চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলায় সাধারণত হিন্দু, বৌদ্ধ ও মুসলিম জনগোষ্ঠীর বসবাস। তারা প্রতিবছর এই অঞ্চলে বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব পালন করে থাকেন। হিন্দু ধর্মীয়, বৌদ্ধ ধর্মীয় ও ইসলাম ধর্মীয় উৎসবগুলো এই অঞ্চলের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের তাৎপর্যপূর্ণ অংশ। চন্দনাইশে দেশাত্মবোধক ও জাতীয় উৎসব অর্থাৎ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও শহীদ দিবস, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস ও জাতীয় ঐতিহাসিক দিবস (যেমন : ০৭ মার্চ) প্রভৃতিও পালন করা হয়। চন্দনাইশের হিন্দু, বৌদ্ধ ও মুসলমানরা যেসব লোকজ উৎসব পালন করেন, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে মনসা পূজা, পিঠা উৎসব, নবান্ন উৎসব, পহেলা ফাল্গুন, পহেলা বৈশাখ ও বৈসাবি প্রভৃতি। এই অঞ্চলের বিদ্যমান জনগোষ্ঠীর সবধরনের উৎসবের মধ্যে অন্যতম জনপ্রিয় উৎসব হলো পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ পালন।
বাংলা সনের প্রবর্তনের পরে বাংলা নববর্ষ পালনের সূচনা ঘটে। এটাও আকবরের আমলে। তখন চৈত্রের শেষ দিনের মধ্যে জমিদার–তালুকদারদের কাছে বাংলার চাষাদের খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে হতো। তখন বাংলা নববর্ষের প্রকৃত উৎসব বলতে হালখাতাকেও বোঝানো হতো। ব্যবসায়ীরা চৈত্রের শেষ দিনের মধ্যে পুরনো খদ্দেরদের থেকে প্রাপ্য বা বাকি অর্থ বুঝে নিয়ে পুরনো হিসাবের খাতা বন্ধ করে পরদিন পহেলা বৈশাখে হিসাবের নতুন খাতা খুলতেন এবং নতুন–পুরনো খদ্দেরদের মাঝে সেদিন মিষ্টি ও অন্যান্য খাবারদ্রব্য পরিবেশন করতেন। সেদিন জমিদার–তালুকদার–ভূস্বামিরাও নিজ নিজ অঞ্চলের চাষা ও অধিবাসীদের মাঝে একই কাজ করতেন। তাঁরা মেলা ও বিভিন্ন উৎসবেরও আয়োজন করতেন।
বাংলা সনের প্রবর্তনের পরে যেভাবে বাংলা নববর্ষ পালন শুরু হয়, এখন হুবহু সেভাবে পালন করা হয় না। জমিদার–তালুকদার–ভূস্বামিরা না–থাকার কারণে তাঁদের কাছে বাংলার চাষাদের খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করার রীতির বিলুপ্তি ঘটেছে। ফলে তাঁরা পহেলা বৈশাখে যে–ধরনের মেলা ও উৎসবের আয়োজন করতেন, সেগুলোও বিলুপ্ত হয়েছে। ব্যবসায়ীদের অস্তিত্ব আছে বিধায় হালখাতা খোলা হয় ও পুরনো–নতুন খদ্দেরদের মিষ্টি দ্বারা আপ্যায়ন করা হয়। এছাড়া গ্রামে–গঞ্জে আগের মতোই ঘরে ঘরে ঘণ্ড অর্থাৎ পাচন রান্না করা হয়, ভালো খাওয়া–ভালো পরা–প্রাতস্নান করা–ঘরের জিনিসপত্র ধোয়ামোছা ও ঘর পরিষ্কার রাখা হয়। অতিথিদের আপ্যায়নের জন্য ঘরে ঘরে নানা লোকজ খাবারও প্রস্তুত করা হয়।
১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশে আধুনিকভাবে বাংলা নববর্ষ পালন আরম্ভ হয়। চন্দনাইশে কখন্ থেকে বৈশাখী উৎসব ও মেলা হচ্ছে তা সঠিকভাবে বলা মুশকিল। ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি, প্রতিবছর পহেলা বৈশাখে চন্দনাইশ উপজেলার বিভিন্ন হাইস্কুল প্রাঙ্গণে মেলা বসে। গাছবাড়িয়া নিত্যানন্দ গৌরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের (খানহাট সংলগ্ন) মাঠ ও চন্দনাইশ সদরস্থ কাশেম মাহবুব হাই স্কুলের মাঠে অনিয়মতিভাবে মেলা বসতে দেখা যায়। নতুন ধাঁচের এসব মেলায় শিশুদের বিভিন্ন খেলনা, লোকজ নানা খাবার, লোকজ নানা দ্রব্য ও পণ্য বিক্রি করা হয়। বিভিন্ন লোকজ গান গেয়ে মেলাকে আকর্ষণীয় ও প্রাণবন্ত করা হয়। মেলায় যেসব গান গাওয়া হয় তার মধ্যে রয়েছে কবিগান, মাইজভাণ্ডারি গান, আস্কর আলী পণ্ডিতের গান, চাটগাঁইয়া গান, সেকান্দর গাইনের গান ও রমেশ শীলের গান প্রভৃতি। লোকনৃত্য ও সার্কাসও প্রদর্শন করা হয়। মেলাসমূহে এসব গান, লোকনৃত্য ও সার্কাস দেখতে ভিড় জমায় শিশু, নারী ও বুড়ো–বুড়িরা। নিকট অতীতে চন্দনাইশ উপজেলার বিভিন্ন মাঠে বৈশাখী মেলা বসতো। এসব মেলায় পুতুল নাচ, বলীখেলা, লাঠিখেলা, ষাঁড়ের ও মোরগের লড়াই, হা–ডু–ডু ও কাবাডি খেলার আয়োজন করা হতো।
চন্দনাইশে স্মরণকালের বৃহত্তম বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয় ১৪৩৩ বাংলা নববর্ষের পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে। চট্টগ্রাম–১৪ অর্থাৎ চন্দনাইশ–সাতকানিয়া (আংশিক) আসন থেকে নির্বাচিত মাননীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব জসীম উদ্দীন আহমেদ–এর পৃষ্ঠপোষকতায় গাছবাড়িয়া নিত্যানন্দ গৌরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের (খানহাট সংলগ্ন) মাঠে এই মেলার আয়োজন করা হয়। ১৪ এপ্রিল থেকে ১৯ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত মোট ছয়দিন বিশাল আয়োজনের এই মেলা চলমান ছিল। ১৪ এপ্রিল সকাল ৮টায় বরুমতি ব্রিজ থেকে বর্ণাঢ্য বৈশাখী শোভাযাত্রার মাধ্যমে মেলার আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটে। মেলায় পিঠাপুলি, পান্তা ইলিশ, হস্ত ও কুটির শিল্প প্রভৃতির কয়েকশত স্টল ছিল এবং প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের সমাগম ঘটে। মেলার অন্যতম আকর্ষণ ছিল প্রতিদিনকার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে চট্টগ্রামের বিভিন্ন কণ্ঠশিল্পীর কণ্ঠে গান পরিবেশন। তাঁরা হলেন অশ্রু বড়ুয়া, রাজশ্রী, মেরি, সুপ্রিয়া, প্রিয়াংকা, শিমুল শীল, রনি আফরোজা, আহমদ নূর আমিরী ও রাগীব আহসান মুন্না প্রমুখ। মেলায় কৌতুক পরিবেশন করেন দেশের খ্যাতনামা শিল্পী কাজল। মেলায় বিভিন্ন সময়ে আলোচনা অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়, যেখানে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিবর্গ পহেলা বৈশাখ ও বাংলা নববর্ষ নিয়ে আলোকপাত করেন। মাননীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব জসীম উদ্দীন আহমেদ এই মেলা প্রসঙ্গে বলেন : ‘পহেলা বৈশাখ আনুষ্ঠানিক উৎসব ছাড়াও আমাদের আত্মপরিচয়ের গভীরে প্রোথিত একটি সাংস্কৃতিক বন্ধন। চন্দনাইশের এই বৈশাখী আয়োজন প্রমাণ করে ভিন্ন ভিন্ন ধর্ম, ভাষা আর ঐতিহ্যের মানুষ একসঙ্গে মিলেই গড়ে তোলে আমাদের প্রকৃত সামাজিক শক্তি। এখানে হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলমান এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সকল মানুষ একসাথে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়। এটাই আমাদের গৌরব, এটাই আমাদের ঐতিহ্যের প্রাণ। আমরা বিশ্বাস করি, সংস্কৃতি কোনো বিভাজন সৃষ্টি না করে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও সম্প্রীতির সেতুবন্ধন গড়ে তোলে। এই বৈশাখী মেলা সেই বন্ধনেরই একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। আমি চাই, আগামী প্রজন্ম এই ঐতিহ্যকে নিবিড়ভাবে অনুভব করুক ও নিজেদের জীবনে ধারণ করুক।’
এই আয়োজনের বিশেষ দিক হলো প্রযুক্তির ছোঁয়া। প্রচলিত ধারার সঙ্গে আধুনিকতার চমৎকার সমন্বয় দেখা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেলার ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় দূরের মানুষও এর সঙ্গে মানসিকভাবে যুক্ত হতে পেরেছিল। ফলে মেলার পরিসর স্থানীয় সীমায় আবদ্ধ না থেকে বৃহত্তর পরিসরে ছড়িয়ে পড়েছিল।
এই আয়োজনকে বাস্তবায়ন করার জন্য গঠিত ‘চন্দনাইশ–সাতকানিয়া (আংশিক) সম্মিলিত বর্ষবরণ ও বৈশাখী মেলা উদযাপন–১৪৩৩ কমিটি’র আহ্বায়ক ছিলেন এম এ হাশেম রাজু ও সদস্য সচিব ছিলেন অধ্যক্ষ উত্তম কুমার আচার্য্য। ১০১ সদস্য বিশিষ্ট এই কমিটির বিভিন্ন উপ–কমিটি ছিল। মূল কমিটি ও উপ–কমিটিগুলোতে যুক্ত থেকে যাঁরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে মেলাকে সফল করেছেন, তাঁরা হলেন : আলহাজ্ব সিরাজুল ইসলাম সওদাগর, শহীদুল ইসলাম, মো. আইয়ুব আলী, এস. এম. ফরিদ, হাজী নুর মোহাম্মদ, মোরশেদুল আলম চৌধুরী মুন্না, মহিউদ্দিন কাদের, জয়নাল আবেদীন চৌধুরী, এরশাদ আলী, ওরশেদুল আলম মিন্টু, মেজবাহ উদ্দীন, মো. মাহবুবুল আলম, মো. আমিনুল চৌধুরী, এড. জসিম উদ্দীন হিমেল, ওসমান গণি খোকন, এড. অঞ্জন প্রসাদ, প্রবীণ আইনজীবী রফিক আহমদ, এড. শফিউল হক সেলিম, এড. বাকের চৌধুরী, এড. ফোরকানুল ইসলাম, এড. আব্দুল করিম, আব্দুল কাদের সিকদার, মাহবুবুল করিম সোহেল, আকতার হোসেন, আলমগীরুল ইসলাম, জাহাঙ্গীর আলম, সাইফুল ইসলাম, কোরবান আলী, মো. লোকমান, কিং ফোরকান, মো. জিসান, মো. ইলিয়াছ, মহিউদ্দীন, মো. মিজানুর রহমান, মো. ইমন, মো. মিনার, মো. শিবলু, বদিউল আলম, ইয়াকুন্নবী সুমন, মো. হৃদয়, জমির উদ্দীন, মো. আরিফ, মো. ফারুক, মো. মিজান, মো. ফরহাদ, মো. আইনুল হুদা, মাহবুবুল আলম, রিয়াজ মাস্টার, আব্দুস সবুর, আবুল কাশেম চৌধুরী, নুরুল ইসলাম, মামুন হাসান, মো. হাসান, মো. শাহজাহান, মো. মোরশেদ, মো. আলমগীর, হোসেন গনি, আনোয়ার হোসেন, আব্দুল গণি, মো. আরাফাত, মো. দেলোয়ার, মো. মিন্টু, মো. জসিম, মো. করিম, ওয়াহেদ, মোরশেদ, হাশেম আলী, খোরশেদ, মোনাফ, আলমগীর, সোহেল, মো. নাছির, মো. রাব্বী, মোজাম্মেল হক বেলাল, মোহাম্মদ কমরুদ্দীন, এস. এম. রহমান, আমিনুল ইসলাম রুবেল, ওসমান গণি ও খালেদ রায়হান প্রমুখ।
আমাদের বিশ্বাস, মাননীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব জসীম উদ্দীন আহমেদ বিশাল পরিসরে এই বৈশাখী উৎসব ও মেলার আয়োজন করে বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি যে–গভীর অনুরাগের পরিচয় দিয়েছেন, ভবিষ্যতেও তিনি সেই আয়োজন অব্যাহত রেখে এই অনুরাগের পরিচয় দেবেন এবং চন্দনাইশে বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন।
বলা বাহুল্য, চন্দনাইশ উপজেলার ধোপাছড়ি ইউনিয়নে রয়েছে ত্রিপুরা, মারমা, চাকমা প্রভৃতি উপজাতীয়দের বসবাস। তারাও মহাসমারোহে পহেলা বৈশাখ ও বাংলা নববর্ষ পালন করে থাকে। তাদের এ উৎসব বৈসাবি নামে পরিচিত। তবে ত্রিপুরাদের কাছে তা বৈসু, মারমাদের কাছে সাংগ্রাই এবং চাকমাদের কাছে বিজু নামে আদরণীয়। বৈসু থেকে বৈ, সাংগ্রাই থেকে সা, বিজু থেকে বি নিয়েই বৈসাবি নামের উৎপত্তি। তাদের কাছে ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে বৈসাবি অত্যন্ত বড় উৎসব। পুরনো বছরকে বিদায় দেওয়ার উদ্দেশ্যে বছরের শেষ দুদিন এবং নববর্ষকে বরণ করার জন্য নববর্ষের প্রথম দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখ পালনের মধ্য দিয়ে বৈসাবি উদযাপন শেষ হয়। এ উৎসবে তারা নানা খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে। আদিবাসি মেলারও আয়োজন হয়। এছাড়াও নববর্ষের দিনে মারমারা পানিখেলায় মেতে উঠে। মারমারা পানিকে নির্মলতার প্রতীক মেনে থাকে। মারমা তরুণরা সেদিন মারমা তরুণীদের পানি ছিটিয়ে নির্মল করে নেয়।
তথ্যসূত্র : ১. ব্যক্তিগত অনুসন্ধান ২. বাংলাপিডিয়া ৩. উইকিপিডিয়া ৪. জামিউর রহমান রনিম, পহেলা বৈশাখের কথকতা, ১৩ এপ্রিল ২০১৪, বিডিনিউজ২৪.কম।
লেখক : লোকসংস্কৃতি বিষয়ক গবেষক ও কবি













