চান্দগাঁওয়ে শিল্পবর্জ্যে কৃষিজমি জলাশয়ের ক্ষতির অভিযোগ

স্বাধীন ও বৈজ্ঞানিক তদন্তের নির্দেশ । ১২ বিষয়ে তদন্ত করতে বলা হলো পরিবেশ অধিদপ্তরকে

হাসান আকবর | সোমবার , ৬ জুলাই, ২০২৬ at ৪:৫৮ পূর্বাহ্ণ

নগরীর চান্দগাঁও থানাধীন মোহরার বাহির সিগন্যালের বিস্তৃত বিল এলাকায় শিল্পকারখানার রাসায়নিক বর্জ্যে কৃষিজমি, জলাশয়, মৎস্যসম্পদ ও জনস্বাস্থ্যের ক্ষতির অভিযোগ স্বাধীন ও বৈজ্ঞানিক তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন চট্টগ্রামের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ও পদাধিকারবলে জাস্টিস অব দ্য পিস এ. জি. এম. মনিরুল হাসান সরকার। আগামী ১১ আগস্টের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করতে পরিবেশ অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ করা হয়েছে, এলাকার হলিডে বিল, ব্রাহ্মণ বিল ও চৌধুরী বিলসংলগ্ন এলাকা ভয়াবহ দূষণের শিকার হচ্ছে। শিল্পবর্জ্য কৃঞ্চখালী হয়ে অনন্যা আবাসিক এলাকার ভিতর দিয়ে কুয়াইশ এবং বাথুয়া খাল হয়ে খন্দকিয়ার পাশ দিয়ে হালদা নদীতে পড়ে পরিবেশ এবং প্রতিবেশের ভয়াবহ দূষণ ঘটাচ্ছে।

চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশে বলা হয়, কুয়াইশচান্দগাঁও কৃষক উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি অরুণ চন্দ্র বণিকের ১৬ জুন দাখিল করা লিখিত অভিযোগ এবং এর সঙ্গে সংযুক্ত গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের নথিপত্র পর্যালোচনায় আদালত বিষয়টিকে কেবল ব্যক্তিগত বিরোধ হিসেবে নয়, বরং পরিবেশ দূষণ, জনস্বাস্থ্য, কৃষিজমি, জলাশয় এবং বৃহত্তর জনস্বার্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি গুরুতর অভিযোগ হিসেবে বিবেচনা করেছেন।

আদেশে উল্লেখ করা হয়, দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় বাসিন্দারা বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে অভিযোগ জানিয়ে এলেও স্থায়ী প্রতিকার পাননি। অভিযোগের সঙ্গে পরিবেশ অধিদপ্তর, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থার চিঠিপত্রও আদালতে দাখিল করা হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, চট্টগ্রাম মহানগরের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাহির সিগন্যাল এলাকায় অবস্থিত রীপ লেদার, মা জনাব পেপার মিল, ফোর এইচ গ্রুপ, রতন প্যাকেজ, একটি মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা, ইত্তেহাব ফ্যাক্টরি, ইছা গোডেন, একটি সিগারেট কারখানাসহ একাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান তাদের বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) যথাযথভাবে পরিচালনা না করে রাসায়নিক তরল বর্জ্য উন্মুক্তভাবে নিষ্কাশন করছে।

আদালতের আদেশে বলা হয়, পূর্বে কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য লোকালয়ে প্রবেশ ঠেকাতে একটি প্রতিরোধক বাঁধ ছিল। তবে সেটি অপসারণ বা কেটে দেওয়ার পর অভিযুক্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর রাসায়নিক বর্জ্য সরাসরি চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) প্রধান ড্রেনেজ ব্যবস্থায় প্রবেশ করে কৃষিজমি, বিল ও জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। এর ফলে ইরি ধানের আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, মাছের খামারে মাছ মারা যাওয়া, জলাশয়ের পানি দূষিত হওয়া, তীব্র দুর্গন্ধ সৃষ্টি, জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বৃদ্ধি এবং কৃষক ও মৎস্যচাষিদের আর্থিক ক্ষতির অভিযোগ উঠেছে।

আদালত প্রাথমিকভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন, অভিযোগে বর্ণিত বিষয়গুলো বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫, বাংলাদেশ পানি আইন, ২০১৩ এবং দণ্ডবিধির একাধিক ধারার অপরাধের উপাদানকে আকৃষ্ট করতে পারে। ফলে জনস্বার্থ, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং আইনের শাসনের স্বার্থে অভিযোগের সত্যতা নিরূপণে সংশ্লিষ্ট বিশেষায়িত কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও বৈজ্ঞানিক তদন্ত প্রয়োজন।

ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ২৫ এবং ধারা ১৯০()(সি)-এর ক্ষমতাবলে জাস্টিস অব দ্য পিস হিসেবে আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে বিষয়টি আমলে নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালককে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। পরিচালককে তার প্রশাসনিক বিবেচনায় উপযুক্ত পদমর্যাদার কর্মকর্তা, প্রয়োজনে উপপরিচালক বা তদূর্ধ্ব কর্মকর্তার নেতৃত্বে কারিগরি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে তদন্ত দল গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আদেশে পরিবেশ অধিদপ্তরকে ১২ দফা বিষয়ে তদন্ত করতে বলা হয়েছে। এর মধ্যে গত তিন বছরে সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত পরিদর্শন করা হয়েছিল কি না, পরিবেশগত ছাড়পত্রের শর্ত মানা হয়েছে কি না, ইটিপি সচল ছিল কি না, শিল্পবর্জ্য কোথায় ফেলা হচ্ছে, সরকারি ড্রেন বা জলাশয়ের সঙ্গে অবৈধ সংযোগ রয়েছে কি না, কৃষিজমি ও মৎস্যসম্পদের ক্ষতির প্রকৃতি, পূর্বে কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না, বর্তমানে দূষণ অব্যাহত আছে কি না এবং জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি কতটা।

একই সঙ্গে সরকার অনুমোদিত পরীক্ষাগারে রাসায়নিক নমুনা পরীক্ষা, পরিবেশ ও কৃষির ক্ষয়ক্ষতির বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন এবং কোন কোন আইন, পরিবেশগত ছাড়পত্রের শর্ত বা প্রশাসনিক নির্দেশনা লঙ্ঘিত হয়েছে, সে বিষয়ে স্বাধীন মতামত দিতে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তদন্তের প্রয়োজনে পরিবেশ অধিদপ্তর প্রয়োজনীয় সরকারি দপ্তর, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও কারিগরি সংস্থার সহযোগিতা নিতে পারবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রয়োজন হলে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের সহযোগিতা নেওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আদালত স্পষ্ট করে বলেছেন, তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ আইন, প্রমাণ ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেবেন। আদালতের এই আদেশ বা পর্যবেক্ষণকে তদন্তের ফলাফল কিংবা পরবর্তী আইনগত সিদ্ধান্তের ওপর কোনো পূর্বনির্ধারিত মতামত হিসেবে গণ্য করা যাবে না। তদন্ত প্রতিবেদন আগামী ১১ আগস্টের মধ্যে আদালতে জমা দিতে হবে। তবে যৌক্তিক কারণে অতিরিক্ত সময়ের প্রয়োজন হলে লিখিত আবেদন করে সময় বৃদ্ধির সুযোগ রাখা হয়েছে।

এদিকে আদালতের এই নির্দেশনার ফলে দীর্ঘদিনের পরিবেশ দূষণ, শিল্পকারখানার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ অধিদপ্তরের তদারকির কার্যকারিতা এবং সরকারি ড্রেনেজ ব্যবস্থাকে শিল্পবর্জ্য নিষ্কাশনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে কি না এসব বিষয়ও তদন্তে নতুন করে সামনে আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মন্তব্য করেছেন। সিটি মেয়র, সিডিএ চেয়ারম্যান, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার এবং পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের পরিচালককে আদেশের অনুলিপি প্রদান করা হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পরিবেশ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেন, আদালতের নির্দেশ এবং নির্দেশনা অনুষায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসালমান শাহ’র লাশ উত্তোলনে ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ
পরবর্তী নিবন্ধজলাবদ্ধতা মোকাবিলায় প্রস্তুতি কতটা