জনমত উপেক্ষা করে এনসিটি সিসিটি ইজারা জনগণ মেনে নেবে না

চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা কমিটির গোলটেবিল বৈঠক, ধারণাপত্র উপস্থাপন

আজাদী প্রতিবেদন | বুধবার , ৮ জুলাই, ২০২৬ at ১০:৪২ পূর্বাহ্ণ

জনমত উপেক্ষা করে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কন্টেনার টার্মিনাল (এনসিটি) ও চট্টগ্রাম কন্টেনার টার্মিনাল (সিসিটি) কোনো দেশি বা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের, বিশেষ করে ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে কনসেশন মডেলে ইজারা দেওয়া হলে বাংলাদেশের জনগণ তা কখনো মেনে নেবে না। বাংলার জনগণ এমন চুক্তি বাস্তবায়ন হতে দেবে না।

গতকাল মঙ্গলবার সকালে নগরীর একটি হোটেলে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা কমিটি আয়োজিত ‘চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটিসিসিটি ইজারা : বাংলাদেশের অর্থনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। বন্দর রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক ইঞ্জিনিয়ার দেলোয়ার মজুমদারের সভাপতিত্বে ও সঞ্চালনায় বৈঠকে ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন সংগঠনের সদস্য সচিব ফজলুল কবির মিন্টু। বক্তব্য দেন কবি ও সাংবাদিক আবুল মোমেন, প্রকৌশলী সুভাষ চন্দ্র বড়ুয়া, সিপিবির সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ শাহ আলম, সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, টিইউসি চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সভাপতি তপন দত্ত, জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সভাপতি এ এম নাজিম উদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহার, অশোক সাহা, ডক জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক তসলিম হোসেন সেলিম, অধ্যাপক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, নারীনেত্রী জেসমিন সুলতানা পারু, প্রকৌশলী শহীদুল আলম, সাইফুদ্দিন খালেদ চৌধুরী এবং সিনিয়র সাংবাদিক জসিম চৌধুরী সবুজ।

ধারণাপত্রে উল্লেখ করা হয়, এনসিটি ও সিসিটি জনগণের টাকায় নির্মিত জাতীয় সম্পদ। বিদেশি অর্থায়নে নির্মিত নয় এবং দেশীয় জনবল বহু বছর ধরে সফলভাবে আন্তর্জাতিক মানে পরিচালনা করে আসছে। তাহলে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে এগুলোর পরিচালনার দায়িত্ব তুলে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা কোথায়, সরকার এখনো তার গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিতে পারেনি।

এনসিটির নকশাগত সক্ষমতা প্রায় ১১ লাখ টিইইউস হলেও বর্তমানে বছরে প্রায় ১৩ লাখ টিইইউস কন্টেনার হ্যান্ডলিং করা হচ্ছে। ২০২৬ সালের মে মাসে এক মাসেই প্রায় ১ লাখ ২৬ হাজার টিইইউস কন্টেনার হ্যান্ডলিংয়ের নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। এসব তথ্য প্রমাণ করে, দেশীয় ব্যবস্থাপনা দক্ষতার সঙ্গে বন্দর পরিচালনা করতে সক্ষম। বিদেশি অপারেটর ছাড়া বন্দর চলবে নাএ ধরনের প্রচারণা তথ্যভিত্তিক নয়।

বর্তমানে এনসিটি দেশের সবচেয়ে আধুনিক ও যান্ত্রিকীকৃত কন্টেনার টার্মিনাল উল্লেখ করে বলা হয়, অধিকাংশ গ্যান্ট্রি ক্রেন, আরটিজি ও অন্যান্য যন্ত্রপাতির বয়স মাত্র চার থেকে পাঁচ বছর। ফলে বাংলাদেশ যে বিপুল বিনিয়োগ করেছে, তার সুফল বিদেশি অপারেটরের হাতে তুলে দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই।

ধারণাপত্রে বলা হয়, কনসেশন মডেলের মাধ্যমে রাষ্ট্রের মালিকানা কাগজেকলমে বহাল থাকলেও বাস্তবে পরিচালনা, বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত, ট্যারিফ নির্ধারণ এবং অপারেশনাল নিয়ন্ত্রণের বড় অংশ বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে যেতে পারে। এতে রাষ্ট্রের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এতে আরো বলা হয়, বর্তমানে বন্দরের উদ্বৃত্ত আয় রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হলেও কনসেশন মডেলে পরিচালন মুনাফার বড় অংশ ব্যবস্থাপনা ফি, রয়্যালটি ও লভ্যাংশের নামে বিদেশে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে প্রযুক্তি, সম্প্রসারণ ও পরিচালনায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়বে।

ধারণাপত্রে অভিযোগ করা হয়, চূড়ান্ত চুক্তি হওয়ার আগেই কন্টেনার হ্যান্ডলিং চার্জ প্রায় ৩৭ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে, যার চাপ আমদানিকারক, রপ্তানিকারক, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার ওপর পড়ছে। অথচ লাভজনকভাবে পরিচালিত একটি টার্মিনালে এই মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিকতা সরকার জনগণের সামনে ব্যাখ্যা করতে পারেনি।

জাতীয় নিরাপত্তার প্রসঙ্গ তুলে বলা হয়, চট্টগ্রাম বন্দরকে ঘিরে নৌবাহিনীর ঘাঁটি, বিমান বাহিনীর স্থাপনা, ইস্টার্ন রিফাইনারি, জ্বালানি সংরক্ষণাগারসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত স্থাপনাগুলো অবস্থিত। ফলে এনসিটি ও সিসিটির দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা শুধু অর্থনৈতিক নয়, জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নও উত্থাপন করে।

সভায় কবি ও সাংবাদিক আবুল মোমেন বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র এবং প্রায় দেড় হাজার বছরের ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের ধারক। বন্দরের মতো কৌশলগত জাতীয় সম্পদ নিয়ে আবেগ বা তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নয়। আগামী ৫০ বছর দেশের অর্থনীতি ও জাতীয় স্বার্থে এর প্রভাব কী হবে, তা গভীরভাবে মূল্যায়ন করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, জনমতের বিরুদ্ধে গিয়ে এনসিটিসিসিটি ইজারা দেওয়ার ষড়যন্ত্রে যারা জড়িত, তারা যেন অতীতের রাজনৈতিক পরিণতি থেকে শিক্ষা নেয়। জনগণের মতামত উপেক্ষা করে রাষ্ট্রীয় সম্পদ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। বক্তারা অবিলম্বে এনসিটিসিসিটি সংক্রান্ত সব তথ্য প্রকাশ, স্বাধীন অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা ও আইনগত মূল্যায়ন, সংসদীয় আলোচনা ও জনপরামর্শ ছাড়া কোনো দীর্ঘমেয়াদি কনসেশন চুক্তি না করার দাবি জানান। একই সঙ্গে দেশীয় ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা আরো উন্নত করতে আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ বৃদ্ধির আহ্বান জানিয়ে তারা বলেন, বিদেশি কারিগরি সহযোগিতা নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালন নিয়ন্ত্রণ কোনোভাবেই রাষ্ট্রের হাতছাড়া করা যাবে না। সভা থেকে বক্তারা স্পষ্ট ঘোষণা দেন, চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের অর্থনীতির হৃদস্পন্দন। এই বন্দর কোনো কর্পোরেট স্বার্থ বা বিদেশি নিয়ন্ত্রণের পরীক্ষাগার হতে পারে না। জাতীয় স্বার্থবিরোধী কোনো ইজারা চুক্তি জনগণ মেনে নেবে না এবং প্রয়োজন হলে সর্বস্তরের জনগণকে সঙ্গে নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলনের মাধ্যমে তা প্রতিহত করা হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধমীরসরাইয়ে পরিত্যক্ত কারখানায় যুবকের মরদেহ
পরবর্তী নিবন্ধএসএসসি-৮৫ চট্টগ্রামের নতুন কার্যকরী কমিটি গঠন