর চলচ্চিত্রগুলো কেবল দৃশ্যমান জগতের গল্প বলে না, বরং তা মানুষের অবচেতন মন, ধর্মীয় রহস্যবাদ, জরাথুস্ট্রীয় ঐতিহ্য এবং উত্তরঔপনিবেশিক রাজনৈতিক অস্থিরতার এক জটিল বুনন। তার এই দীর্ঘ শৈল্পিক অভিযাত্রায় তিনি বারবার রাষ্ট্রের সেন্সরশিপের মুখোমুখি হয়েছেন, নির্বাসিত হয়েছেন, কিন্তু তার সৃজনশীল সত্তা কখনো আপস করেনি ।

প্রারম্ভিক জীবন এবং শিক্ষার পটভূমি: এক পলিগ্লট বিশ্ব নাগরিকের উত্থান

১৯৪৪ সালে ব্রিটিশ ভারতের কলকাতায় এক প্রভাবশালী ও বিদগ্ধ পরিবারে জামিল দেহলভীর জন্ম । তার পারিবারিক কাঠামোই ছিল বৈচিত্র্যের এক অনন্য উদাহরণ। তার পিতা ছিলেন একজন পশতুনভারতীয় বংশোদ্ভূত কূটনৈতিক, যিনি দেশভাগের পর পাকিস্তান সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। অন্যদিকে তার মাতা ছিলেন ফরাসি বংশোদ্ভূত। এই দ্বৈত ঐতিহ্য এবং পিতার কূটনৈতিক পেশার কারণে দেহলভীর শৈশব ও কৈশোর অতিবাহিত হয়েছে এশিয়া এবং ইউরোপের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক বলয়ে। তিনি কেবল একজন দর্শক হিসেবে নয়, বরং একজন সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হিসেবে বিভিন্ন ভাষা ও জীবনবোধকে ধারণ করেছেন। জামিল দেহলভী মূলত একজন পলিগ্লট, যিনি ইংরেজি, ফরাসি, ইতালীয়, স্প্যানিশ এবং উর্দুএই পাঁচটি ভাষায় সমানভাবে পারদর্শী ।

তার প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় করাচি গ্রামার স্কুলে, যা পাকিস্তানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। পরবর্তীতে পিতার কর্মস্থলের পরিবর্তনের সাথে সাথে তিনি প্যারিস এবং রোমের আন্তর্জাতিক স্কুলগুলোতে পড়াশোনা করেন। এই প্রবাস জীবন তাকে বিশ্ব চলচ্চিত্রের ধ্রুপদী ধারা এবং ইউরোপীয় শিল্পকলার সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ইংল্যান্ডের স্বনামধন্য রাগবি স্কুলে ভর্তি হন এবং পরবর্তীতে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ফরাসি সাহিত্যে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তার শিক্ষার এই স্তরটি ছিল রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তি তৈরির সময়। এরপর তিনি আইনশাস্ত্রের প্রতি আগ্রহী হন এবং অক্সফোর্ড থেকেই জুরিসপ্রুডেন্সে সম্মানসহ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন । লন্ডনের ঐতিহ্যবাহী লিঙ্কন’স ইন থেকে তিনি ব্যারিস্টারঅ্যাটল হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন। তবে আইনি পেশার ধরাবাঁধা জীবন তাকে টানেনি; তার ভেতরকার শিল্পীসত্তা তাকে ক্রমাগত চিত্রকল্পের জগতের দিকে প্ররোচিত করছিল ।

ব্যারিস্টারি পেশা ত্যাগ করে দেহলভী চলচ্চিত্রের উচ্চতর শিক্ষার জন্য নিউ ইয়র্কের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পাড়ি জমান। সেখানে তিনি তিন বছর ব্যাপী নিবিড় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে চলচ্চিত্র পরিচালনায় মাস্টার অফ ফাইন আর্টস (MFA) ডিগ্রি অর্জন করেন । কলাম্বিয়ায় অধ্যয়নকালে তিনি কেবল কারিগরি শিক্ষাই গ্রহণ করেননি, বরং কিংবদন্তি অভিনয় প্রশিক্ষক স্টেলা অ্যাডলারের অধীনে অভিনয়ের পাঠ গ্রহণ করেন। এই শিক্ষা তার পরবর্তী চলচ্চিত্রগুলোতে অভিনেতাদের কাছ থেকে সূক্ষ্ম কাজ বের করে আনতে এবং নিজেও পর্দায় বলিষ্ঠ উপস্থিতি নিশ্চিত করতে সহায়ক হয়েছিল।

চলচ্চিত্রের শৈলী এবং মূল দর্শন: ইমেজের রাজত্ব ও আধ্যাত্মিক রহস্যবাদ

জামিল দেহলভীর চলচ্চিত্র নির্মাণশৈলী অত্যন্ত প্রতীকী এবং দৃশ্যনির্ভর। তিনি বিশ্বাস করেন যে চলচ্চিত্র মূলত দৃশ্য বা চিত্রকল্পের মাধ্যম, শব্দের নয় । তার কাজে প্রায়শই ব্যক্তিগত অনুভূতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আধ্যাত্মিক রহস্যের এক জটিল সংমিশ্রণ লক্ষ্য করা যায়। তার শৈল্পিক চেতনায় জরাথুস্ট্রীয় ঐতিহ্য, ইসলামী সুফিবাদ এবং পাকিস্তানি রাজনীতির গভীর প্রভাব স্পষ্ট । দেহলভী একজন ‘গেরিলা চলচ্চিত্রকার’ হিসেবে নিজেকে সংজ্ঞায়িত করেন, কারণ তিনি জানেন কীভাবে সীমিত বাজেটের মধ্যে কাজ করেও একটি চলচ্চিত্রকে বৈশ্বিক মানদণ্ডে বিশাল করে তোলা যায় ।

তার চলচ্চিত্রগুলোতে প্রায়শই ধর্মের দৃশ্যমান দিকগুলোকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। দেহলভীর মতে, ধর্ম অত্যন্ত চিত্রানুগ একটি বিষয় এবং তিনি সেইসব চিত্রকল্প ব্যবহার করে মানব জীবনের গূঢ় সত্যগুলো অনুসন্ধান করেন । তার প্রাথমিক চলচ্চিত্রগুলোতে গল্পের কাঠামোর চেয়ে দৃশ্যের শক্তির ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছে, যা দর্শকদের এক ধরনের পরাবাস্তব অভিজ্ঞতার মুখোমুখি দাঁড় করায় । তার কাজগুলোতে সহিংসতার নিষ্ঠুরতা যেমন প্রদর্শিত হয়, তেমনি আধ্যাত্মিক ও লৈঙ্গিক রাজনীতির সূক্ষ্ম দিকগুলোও ফুটে ওঠে।

প্রাথমিক কর্মজীবন ও ছাত্রাবস্থার অর্জন

কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালেই দেহলভীর মেধার স্বাক্ষর পাওয়া যায়। তার থিসিস চলচ্চিত্র The Guitarist‘ (১৯৭৩) আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে। এই স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রটি আটলান্টা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে স্বর্ণপদক এবং কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের অপেশাদার বিভাগে রৌপ্য পদক জয় করে। এটি ছিল তার দীর্ঘ ও সফল চলচ্চিত্র জীবনের প্রথম স্বীকৃত পদক্ষেপ।

এরপর ১৯৭৫ সালে তিনি নির্মাণ করেন তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র Towers of Silence। এটি ছিল একটি পরীক্ষামূলক ও পরাবাস্তবধর্মী কাজ, যা করাচি এবং নিউ ইয়র্কে চিত্রায়িত হয়েছিল । চলচ্চিত্রটির নাম নেওয়া হয়েছে জরাথুস্ট্রীয় সৎকার পদ্ধতির নামানুসারে, যেখানে মৃতদেহগুলোকে উঁচুতে রাখা হয় যাতে শকুনরা তা খেয়ে হাড় পরিষ্কার করতে পারে । এই চলচ্চিত্রে একজন পশ্চিমা নারীর সাথে একজন নিহত বিপ্লবীর সম্পর্কের মধ্য দিয়ে ধর্মীয় রীতি, স্মৃতি এবং আত্মপরিচয়ের সংকটকে তুলে ধরা হয়েছে । এটি ফেস্টিভ্যাল অফ দ্য আমেরিকাসে গ্র্যান্ড প্রাইজ লাভ করে, কিন্তু এর সাহসী ও ভিন্নধর্মী বিষয়বস্তুর কারণে পাকিস্তানে কখনো বাণিজ্যিকভাবে মুক্তি পায়নি ।

​‘দ্য ব্লাড অফ হুসাইন’: এক রাজনৈতিক মহাকাব্য ও নিষেধাজ্ঞার ইতিহাস

১৯৮০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘The Blood of Hussain’ জামিল দেহলভীর ক্যারিয়াারের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও বিতর্কিত কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়। এই চলচ্চিত্রটি ছিল সমসাময়িক পাকিস্তানি রাজনীতির এক তীক্ষ্ম সমালোচনা এবং রূপক ধর্মীয় উপস্থাপনা। এতে সপ্তম শতাব্দীর কারবালার যুদ্ধের প্রেক্ষাপটকে ১৯৭০এর দশকের পাকিস্তানের একটি গ্রামীণ জনপদে স্থাপন করা হয়েছে। গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে দুই ভাইসেলিম এবং হুসাইন। সেলিম একজন পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যাংকার যে তৎকালীন স্বৈরাচারী সামরিক সরকারের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখে, অন্যদিকে হুসাইন একজন ধার্মিক কৃষক যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ডাক দেয়।

চলচ্চিত্রটি নির্মাণের সময়কাল ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। শুটিং চলাকালীন পাকিস্তানে জেনারেল জিয়াউলহকের সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে এবং জুলফিকার আলী ভুট্টোর সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। দেহলভী এই চলচ্চিত্রে যে সামরিক স্বৈরতন্ত্রের চিত্র এঁকেছিলেন, তা অবিশ্বাস্যভাবে বাস্তবতায় রূপ নেয় । জিয়া সরকার এই চলচ্চিত্রটিকে সামরিক বাহিনী বিরোধী এবং জনমনে বিদ্রোহ উসকে দেওয়ার আশঙ্কায় নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। দেহলভী তার চলচ্চিত্রের মূল নেগেটিভ রক্ষা করতে পাকিস্তান থেকে লন্ডনে পালিয়ে যান এবং সেখানেই সম্পাদনা সম্পন্ন করেন । কান চলচ্চিত্র উৎসবের ‘Director’s Fortnightএ চলচ্চিত্রটি প্রদর্শিত হয় এবং আন্তর্জাতিক সমালোচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে । আজও এটি পাকিস্তানি চলচ্চিত্রের ইতিহাসের এক অমর দলিল হিসেবে পরিগণিত হয়, যা রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে শৈল্পিক প্রতিরোধের প্রতীক। চলচ্চিত্রটি পরবর্তীতে টাওরমিনা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে গ্র্যান্ড প্রাইজ লাভ করে।

​‘বর্ন অফ ফায়ার’ ও ‘কাফ’: ইসলামী রহস্যবাদ এবং প্রকৃতির রুদ্রমূর্তি

১৯৮৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘Born of Fire’ দেহলভীর আর একটি কালজয়ী সৃষ্টি। একে অনেক সমালোচক ‘ইসলামী হরর চলচ্চিত্র’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যদিও দেহলভী একে একটি অন্ধকার রূপকথার মতো করে নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন । চলচ্চিত্রটির কাহিনী আবর্তিত হয়েছে পল বার্গসন নামক একজন ব্রিটিশ বংশীবাদককে ঘিরে, যে তার পিতার রহস্যময় মৃত্যুর তদন্ত করতে তুরস্কের আনাতোলিয়ায় যায় । সেখানে সে মুখোমুখি হয় ‘মাস্টার মিউজিশিয়ান’এর, যে আসলে ইসলামী ঐতিহ্য অনুযায়ী ইবলিস বা শয়তানের প্রতীক। পলকে তার বাঁশির সুরের মাধ্যমে ইবলিসকে পরাজিত করতে হয় এবং পৃথিবীকে আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত ও ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে হয় ।

তুরস্কের পামুক্কালের অসাধারণ প্রাকৃতিক দৃশ্য এবং গুহাগুলোতে চিত্রায়িত এই চলচ্চিত্রটি দৃশ্যগতভাবে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এতে ইসলামী সুফিবাদ এবং জরাথুস্ট্রীয় প্রভাবে মানুষের আধ্যাত্মিক সংগ্রামের চিত্র ফুটে উঠেছে। এই চলচ্চিত্র নির্মাণের সময় দেহলভী আগ্নেয়গিরির যে অভাবনীয় দৃশ্যগুলো ধারণ করেছিলেন, তা নিয়ে তিনি ‘Qaf – The Sacred Mountain ‘ (১৯৮৪) নামক একটি স্বতন্ত্র তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন । এটি প্রকৃতির রুদ্ররূপ এবং মানুষের আত্মার মধ্যকার সম্পর্কের এক দীর্ঘ ধ্যানমগ্ন চিত্র। এটি বিশ্বের পাঁচটি প্রধান পরিবেশগত চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কৃত হয় ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধচট্টগ্রামের বিয়ে; ঐতিহ্য, আবেগ ও বাস্তবতার এক মেলবন্ধন