স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে চ্যালেঞ্জ করার মতো, হামলা করার মতো দুঃসাহস যারা দেখিয়েছে, তাদের আশ্রয়স্থল কোথায় তা দেখতে চাই। তাদের সর্বশেষ আস্তানাও আমরা নির্মূল করব। গতকাল রোববার নগরীর সার্কিট হাউজের সম্মেলন কক্ষে স্থানীয় সংসদ সদস্য, সিটি মেয়র ও ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তাদের সাথে মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে, কার্যকরভাবে এবং জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী। সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য যেখানেই থাকুক না কেন, নির্মূল করতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন, রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করার মতো যে দুঃসাহস সন্ত্রাসীরা দেখিয়েছে, সেটাকে আমরা যথাযথভাবে অ্যাড্রেস করব। সলিমপুর, জঙ্গল সলিমপুর, আলীনগর, এই টোটাল এলাকায় এবং চারপাশের যে সমস্ত জায়গা আছে, এগুলোর রুট নেটওয়ার্ক আমাদেরকে এস্টাবলিশ করতে হবে। এখানের বাসিন্দা, যেকোনোভাবেই হোক যারা এখানে আশ্রয় নিয়েছিল, তাদের জন্য আমরা পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করব, তাদের কাউকেই উচ্ছেদ করা হবে না। মন্ত্রী বলেন, আমরা এখানে (জঙ্গল সলিমপুর) সরকারি যে সমস্ত স্থাপনা করতে চাই, যে সমস্ত একাডেমি করতে চাই, সেগুলোর জন্য জায়গা নির্ধারণ করার জন্য আজকে ম্যাপ নিয়ে সমস্ত ডিপার্টমেন্টের হেডদের সাথে আলোচনা করেছি। এগুলো বাস্তবায়ন কীভাবে করা হবে, সেটা আমরা পরীক্ষা–নিরীক্ষা করে দেখেছি। আমরা প্রাথমিকভাবে এখানে চট্টগ্রামের জেলখানা যে স্থানান্তর হওয়ার কথা, লিং রোডের পাশে, সেই জায়গাটা আমরা দেখেছি এবং আরো প্র্যাক্টিক্যালি ভিজিট করার জন্য সমস্ত কর্মকর্তা এখন যাবেন। এখানে কাউকে ডিস্টার্ব করা হবে না, কোনো বসতি উচ্ছেদ করা হবে না। কিন্তু এই কারাগারের স্থানটা, আমরা আগে নিজেদের দখলে নিয়ে, অতিরিক্ত আইজি প্রিজন তার দখলে নিয়ে পরবর্তী পুনর্বাসনের ব্যবস্থাটা আমরা করব। সেটা জরুরি হয়ে গেছে। অন্যান্য ডিপার্টমেন্টের জন্য কোথায় কী স্থাপন করা যায় এবং কী করতে হবে, সেগুলো আমরা যথাযথ পর্যায় করে নেব। তার আগে আমরা এলাকায় আইন–শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে চেষ্টা করছি এবং শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চাই। আর সন্ত্রাসীরা যেখানেই আশ্রয় নিয়ে থাকুক না কেন, যাদেরই আশ্রয় নিয়ে থাকুক না কেন, সেগুলো সবকিছু আমরা চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব ইনশাআল্লাহ।
সাংবাদিকদের উদ্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আপনারা সবাই সহযোগিতা করবেন। কারণ গণমাধ্যমের বন্ধুরা যদি সহযোগিতা করেন, ইনফরমেশন দেন, তাহলে আমাদের আইন–শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের জন্য সেটা খুব বেশি সহায়ক হবে। আশা করি আপনারা সবাই দেশের কল্যাণের জন্য, আইন–শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের জন্য এবং জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য, নিরাপত্তা বিধানের জন্য সহযোগিতা করবেন।
রাউজানের সন্ত্রাস সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, ফটিকছড়ি, বোয়ালখালী, সবকিছু অ্যাড্রেস করা হবে। এগুলোকে ঘিরে সমন্বিতভাবে প্ল্যান হচ্ছে। এগুলো রাষ্ট্রের বাইরে নাকি? আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দুঃসাহস দেখিয়েছে বলেই তো আজকে এখানে সমস্ত চট্টগ্রামের এবং রাষ্ট্রের সমস্ত শীর্ষ কর্মকর্তারা এসেছেন। রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে চ্যালেঞ্জ করার মতো, হামলা করার মতো দুঃসাহস যারা দেখিয়েছে, তাদের আশ্রয়স্থল কোথায় তা দেখতে চাই এবং তাদের সর্বশেষ আস্তানাও আমরা নির্মূল করব।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গতকাল সকালে সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগর পরিদর্শন করেন। এরপর বিকালে সার্কিট হাউজে উচ্চ পর্যায়ের আইন–শৃঙ্খলা বিষয়ে বৈঠকে বসেন। বৈঠকে ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, চট্টগ্রাম জেলার সংসদ সদস্যগণ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী, আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির, বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহার হোসেন, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. মনিরুজ্জামান, সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা ও পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলমসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
জঙ্গল সলিমপুর পরিদর্শন : সীতাকুণ্ড প্রতিনিধি জানান, জঙ্গল সলিমপুর পরিদর্শন শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় সরকার একটি নতুন কারাগার স্থাপন করবে। তবে এখান থেকে এখনই কাউকে উচ্ছেদ করা হবে না। তিনি বলেন, একটি কুচক্রী মহল সাধারণ মানুষের মাঝে উচ্ছেদের গুজব ছড়াচ্ছে। তবে জঙ্গল সলিমপুর ও এর আশপাশের এলাকাকে অবশ্যই সন্ত্রাসমুক্ত করা হবে। এখানে আর কোনো বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর অভয়ারণ্য থাকবে না। পরিকল্পিত ও যৌথ অভিযানের মাধ্যমে এই এলাকাকে পুরোপুরি সন্ত্রাসমুক্ত করব। পাশাপাশি বেতুয়া ও চা বাগান এলাকায়ও অভিযান চালিয়ে সন্ত্রাসীদের উচ্ছেদ করা হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সারা দেশে মাদক, সন্ত্রাস, জুয়া ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই চারটি অপরাধকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে মোকাবিলা করা হবে এবং এগুলো নির্মূলের চেষ্টা চালানো হবে। জুয়া নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান আইনের সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ১৮৬৭ সালের জুয়া আইনের মাধ্যমে আধুনিক অনলাইন ও অফলাইন জুয়া কিংবা বেটিং কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী সংসদ অধিবেশনে এ সংক্রান্ত আইনি সংস্কার আনার চেষ্টা করা হবে।
মাদক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনের বিষয়ে বলেন, মাদকসংক্রান্ত মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। বর্তমানে হাজার হাজার মাদক মামলা বছরের পর বছর ঝুলে আছে। নতুন আইনি কাঠামোর মাধ্যমে এসব মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে। কিশোর গ্যাংয়ের ক্রমবর্ধমান তৎপরতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিদ্যমান আইনের কিছু সুবিধা ও ফাঁকফোকর ব্যবহার করে অনেক কিশোর অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে এবং পরবর্তীতে তারা সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসীতে পরিণত হচ্ছে। এ কারণে কিশোর অপরাধ মোকাবিলাতেও আইনি সংস্কার আনার প্রয়োজনীয়তার কথা জানান তিনি। তিনি বলেন, আমরা আইনি সংস্কার, পরিকল্পিত অভিযান এবং সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে দেশকে মাদক, সন্ত্রাস, জুয়া ও চাঁদাবাজিমুক্ত করার চেষ্টা করব। এর মাধ্যমেই যুবসমাজকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।
জঙ্গল সলিমপুর পরিদর্শনের সময় মন্ত্রীর সাথে ছিলেন ভূমি প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির, বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী, বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা, র্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিরা।
প্রসঙ্গত, সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগর এলাকার অবস্থান চট্টগ্রাম নগরীর কাছে। ৩ হাজার একরের বেশি আয়তনের এ এলাকায় প্রবেশ করতে হলে নিতে হতো অনুমতি। বিদ্যুৎ বিল থেকে শুরু করে এলাকার মানুষের সবকিছু যুগের পর যুগ নিয়ন্ত্রণ করে আসছিল একটি চক্র। আইন–শৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের লোকদেরও সেখানে নানা সময়ে হামলার শিকার হতে হয়েছে। ১৯ জানুয়ারি র্যাবের একটি দল অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়। এ হামলায় র্যাবের এক সদস্য নিহত হন। এর জেরে রাষ্ট্রের বাহিনীগুলোর যৌথ টিম এলাকাটিতে বড় অভিযান চালায়। অভিযানে অনেককে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর ৯ মার্চ যৌথবাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। ২৪ মে ফের হামলার ঘটনা ঘটে। অস্থায়ী ক্যাম্পটি গুঁড়িয়ে দিতেই সন্ত্রাসীরা এ হামলা পরিচালনা করে। তিন দিক থেকে গুলি ও ককটেল হামলার ঘটনা ঘটানো হয়। এঙকেভেটর দিকে রাস্তা কেটে দেওয়া হয়। পরে যৌথবাহিনীর প্রতিরোধে পিছু হঠে সন্ত্রাসীরা। প্রশাসন থেকে বলা হচ্ছে, এ মামলার পেছনে ইয়াছিন বাহিনী জড়িত।












