ছাত্র আন্দোলনে উত্তাল দিল্লি,মোদির সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ

যন্তর মন্তরে হাজারো শিক্ষার্থী, ওয়াংচুকের অনশন অব্যাহত বন্ধ একাধিক মেট্রো স্টেশন বিরোধীদের সরাসরি সমর্থন, সংসদে আলোচনা করতে প্রস্তুত সরকার

আজাদী ডেস্ক ম | বৃহস্পতিবার , ২৩ জুলাই, ২০২৬ at ৬:৫০ পূর্বাহ্ণ

ভারতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের জন্য অন্যতম বড় রাজনৈতিক সংকটে পরিণত হয়েছে। কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ, প্রশ্নপত্র ফাঁসের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে রাজধানী দিল্লির যন্তর মন্তরে হাজারো শিক্ষার্থীর অবস্থান কর্মসূচি টানা কয়েকদিন ধরে চলছে। আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষাবিদ ও পরিবেশকর্মী সোনাম ওয়াংচুক। একই সময়ে বিরোধী দলগুলোর সরাসরি সমর্থন, সংসদের অচলাবস্থা, পুলিশি অভিযান এবং আদালতের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিক্রিয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে সমপ্রতি গঠিত ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। দলটির দাবি, নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে রাজনৈতিক দায় নিতে হবে এবং শিক্ষাব্যবস্থার দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

অনশন ভাঙছেন না ওয়াংচুক : কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে.পি. নাড্ডা ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং হাসপাতালে গিয়ে সোনাম ওয়াংচুকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তারা ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের পরিবারকে সহায়তা দেওয়া এবং নিট ইস্যু সংসদে আলোচনার আশ্বাস দেন। তবে ওয়াংচুক স্পষ্ট জানিয়েছেন, শুধু আশ্বাসে তিনি অনশন ভাঙবেন না। তার নতুন শর্ত হলো-‘সংসদ চলো’ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ার বিষয়ে সরকারকে সুস্পষ্ট নিশ্চয়তা দিতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের দাবির বাস্তব অগ্রগতি দেখতে চান তিনি।

তিনি আরও বলেন, ৬৫ জন সংসদ সদস্য তার অনশন ভাঙার অনুরোধ জানিয়েছেন। কিন্তু দেশের লাখো শিক্ষার্থীর ন্যায্য দাবির বিষয়ে সরকার কার্যকর সিদ্ধান্ত না নিলে তিনি অনশন চালিয়ে যাবেন।

পুলিশি অভিযানেও থামেনি আন্দোলন : গত সোমবার সংসদ অভিমুখে বিক্ষোভ মিছিলের সময় দিল্লি পুলিশ লাঠিচার্জ, আটক ও বলপ্রয়োগ করে। বহু শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। তবে আন্দোলনকারীদের দাবি, মুক্তি পাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অধিকাংশ শিক্ষার্থী আবার যন্তর মন্তরে ফিরে এসে আন্দোলনে যোগ দেন।

আদালতের ভিন্ন প্রতিক্রিয়া : শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে জরুরি শুনানির আবেদন করা হলেও প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত তা গ্রহণ করেননি। আইনজীবী পুলিশি হামলার ভিডিও আদালতকে দেখানোর আবেদন করলে প্রধান বিচারপতি বলেন, আমাদের ভিডিও দেখার সময় নেই। নিজের সময়ও নষ্ট করবেন না।

অন্যদিকে দিল্লি হাইকোর্ট সরকার ও দিল্লি পুলিশকে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে আন্দোলনের দিনের সিসিটিভি ফুটেজসহ সব প্রমাণ সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে তদন্ত বা বিচারিক প্রক্রিয়ায় সেগুলো ব্যবহার করা যায়।

সরকারের অবস্থান অপরিবর্তিত : কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান এঙে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, সরকার সংসদে নিট ইস্যুতে আলোচনায় প্রস্তুত। তবে তিনি অভিযোগ করেন, কিছু রাজনৈতিক শক্তি শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। একই অবস্থান ব্যক্ত করেছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংও। দিল্লির বিজেপি এমপি বাঁসুরি স্বরাজ দাবি করেন, আন্দোলনকারীদের যথেষ্ট সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অনুমতির সীমা অতিক্রম করে সংসদ ঘেরাওয়ের চেষ্টা করায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও এনডিএ বৈঠকে বলেন, সরকার ভারতের যুবসমাজের আস্থা পুনরুদ্ধার করবে।

এদিকে সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু জানিয়েছেন, সরকার নিট প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে সংসদে আলোচনা করতে প্রস্তুত। তবে বিরোধী দল শর্ত দিয়ে আলোচনা বাধাগ্রস্ত করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

বিরোধীদের চাপ বাড়ছে : কংগ্রেসসহ বিরোধী দলগুলো আন্দোলনের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন জানিয়েছে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাসভবনের সামনে বিক্ষোভে অংশ নেন। পরে পুলিশ তাকে আটক করে। রাহুল দাবি করেন, তাকে সরিয়ে নেওয়ার সময় কয়েকজন পুলিশ সদস্য ফিসফিস করে বলেন, এই সরকারকে সরিয়ে দিন। তিনি আরও অভিযোগ করেন, গত এক দশকে দেশে অন্তত ১৫২টি প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটলেও দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তার ভাষায়, শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের দায়ে ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ করা উচিত।

কংগ্রেসের পাশাপাশি আপ, সিপিআই (এম), সমাজবাদী পার্টি, তৃণমূল কংগ্রেস, আরজেডি ও শিবসেনাসহ বিভিন্ন বিরোধী দলের নেতারা আন্দোলনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন।

খাবার পাঠাচ্ছেন সাধারণ মানুষ : যন্তর মন্তরের আন্দোলনস্থলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাশাপাশি বিদেশ থেকেও সমর্থকেরা অনলাইনে খাবার ও পানীয় পাঠাচ্ছেন। সুইগি, জোম্যাটোসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অর্ডার করা খাবার আন্দোলনকারীদের মধ্যে বিতরণ করছেন ডেলিভারি কর্মীরা। তাদের ভাষ্য, অনেক গ্রাহক শুধু নির্দেশ দিচ্ছেন-‘যাদের প্রয়োজন, তাদের মধ্যে খাবারগুলো বিলিয়ে দিন।’ একাধিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনও নিয়মিত খাবার, পানি ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছে।

নিরাপত্তা জোরদার : পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন দায়িত্বে থাকা কেন্দ্রীয় বাহিনীর ২০ কোম্পানি সিআরপিএফকে দিল্লিতে আনা হয়েছে। একই সঙ্গে লোক কল্যাণ মার্গ, রাজীব চক, কেন্দ্রীয় সচিবালয়, প্যাটেল চক ও রামকৃষ্ণ আশ্রম মার্গসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মেট্রো স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এদিকে দিল্লি পুলিশ আন্দোলন ঘিরে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় অন্তত ১০টি মামলা দায়ের করেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শুরুতে নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদ হিসেবে শুরু হলেও আন্দোলনটি এখন ভারতের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং গণতান্ত্রিক অধিকারএই চারটি ইস্যুকে কেন্দ্র করে জাতীয় রাজনৈতিক আন্দোলনের রূপ নিয়েছে। আন্দোলনে অংশ নেওয়া অধিকাংশ তরুণ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত না হলেও তারা মনে করছেন, বর্তমান শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সংকটের শিকার ভবিষ্যতে তারাও হতে পারেন। তাই এটি কেবল একটি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদ নয়; বরং ভারতের তরুণ সমাজের দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।

বর্তমান পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় সরকার সংসদে আলোচনার কথা বললেও আন্দোলনকারীরা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত রাজপথ না ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন। ফলে নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই আন্দোলন মোদি সরকারের জন্য সামপ্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরীক্ষাগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধহালদার পাড় থেকে মানুষের বিচ্ছিন্ন হাত উদ্ধার
পরবর্তী নিবন্ধলালখান বাজার পোড়া কলোনি এলাকায় পাহাড় ধস