‘ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়’। অনেকটা এ প্রবাদ বাক্যের মতোই অবস্থা চট্টগ্রাম শহরের বাসিন্দাদের। বিশেষ করে বর্ষাকালে। কারণ প্রতি বর্ষায় ভারী বৃষ্টি হলে জলাবদ্ধতার তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন নগরবাসী। এ বছর ঋতুচক্রে বর্ষা আসার আগেই গত এপ্রিল মাসে প্রবর্তক মোড়সহ কয়েক জায়গায় তীব্র জলাবদ্ধতা হয়। এরপর বিভিন্ন সময়ে হালকা বৃষ্টিতেও ডুবেছে কাতালগঞ্জ।
এমন পরিস্থিতিতে প্রকৃতিতে বর্ষা আসলরূপে হাজির হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে আবহাওয়া অফিস। তাই দেখে নগরবাসীর প্রশ্ন, এ মৌসুমে কি জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ পোহাতে হবে?
নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে ১৪ হাজার ২৭৭ কোটি টাকায় তিন সংস্থার চারটি প্রকল্পের কাজ চলছে। প্রকল্প–সংশ্লিষ্টরা নগরবাসীকে আশ্বস্ত করে দাবি করেছেন, এবার জলাবদ্ধতায় ভুগতে হবে না নগরবাসীকে।
জানা গেছে, জলাবদ্ধতা নিরসনে চলমান প্রকল্পগুলোর মধ্যে মেগা প্রকল্প খ্যাত ৮ হাজার ৬২৬ কোটি ৬২ লাখ টাকা ব্যয়ে সিডিএর ‘চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। প্রকল্পটির কাজ ইতোমধ্যে ৯৫ শতাংশ শেষ হয়েছে। শেষ হয়েছে প্রকল্পভুক্ত ৩৬ খালের মধ্যে ৩০টির শতভাগ ও চারটি খালের ৯৮ শতাংশ কাজ। এছাড়া হিজড়া খালের ৫২ শতাংশ ও জামালখান খালের কাজ শেষ হয়েছে ৮০ শতাংশ। প্রকল্পটির মেয়াদ ছিল গত ৩০ জুন পর্যন্ত। অবশ্য ২৩ জুন প্রকল্পের মেয়াদ ২ বছর বৃদ্ধির প্রস্তাবসহ ৪০ কোটি টাকা ব্যয় কমিয়ে প্রকল্পটি সংশোধনের জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়। চলতি ২০২৬–২০২৭ অর্থবছরে প্রস্তাবিত বাজেটে প্রকল্পটির জন্য ৭৭৭ কোটি ৯৩ লাখ ৩৩ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। গত অর্থবছরে বরাদ্দ দেওয়া হয় ৯৬০ কোটি টাকা ৮২ লাখ টাকা।
৩৬ খাল ও ৬৩১ ড্রেন পরিষ্কার করছে চসিক : জলাবদ্ধতা নিরসনে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) একটি প্রকল্প আছে। ১ হাজার ৩৬২ কোটি টাকার প্রকল্পটির কাজও শেষ পর্যায়ে। এছাড়া চসিক চলতি বর্ষা মৌসুমে নগরবাসীকে জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ থেকে মুক্তি দিতে সিডিএর প্রকল্পের বাইরে থাকা ৩৬টি খাল থেকে মাটি উত্তোলন কাজ শুরু করেছে গত মাসে। এছাড়া পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে ৪১ ওয়ার্ডের ৬৩১টি ড্রেনও পরিষ্কার করছে।
খালগুলো হচ্ছে ঘোষাল শাহ ছড়া, খাগড়িয়া ছড়া, ডোলা মিয়া ছড়া, বীরজা ডাইভারশন খাল, বাংলা বাজার খাল, সুরজী খাল–১, সুরজী খাল–২, সুরজী খাল–৩, অনন্যা আবাসিক খাল–১, অনন্যা আবাসিক খাল–২, দুম্লা খাল, গুলজার খাল, বড়পোল রেলওয়ে খাল–১, বড়পোল রেলওয়ে খাল–২, নাজির খাল–১, নাজির খাল–২, শাহের পাড়া খাল, সাগরিকা খাল, শহীদ নগর খাল, চেরাগ আলী খাল, ছত্তার খাল, নাসির খালের সেকেন্ডারি অংশ–১, নাসির খালের সেকেন্ডারি অংশ–২, বীরজা খালের সেকেন্ডারি অংশ, ইকবাল খাল, মাইটাইল্যা খাল–১, মাইটাইল্যা খাল–২, কৃষি খাল, রসুলবাগ খাল–১, রসুলবাগ খাল–২, সদর খাল, সুন্নিয়া খাল, ডোম খাল (সিডিএর প্রকল্প বহির্ভূত অংশ), চশমা খাল (সিডিএর প্রকল্প বহির্ভূত অংশ), শমসের পাড়া খাল, পূর্ব হোসেন আহমেদ পাড়া খাল, মুসলিমাবাদ জেলে পাড়া খাল, হালিশহর আনন্দবাজার জেলে খাল, বঙ কালভার্টসহ ধুরিয়া পাড়া খাল ও বিভিন্ন ওয়ার্ডের আন্ডারগ্রাউন্ড বঙ কালভার্টসহ খাল।
এ বিষয়ে সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন আজাদীকে বলেন, খাল পরিষ্কারসহ নানা উদ্যোগের ফলে গত বছর নগরবাসী জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পেয়েছে। এ বছর প্রবর্তক মোড় ছাড়া অন্য কোথাও জলাবদ্ধতা হয়নি। আশা করছি সামনেও নগরবাসী জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পাবেন। তিনি বলেন, সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে সিডিএর প্রকল্পের বাইরে থাকা খালগুলো এবং ড্রেন পরিষ্কার করার কাজ চলছে। অক্টোবর মাস পর্যন্ত বর্ষা মৌসুম ধরে আগামী চার মাস কাজ চলতে থাকবে।
তিনি বলেন, খাল–নালা একবার পরিষ্কার করার পর সেটা আবারও ভরাট হয়ে যায়। খালগুলো একবার পরিষ্কার করলে হবে না। মানুষজন বর্জ্য ফেলে, খালগুলো পলিতে ভরাট হয়ে যায়। সুতরাং খাল–নালা পরিষ্কার কার্যক্রম চলতে থাকবে। মেয়র বলেন, আমাদের পরিচ্ছন্নকর্মীরা তো পরিষ্কার করছেন। সাথে স্বেচ্ছাসেবী কোনো সংগঠন বা রাজনৈতিক দল যদি আগ্রহী থাকে তারাও পরিষ্কার করতে পারে।
কী বলছেন মেগা প্রকল্পের পরিচালক : জলাবদ্ধতা নিরসনে চলমান মেগা প্রকল্পের পরিচালক ও সিডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী আহম্মদ মঈনুদ্দিন আজাদীকে বলেন, প্রকল্পের মেয়াদ দুই বছর বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়। যদিও প্রকল্পের কাজ শেষ করতে দুই বছর লাগবে না। বর্তমানে কাজ বন্ধ আছে। আগামী অক্টোবর–নভেম্বর মাসে শুরু করলে জানুয়ারিতে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়ে যাবে। ভূমি অধিগ্রহণের টাকা দেওয়ার কিছু কাজ বাকি থাকবে সেজন্য অতিরিক্ত এক বছর মেয়াদের প্রস্তাব করেছি।
প্রকল্পের কাজ কতটুকু শেষ হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ৯৫ শতাংশ শেষ হয়েছে। প্রকল্পভুক্ত সবগুলো খাল পরিষ্কার আছে। কোনো খালে বাঁধ নেই। তাই বৃষ্টি হলে কোথাও পানি জমে থাকার রিস্ক নেই। শুধু কাতালগঞ্জ–কাপাসগোলায় কিছুটা রিস্ক আছে। যেহেতু হিজড়া খাল আমরা বড় করতে পারিনি। তারপরও সেখানে যাতে কোনো সমস্যা না হয় সেজন্য পাম্পসহ লোকজন প্রস্তুত রেখেছি। সেখানে কয়েকদিন আগে বৃষ্টিতে একটু পানি জমেছিল, সেটা আমরা ১০ মিনিটের মধ্যে ক্লিয়ার করে দিয়েছি।
তিনি জানান, কাতালগঞ্জে হিজড়া খালের প্রস্থ আছে ১০–১১ ফুট। সেটা করা হবে ২৪ ফুট। ২৪ ফুট দিয়ে যে পরিমাণ পানি প্রবাহিত হবে তা ১১ ফুট দিয়ে হবে না। মূলত সে কারণে সেখানে একটু পানি জমে। তিনি জানান, বর্ষায় জলাবদ্ধতার স্পটগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত সমাধানে গতবারের ন্যায় এবারও পুরো শহরকে ১৬টি কিউআরএফের (কুইক রিঅ্যাকশন ফোর্স) অধীন ভাগ করা হয়। যেখানে পানি বাধাগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে বা বাধাগ্রস্ত হওয়ার খবর আসে সেখানে এ টিমের শ্রমিকরা দ্রত পৌঁছে পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক করে দেয়।










