
সমুদ্রসংলগ্ন জনপদ হিসেবে পৃথিবীর নানা দেশের সঙ্গে প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে চট্টগ্রামের যোগাযোগ। অন্তত চার হাজার বছর আগেই সামুদ্রিক বন্দর হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরের কাজ শুরু। তখন থেকেই এর ছিল প্রাকৃতিক পোতাশ্রয় তথা জাহাজগুলো নিরাপদে নোঙ্গর করে রাখার সুবিধা। তাই এই চট্টগ্রাম পোর্টোগ্রান্ডো (বৃহৎ বন্দর) হয়ে উঠেছিল বিদেশীদের কাছে সুপ্রাচীনকালেই। সমকালীন বাস্তবতা অনুযায়ী সমুদ্রপথে বিভিন্ন দেশ থেকে এখানে যারা এসেছে, তাদের অনেকেই সংসার পেতে এখানেই দেহ রেখেছে; বংশধরেরা এখানকার জনগাষ্ঠীর অংশ হিসেবে একাকার হয়ে গেছে। পরিণামে তাই চট্টগ্রামের যে জনগোষ্ঠী তা বহু জাতিগোষ্ঠীর রক্তসংমিশ্রণের ফসল। চট্টগ্রামী মানুষের মধ্যে নানা নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর জিন যে রয়েছে, সেটা চট্টগ্রামের মানুষগুলোর মুখাবয়ব এবং দৈহিক গঠন দেখেই নিশ্চিত হওয়া যায়। এই জনগোষ্ঠীগত বৈচিত্র্যই যে চট্টগ্রামের সংস্কৃতিকেও বিচিত্র করবে, এ আর বিচিত্র কী।
যে কোন সমাজের বিচিত্র সব সাংস্কৃতিক আচার আচরণকে বর্ণনার সীমার মধ্যে নিয়ে আসা সত্যই এক কঠিন কাজ। প্রভাতে গাত্রোত্থান থেকে রাত্রে শয্যায় গমন পর্যন্ত এবং ভূমিষ্ঠ হওয়া থেকে দেহরক্ষা পর্যন্ত সমাজের মানুষ যে কত সামাজিক ক্রিয়াকাণ্ড করে থাকে, সে সমস্তের হদিস করা কি চাট্টিখানি কথা! জন্মসূত্রে উত্তর চট্টগ্রামের বাসিন্দা হিসেবে আমি আমার শৈশবকৈশোরকালে যা কিছু স্বয়ং প্রত্যক্ষ করেছি এবং বইপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করে জেনেছি, তার আলোকে ছোট পরিসরের এআলোচনায় চট্টগ্রামের বহুবিচিত্র সংস্কৃতির কিছুটা আভাস দিতে চেষ্টা করেছি।
১.১ সাধারণভাবে চট্টগ্রামের মানুষ ফুশের (শনের) ছানি দেয়া বেড়ার ঘরে থাকে। যে সকল জায়গা পানিতে মারে না অর্থাৎ তুলনামূলকভাবে কিছুটা উঁচু, সেখানে মানুষ মাটির গুদাম ঘরে থাকে। ক্ষেত্রবিশেষে সঙ্গতিপন্ন লোকেরা চালে টিন ব্যবহার করে থাকে। শোয়ার জন্য বার্মায় কামাই করা টাকা দিয়ে অনেকে ‘সন্দুক’ (সিন্দুক) পালংক ব্যবহার করে থাকে। উন্নত মানের বার্মা সেগুন কাঠে তৈরি কালোপালিশ করা এসকল শাহী পালঙ্কের ভেতরে মূল্যবান অলঙ্কার পাতি বাসনকোশন রাখার মত যথেষ্ট পরিমাণ জায়গা থাকত। চোরের হাত থেকে ‘ওজনে হালকা কিম্মতে ভারি’ নানা সম্পদ নিরাপদে রাখার জন্য এগুলো অনেকের নিকট বেশ জনপ্রিয় ছিল। চট্টগ্রামের পুরুষ মানুষ সাধারণভাবে লুঙ্গি পরতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। একসময় বাইরে যাবার পোশাক হিসেবে ধুতিরও ব্যবহার ছিল। বর্তমানে মুসলিম সমাজে ধুতি পরা উঠে গেছে। মহিলারা পরেন ‘থামি’ এবং চাদর। চট্টগ্রামের বাইরে এই পোশাক সচরাচর দেখা যায় না। চট্টগ্রামের বাইরের অনেককে এজন্য দুই কাপড় পরার জন্য চট্টগ্রামের লোকদের ‘ঠেসেরা’ (ব্যঙ্গ) করতে দেখেছি। এটিকে অনেকে আর্যপূর্ব সংস্কৃতির নিদর্শন বলে মনে করেন। অনেকে আবার এটাকে বার্মার প্রভাবও মনে করে থাকেন। বার্মার সঙ্গে একসময় চট্টগ্রামের খুব ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। আজকাল চট্টগ্রামের তথাকথিত ভদ্র শিক্ষিত লোকেদের মধ্যে পায়জামা, পাঞ্জাবী, প্যান্টশার্ট জনপ্রিয় হয়েছে। কিন্তু এগুলোকে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী পোশাক বলা যায় না।
১.২ চট্টগ্রামের অভিজাত মুসলিম পরিবারগুলো তাদের বাড়ি করবার ব্যাপারে একটি সুনির্দিষ্ট লেআউট বা বিন্যাস অনুসরণ করে থাকে। বাড়িগুলো সাধারণত পূবমুখী হয়ে থাকে। বাড়ির সর্বপশ্চাতে থাকে পেছনের পুকুর। এই পুকুরে বাড়ির পর্দানশীন বউঝিরা ‘আচার ব্যবহার’ করে থাকে। মূল বাড়ি এবং পুকুরের মাঝখানে একটি পেছনের উঠোন থাকে। মূল বাড়িকে আমরা আজকালকার মাস্টারবেড বলতে পারি। এই বাড়ির সর্বপেছনের কক্ষটিতে ‘বাউচ খানা’ (বাবুর্চি খানা) অবস্থিত হয়ে থাকে। বাউচ খানার পরে থাকে বাড়ির প্রধানা মহিলার শোবার ঘর। তার পরে সামনের কক্ষটাতে খানাপিনার ব্যবস্থা। এই কক্ষটিকে চট্টগ্রামীরা ‘হাতিনা’ বলে থাকে। মূল বাড়ির সামনে আর একটি উঠোন থাকে। এর পরে থাকে কাচারি ঘর/চতুরা/ডেএরি (দেউড়ি) ঘরের সারি। এই ঘরটি মূলত বাইরের পুরুষ মেহমানদের ড্রয়িং রুম। ডেএরি ঘরের সামনে অবস্থাসাপেক্ষে আর একটি বড় আকারের উঠোন থাকে। এটাকে ‘ঘাঁডা’ (ঘাঁটা) বলে। চট্টগ্রামে একটি প্রবাদ আছে-‘বাড়ি কাছে, ঘাঁডা দূর।’ ‘ঘরর গরু ঘাঁডার খের ন খায়’। ইত্যাদি। কয়েক গজ সামনে থাকে বাড়ির মসজিদ, কবরস্থান এবং বড় পুকুর। অনেক বাড়িতে বড় পুকুর একাধিকও আছে। হিন্দু বাড়ির বিন্যাস হুবহু মুসলমানদের মত নয়। এ ক্ষেত্রেও পেছনের পুকুরে মহিলাদের স্নানাদির জন্য ব্যবস্থা। অবশ্য তা সত্ত্বেও প্রতিটি বাড়িতে ধর্মীয় পূজা অর্চনার জন্য একটি মণ্ডপ এবং তুলসি গাছাদি কিছু ধর্মীয় পবিত্র উপকরণ থাকে। হিন্দুর বাড়িগুলোকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার ব্যাপারে বেশ যত্নবান হতে দেখা যায়। চট্টগ্রামী ভাষায় বহু ঘরোয়া শব্দের নিজস্ব নাম আছে। আমার মা ‘গজি’তে চাউল রাখতেন এবং ‘ডোলে’ রাখতেন ধান। পানির গেলাস রাখার জন্য ‘জুরকা’ তিনি নিজ হাতেই তৈরি করতেন। আমরা মাটির তৈরি ‘কত্তি’ থেকে ঠাণ্ডা পানি খেতাম। এই শব্দগুলো আজ আমাদের কাছ থেকে কত দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে।
১.৩ চট্টগ্রামীরা খেতে ও খাওয়াতে পছন্দ করে। অতিথিপরায়ণ হিসেবে চট্টগ্রামীদের সুনাম আছে। অনেকে মনে করেন, চট্টগ্রামীদের এই গুণ আরবীয়দের থেকে প্রাপ্ত। চট্টগ্রামের মুসলমানদের প্রচলিত মেজবান বিশেষভাবে স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত। গরুর গোশতের যে পাকপ্রণালী এই মেজবানে অনুসরণ করা হয়, তা একমাত্র চট্টগ্রামের পাচকদেরই জানা এবং তাতে যে স্বাদটা পাওয়া যায়, তার যে তুলনা হয় না, তা কোন চট্টগ্রামবাসীকে বলে বোঝাতে হবে না। ‘সপ’ (লম্বা পাটি) এ বসে মাটির ‘হানক’ (সানকি) এ লোকে এই মেজবানের খানা উপভোগ করে। সারারাত রান্না করে বিশেষভাবে সকালে পরিবেশন করা হয় এই মেজবান। এতে গরুর নলার সুরুয়া এবং ‘ঘুডাঁ’ ডাইলের পাকব্যবস্থাও বিশেষরকমের। চট্টগ্রামীদের পক্ষে এই মেজবানের লোভ সামলানো এবং দাওয়াত এড়ানো সত্যই দুষ্কর। সাধারণত আত্মীয়পরিজনের বিয়োগ হলে ‘চাইরদিন্না’ (চতুর্থ দিনের অনুষ্ঠান) কিংবা ‘চাল্লিশা’ (চল্ল্লিশতম দিনের অনুষ্ঠান) জেয়াফত উপলক্ষে এই মেজবানের আয়োজন করা হয়। অনেকে অবশ্য অন্য কোন সদুদ্দেশ্যে সওয়াবের নিয়তেও বড়সড় মেজবান দিয়ে থাকে। মধু ভাত চট্টগ্রামের আর এক বিশিষ্ট খাদ্য। রাত্রে জাউ ভাত রেঁধে তাকে ঘুঁটে আরো তরল করা হয় এবং ‘জালা’র (যে ধানগুলোকে অঙ্কুরোদ্গমের জন্য বিশেষ ব্যবস্থায় রাখা হয়), তা থেকে বের করা কিছু চালের গুঁেড়া তাতে দিয়ে দেওয়া হয়। তাতে যোগ করা হয় পরিমিত পরিমাণ গুড় বা চিনি। পরদিন সকালে তা পরিবেশন করা হয়। মধুভাত বসানো হলে ঘরের ছোটবড় সকলের মনে আনন্দের সীমা থাকে না এবং অপেক্ষা করতে থাকে কখন ভোর হবে। গাঁজনকৃত এ ভাত খেলে শরীরে স্বল্পপরিমাণ মাদকতার অনুভূতি জাগে এবং খানিকটা নিদ্রাভাব দেখা দেয়। চট্টগ্রামের ছিন্নি (শিরনি)ও কম জনপ্রিয় নয়। ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদিতে ডেগে (বড় আকারের ডেকচি) ছিন্নি পাকানো হয়। খেতে সুস্বাদু বলে ছিন্নি চট্টগ্রামের মানুষ খুব উপভোগ করে। চট্টগ্রামের একটি জনপ্রিয় প্রবাদ হচ্ছে-‘পঅলর কাম না ছিন্নি খঅন, হারা গালে গরিবাল্লাই’। এছাড়া ঘরোয়া পরিবেশে গৃহিণী বউঝিরা স্বামীসন্তানকে খাওয়ানোর জন্য কত যে পিঠা তৈরি করে, তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা করা কঠিন। ঢুউঁই পিডা (ভাপা পিঠা–শীতকালে খেজুরের রস দিয়ে খাওয়া হয়), আন্তাশা পাক্কন, জালা পিডা, ছৈঁ পাক্কন, ছাইন্না পিডা, গুরা পিডা, চিতল (চিতৈ) পিডা, লুডি (রুটি– চালের আটা দিয়ে তৈরি) পিডা, পাডিহাপটা (পাটিসাপটা) পিডা, হাত ঝারা পিডা, দুধের খিস্সা (খিরসা), নারিকেলের নাস্তা, ফইল্লার আটার নাস্তা, কাট্টইল্লা পিডা, পুলি পিডা, তাল পিডা ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রত্যেকটির স্বতন্ত্র পাকপ্রণালী বাড়ির বৌঝি সকলেরই জানা। আবহমানকাল ধরে এসমস্ত পিডাপাক্কন (পিডা ও পাক্কনের মধ্যে মূল পার্থক্য কোথায় নিহিত, এটা আমার জানা নেই।
১.৪ চট্টগ্রামের লোকেরা সুটকি খেতে খুব পছন্দ করে। মূলত সুটকি ছাড়া চট্টগ্রামী লোক কল্পনা করা যায় না। কথায় বলে ‘সারেং সুটকি দরগা’– এই তিনে চাটগাঁ। সামুদ্রিক মাছেরই সুটকি হয়, পুকুরের মিঠা পানির মাছের সুটকি করার প্রয়োজন হয় না। সমুদ্রে এক এক সময় প্রচুর মাছ ‘পড়ে’ (সুলভ হয়)। এসকল মাছ রোদে শুকিয়ে রাখা হলে এর খাদ্যগুণ অটুট থাকে এবং সেসময়কার ফ্রিজবিহীন যুগে আপৎকালীন সময়ের জন্য খাদ্য মজুদ করে রাখার অন্যতম ব্যবস্থা হিসেবে বিকাশ লাভ করে এই সুটকি শিল্প। প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে এই অঞ্চলে সুটকির প্রচলন। আজকাল সব অঞ্চলের লোকেই সুটকি খায়, তবে সুটকি খেকো হিসেবে চট্টগ্রামীদের বদনাম আর যেন ঘোচে না। ইচা, ছুরি, ফাঁইস্যা, লইট্যা, রূপচাঁদা, সরকোটা, লাক্ষ্যা, ইলিশ ইত্যাদি কত রকমের সুটকি যে আছে, তার কোন ইয়ত্তা নাই। চট্টগ্রামী ভাষায় একে ফুউনিও বলে। এটা সুটকি শব্দেরই ভিন্ন উচ্চারণ মাত্র।
১.৫ চট্টগ্রামের জাহাজ নির্মাণ শিল্প ছিল আন্তর্জাতিক মানের। যে সকল পর্যটক অতীতযুগে বাংলাদেশ ভ্রমণ করেছেন, তাঁরা সকলেই চট্টগ্রামের জাহাজনির্মাণ শিল্পের বিবরণ দিয়েছেন। দুয়ার্তে বারবোসা তাঁর ভ্রমণকাহিনিতে চট্টগ্রামের নাবিকদের বিবরণ দিয়েছেন। মাহুয়ান চট্টগ্রামের জাহাজনির্মাণ প্রণালী স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছেন বলে উল্লেখ করেছেন। সিজার ফ্রেডারিক বাংলায় এসেছিলেন ১৫৬৭ খ্রিস্টাব্দে। তাঁর ভ্রমণকাহিনিতেও একই বিবরণ রয়েছে। যাই হোক, খ্রিস্টপূর্ব দুই শতক থেকে উনিশ শতকের সময়সীমা পর্যন্ত চট্টগ্রামের এই শিল্পের বিশ্বব্যাপী আধিপত্য ও সুনাম ছিল। আলেকজান্দ্রিয়ার চাইতে চট্টগ্রামের নির্মিত জাহাজের গুণগত মান ও সুনাম ছিল তুলনামূলকভাবে বেশি। এক আদেশে তুরস্কের সুলতান চট্টগ্রাম থেকে তেরটি জাহাজ ক্রয় করেছিলেন বলে জানা যায়। সপ্তদশ শতকে তুরস্কের সুলতানের যে নৌবহর ছিল, তার সবকটিই ছিল চট্টগ্রামের তৈরি। এই অঞ্চলে মোঘল সরকারের নৌবহর ছিল সবচাইতে সমৃদ্ধ এবং এর সকল জাহাজই ছিল চট্টগ্রামের তৈরি। উনিশ শতকের প্রথম দিকে চট্টগ্রাম জাহাজনির্মাণ চত্বরে এক হাজার টন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন জাহাজ তৈরি হতো। ব্রিটিশ নৌবাহিনীর বহরেও ছিল চট্টগ্রামে প্রস্তুত অনেকগুলো জাহাজ। বিখ্যাত ট্রাফালগার যুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনী এই সকল জাহাজ ব্যবহার করেছিল। ১৯২৪ সালে কোলকাতা বন্দরে ১১টি ব্রিটিশ জাহাজ ছিল, এগুলোর মধ্যে ৮টিই তৈরি হয়েছিল চট্টগ্রামে। সিজার ফেডারিক লিখেছেন প্রতি বছর চট্টগ্রাম থেকে ২৫–৩০টি জাহাজ আলেকজান্দ্রিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানী হত। জার্মানীর ব্রেমার হ্যাভেন যাদুঘরে চট্টগ্রামে নির্মিত জাহাজ ‘ডয়েটসল্যান্ড ফ্রিগেট’ এখনো প্রদর্শনের জন্য রক্ষিতআছে। এক্ষুদ্র রণতরীটি ১৮১৮ সালে নির্মিত হয়েছিল। চট্টগ্রামের অদূরে সন্দ্বীপ, পার্বত্য চট্টগ্রামে লোহাকাঠ, সেগুন, জারুল ইত্যাদি সুলভে ও প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যেত বলে চট্টগ্রামে এই শিল্পের বিকাশ ঘটেছিল। বাষ্পীয় ইঞ্জিনের আবিষ্কারে এবং জাহাজ নির্মাণে লোহার ব্যবহার শুরু হলে জাহাজনির্মাণ শিল্পে চট্টগ্রামের এই শিল্পের ক্ষয় হতে থাকে বলে অনেকে মনে করেন। চট্টগ্রামের সাম্পান জাহাজ নির্মাণ শিল্পের ঐতিহ্যকে আজও ধরে রেখেছে। বিশেষ ধরনের শৈল্পিক অবয়বে তৈরি এই জলযান দেখতে যেমন অনন্য, এর ব্যবহারও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। বর্ষাকালে খালেবিলে পানি বাড়লে এই সাম্পানে চড়ে পর্দানশীন বউঝিরা নৌবিহার করে; বাড়ির বউ বাপের বাড়ি নাইয়র যায়। এই সাম্পান চট্টগ্রামের একান্ত নিজস্ব জিনিস। পৃথিবীর আর কোথাও এই সাম্পান পাওয়া যায় না।
২.০ চট্টগ্রামের মানুষ আবহমান কাল থেকে সাহিত্যরসিক। বাংলাসাহিত্যের আদিতম নিদর্শন এবং সহজযানী বৌদ্ধদের সাধনতত্ত্বভিত্তিক সাহিত্যকর্ম চর্যাপদ যখন রচিত হয়, হিউয়েন সাংএর মতে তখন এই চট্টগ্রাম ছিল বৌদ্ধসংস্কৃতির পীঠস্থান। তাই অনুমান করা যায়, চট্টগ্রামেও কিছু চর্যাপদ রচিত হয়েছে। কিন্তু কোন কারণে মাত্র পঞ্চাশটি চর্যার সংকলনে সম্ভবত তার প্রতিফলন ঘটে নাই। তবে চর্যাপদের ভাষা পরীক্ষা করলে আমরা দেখতে পাই চট্টগ্রামে প্রচলিত ভাষার কিছু ব্যাকরণগত বৈশিষ্ট্য যেমন অধিকরণে ‘–ত’ বিভক্তি (টালত মোর ঘর নাহি পড়িবেসী/ হাড়িত ভাত নাহি নিতি আবেশী–৩৩সংখ্যক পদ), ‘সে’ অর্থে ‘তে’ (জে জে আইলা, তে তে গেলা–কাহ্নপা চর্যা–৭) চর্যাপদে পাওয়া যাচ্ছে। চাটিলপা নামে চর্যাকার চট্টগ্রামের হতে পারেন বলে আমরা অনুমান করি। মধ্যযুগের বাংলাসাহিত্যে তো হিন্দুমুসলিম নির্বিশেষে চট্টগ্রামবাসীদের ব্যাপক উপস্থিতি ও অংশীদারিত্ব এককথায় বিস্ময়কর। এবিষয়ে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, ড. মু. এনামুল হক প্রমুখ সকল গবেষক ঐতিহাসিক গুরুত্বসহকারে উল্লেখ করেছেন। আহমদ শরীফ তাঁর বাঙালী ও বাংলা সাহিত্য নামের বিশাল গ্রন্থে ‘মধ্যযুগের মুসলিমরচিত বাঙলাসাহিত্য ও চট্টগ্রাম’ (১৯৮৩: পৃ. ৩৮৮–৩৯১) শিরোনামের প্রবন্ধে এর কারণ অনুসন্ধান করেছেন। এই বইতে বিশেষ করে মুসলিম কবিদের সম্পর্কে তিনি একটি চমকপ্রদ তথ্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন-‘আঠারশতকের প্রথমার্ধের আগে চট্টগ্রাম থেকে যেখানে পঞ্চাশজন কাব্যকবিতা রচয়িতার সন্ধান পাওয়া গেছে, সেখানে নোয়াখালীতে পাওয়া গেছে একজন এবং কুমিল্ল্লাতে তিনজন।’ পৌরাণিক কাব্য, লৌকিক কাহিনি কাব্য, ধর্মীয় সাহিত্য, রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান, পদাবলী, জ্যোতিষ শাস্ত্র ইত্যাদি যে সকল ধারায় মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে সাহিত্যকর্ম রচিত হয়েছে, সকল ধারাতেই চট্টগ্রামের কবিগণের বলিষ্ঠ পদচারণার প্রমাণ উজ্জ্বল। ষোড়শ শতকের প্রথম পাদে চট্টগ্রামে প্রথম মহাভারতের বাংলা অনুবাদ করেছিলেন কবীন্দ্র পরমেশ্বর (জন্মসূত্রে সপ্তগ্রামবাসী, চট্টগ্রামে প্রবাসী) এবং শ্রীকর নন্দী (পটিয়া থানার জঙ্গলখাইনের অধিবাসী); এঁরা দু’জন ছিলেন গৌড়ের সুলতান হোসেন শাহ (১৪৯৩–১৫১৯ খ্রি) অথবা তৎপুত্র নসরত শাহ –এর রাজত্ব কালে (১৫১৯ – ১৫৩১ খ্রি.) চট্টগ্রামের সেনানী শাসক পরাগল খাঁ এবং তৎপর ছুটি খাঁর সভা কবি। রামায়ণের কাহিনি ভিত্তি করে ষোল শতকের প্রথম দশকে দ্বিজ ভবানী নাথ পাঁচ হাজার পংক্তিতে রামচন্দ্রের রাজ্যাভিষেক বা লক্ষণের দিগ্বিজয় নামক অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবির অসামান্য কাব্য রচনা করেন। সতেরো শতকে দ্বিজ পতিদেব রচনা করেছিলেন মৃগলুদ্ধ কাব্য, আঠারো শতকে একই বিষয় অবলম্বনে রামরাজা রচনা করেছিলেন মৃগলুদ্ধ সংবাদ। এই শতকে সারদা মঙ্গল কাব্য নামে একটি মঙ্গল কাব্য রচনা করেছিলেন মুক্তারাম সেন (নিবাস আনোয়ারা থানার দেয়াং) এবং তাঁর ভাই ব্রজলাল সেন রচনা করেছিলেন মার্কণ্ডেয় চণ্ডী মাহাত্ম্য, কাছাকাছি সময়ে কালিকা মঙ্গল নামে আর একটি মঙ্গল কাব্য লেখেন নিধিরাম আচার্য (নিবাস পটিয়ার চক্রশালা) এবং মনসার ভাসান রচনা করেছিলেন রামজীবন বিদ্যাভূষণ (নিবাস বাঁশখালি থানার সাধনপুর)। এছাড়া পৌরাণিক ও লৌকিক বিষয় অবলম্বনে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কাব্য রচনা করে উল্লেখযোগ্য হয়েছেন ফকির চাঁদ, শঙ্কর দাশ, শঙ্কর ভট্ট, বলরাম দেব, রামতনু আচার্য্য, সদানন্দ ভট্ট প্রমুখ কবি। ধর্মের বাণী স্বধর্মীয়দের নিকট পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ববোধ ও প্রেরণা থেকে (‘খোদা রসুলের কথা কেহ না সোঙরি’– সৈয়দ সুলতান) চট্টগ্রামের মুসলিম কবিদের মধ্যে ইসলামি শরা শরিয়ত ও মুসলিম ঐতিহাসিক কাহিনি নির্ভর কাব্য রচনায় উৎসাহ দেখা দেয়। সম্ভবতঃ এ ধারার প্রথম কবি আফজাল আলী। তাঁর একমাত্র প্রাপ্ত কাব্য নসিহত নামা; একই নামের এ বিষয়ে আর একটি কাব্য রচনা করেছিলেন শেখ পরান ( নিবাস–সীতাকুণ্ড ; আনুমানিক সময়কাল ১৫৫০– ১৬১৫)। শেখ পরান নুর নামা নামে মুসলিম সৃষ্টিতত্ত্ব বিষয়ক একটি কাব্য রচনা করেছিলেন। নসরুল্লাহ খাঁ ( নিবাস–রামু; আনুমানিক সময়কাল–১৫৬০–১৬২০) রচনা করেছিলেন ‘মুসার সোয়াল’ ও ‘শরিয়ত নামা’। পূর্বোক্ত কবি শেখ পরানের পুত্র শেখ মুত্তালিব ( আনু. সময়কাল–১৫৯৫–১৬৬০) ‘কিফায়েতুল মুসল্লিন’ (ফেকাহ শাস্ত্রীয় গ্রন্থ) এবং ‘কায়দানী কিতাব’ নামে এজাতীয় দুটো কাব্য রচনা করেছিলেন । আঠারো শতকের সৈয়দ নুরুদ্দিন রচনা করেছিলেন ‘দকায়িকুল হকায়িক’, ‘মুসার সওয়াল’, ‘কিয়ামতনামা’, ও ‘বুরহানুল আরেফিন’। ইসলামের ইতিহাস উপকথা ভিত্তিক কাহিনি কাব্যের প্রথম রচয়িতা (আনু. সময়কাল ষোড়শ শতকের প্রথম পাদ) কবি সাবিরিদ খানের (নিবাস ফটিকছড়ি থানার নানুপুর গ্রাম)। তাঁর এ শ্রেণির দুটো কাব্য হচ্ছে ‘রসুল বিজয়’ এবং ‘ হানিফা ও কয়রা পরী’। তবে শুধু চট্টগ্রামেই নয় , সমগ্র বাংলা সাহিত্যেই এধারা এক বিরাট মাপের ব্যক্তিত্ব সৈয়দ সুলতান ( নিবাস পটিয়ার চক্রশালা আনু. সময়কাল ১৫৫০– ১৬৪৮)। এ শ্রেণির কাব্যই তাঁর সম্ভবতঃ ছয়টি, যেমন, নবিবংশ, রসুল বিজয়, শব–ই–মেরাজ, ওফাত– ই– রসুল, ইবলিসনামা ও জয়কুম রাজার লড়াই। এগুলোর মধ্যে প্রথমোক্ত কাব্য অর্থাৎ নবিবংশ মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের একটি বিশিষ্ট রচনা। এই কাব্য সম্পর্কে ড. মুহম্মদ এনামুল হক বলেন,- “নবিবংশ বিষয়বৈচিত্র্য ও আকারে সপ্তকাণ্ড রামায়ণকেও হার মানাইয়াছে। এই কাব্যটিকে বাংলা মহাকাব্যের একটি আদর্শ বলা চলে।” মধ্যযুগের ধর্মপ্রধান সাহিত্যের যুগে রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যানেও চট্টগ্রামের কবিদের অবদান অসামান্য। প্রাচীন ভারতীয় উপাখ্যান বিদ্যা আর সুন্দরের প্রণয়ের রূপক কাহিনি অবলম্বনে রচিত বিদ্যাসুন্দর কাব্যের চট্টগ্রামের দুজন কবির একজন দ্বিজ শ্রীধর। অপরজন পূর্বোক্ত কবি সাবিরিদ খান। ইরাণী কাব্যের সুবিখ্যাত লায়লী মজনুর প্রণয় কাহিনি অবলম্বন করে বাংলায় সর্বপ্রথম একটি উৎকৃষ্ট মানের কাব্য রচনা করেন চট্টগ্রামের তদানীন্তন শাসক নিজাম শাহ শুরের অর্থমন্ত্রী দৌলত উজীর বাহরাম খাঁ। তাঁর কাব্যের নাম ‘লায়লী মজনু’ ( রচনাকাল ১৫৬০–১৫৭৫) । সমালোচকের ভাষায় ‘ নিছক কাব্যরস, লিপিচাতুর্য, ভব্যতা ও শালীনতায়’ ষোড়শ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্যে এই কাব্যের তুলনা মেলা ভার। মানুষ নায়কের সঙ্গে পরী নায়িকার প্রণয় কাহিনি রূপ দিয়েছেন সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথম দিককার কবি নওয়াজিশ খাঁ (নিবাস – সাতকানিয়া থানার সুখছড়ি গ্রাম) তাঁর গুল– ই– বকাওলি কাব্যে। রোসাঙ্গের রাজসভায় (কিংবা অমাত্য সভায়) বসে প্রতিভাবান কবি দৌলত কাজী (রাউজানের সুলতানপুর গ্রাম, আনু. সময়কাল–১৬০০–১৬৩৮) তার বিখ্যাত কাব্য সতীময়না লোর চন্দ্রাণী। স্ব্তায়ু কবি এ কাব্য অসমাপ্ত রেখে পরলোক গমন করেছিলেন (সমাপ্ত করেছিলেন রোসাঙ্গের অন্য কবি পদ্মাবতী খ্যাত আলাওল)। তাছাড়া মধ্যযুগের তিনিই একমাত্র কবি যিনি রাধাকৃষ্ণের প্রেমবিষয়ক পদ ছাড়া অন্য কোন বিষয়ে ব্রজবুলির সার্থক ব্যবহার করেছিলেন। রোসাঙ্গের বিখ্যাত কবি আলাওল জন্মসূত্রে চট্টগ্রামী নন, তবে রোসাঙ রাজসভায় চট্টগ্রামী অমাত্য ও কবিগণের অনুকূল সাহচর্যে তাঁর কাব্যপ্রতিভা বিকাশ লাভ করেছিল। তিনিও রচনা করেছিলেন মালিক মাহমুদ জায়সীর হিন্দী কাব্য পদুমাবৎ অবলম্বনে ‘পদ্মাবতী’ কাব্য। তাঁর রচিত আর একটি প্রণয়োপাখ্যান ‘সয়ফল মুলুক বদিউজ্জামাল’। ফারসি–হিন্দি কাহিনিকাব্যের প্রভাবজাত সাহিত্যের যুগে দেশজ রূপকথা নিয়ে ‘চন্দ্রাবতী’ নামে একটি কাহিনিকাব্য রচনা করেছিলেন কোরেশী মাগন (নিবাস– রাউজানের নোয়াজিশপুর গ্রাম, আনু. সময়কাল অষ্টাদশ শতকের প্রথম পাদ)। আলাওলের পদ্মাবতী কাব্যের আদেষ্টা আরাকান রাজ সভার মন্ত্রী মাগন ঠাকুরের সঙ্গে অভিন্ন নন বলে সম্প্রতি ড. আবদুল করিমের ‘রোসােঙ্েগ বাংলা সাহিত্য’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধেমত প্রকাশ করা হয়েছে। এছাড়া উল্লেখযোগ্য মুহম্মদ রজা (নিবাস– ফটিকছড়ি থানার বক্তপুর গ্রাম আনু. সময়কাল–আঠার শতক) রচিত ‘তমিম গোলাল ও চতুর্ণ ছিল্লাল’ এবং মিসরি জমাল, মুন্সি মোহাম্মদ মুকিমের ‘মৃগাবতী’, মুহম্মদ আলীর ‘শাহপরী মল্ল্লিকজাদা’ ইত্যাদি। প্রণয়োপাখ্যান রচনায় মুসলিম কবিদের প্রাধান্য হলেও এ ধারার সাহিত্য রচনায় কয়েকজন হিন্দু কবিও আনিয়োগ করেছিলেন। দু’ একজন ব্যতীত এঁরা সকলেই চট্টগ্রামবাসী। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য রামজীবন দাস (শশীচন্দ্রের উপাখ্যান), সুশীল মিশ্র (রূপবতী রূপজান উপাখ্যান), বাণীরাম দাস (শীতবসন্ত), গোপীনাথ দাস (মনোহর মধুমালতী) প্রমুখ। চট্টগ্রামের হিন্দুমুসলিম কবিরা মিলিতভাবে রাধাকৃষ্ণ লীলাবিষয়ক প্রচুর বৈষ্ণব পদাবলীও রচনা করেছেন। এঁদের মধ্যে আফজাল আলী, আফজাল, আলাওল, আলী মিয়া, আলী রজা, এবাদুল্ল্লাহ, কমর আলী পণ্ডিত, গেয়াস খান, চম্পা গাজী, চামারু পণ্ডিত, দানিশ কাজী, শেখ ভিকন, (কোরেশী মাগনের ভাই), সৈয়দ সুলতান (‘নবীবংশ’ খ্যাত), প্রমুখ মুসলিম পদকার এবং দ্বিজ রঘুনাথ, গোবিন্দ বল্লভ, শ্যামদাস, নট ঘনশ্যাম, দ্বিজ জানকী নাথ, দ্বিজ কুমুদ, কানু দাস, দ্বিজ পার্বতী, দ্বিজ মাধব, নটাই দাস, রাধা বল্লভ, নিত্যানন্দ, দ্বিজ গদাধর প্রমুখ হিন্দু পদকারের নাম সংক্ষেপে উল্লেখ করা যায়। চট্টগ্রামের পদকারদের মধ্যে মহিলা পদকার শ্রীবরের ঝি এবং হীরামণিও রয়েছেন। বাংলা সাহিত্যে জ্যোতিষ শাস্ত্র সম্বন্ধীয় পথিকৃৎ যিনি, তিনি চট্টগ্রামের কবি মোজাম্মিল। এ পর্যন্ত প্রাপ্ত কাব্যনিদর্শনসমূহের বিচারে তিনি চট্টগ্রামের প্রাচীনতম (পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি) কবিদেরও অন্যতম। তাঁর এজাতীয় দুটো কাব্য ‘সায়াৎ নামা’ ও ‘নীতিশাস্ত্রবার্তা’। এছাড়া মধ্যযুগের মুসলিম বাংলা সাহিত্যের একমাত্র রূপক কাব্য রচনার গৌরব চট্টগ্রামের একজন কবির। এ রূপক কাব্যটির নাম ‘সত্যকলি বিবাদ সংবাদ’। এবং এ কাব্যের কবি হচ্ছেন মুহম্মদ খান।
আধুনিকযুগেও বাংলা সাহিত্য চর্চার এ বলিষ্ঠ ধারা অব্যাহত রেখেছেন চট্টগ্রামের প্রতিভাবান কবি সাহিত্যিকগণ। আধুনিক যুগে চট্টগ্রামে দু’জন মহাকাব্যের কবি রয়েছেন। একজন হচ্ছেন কবি নবীন সেন এবং কবি হামিদ আলী। এছাড়া আরও যাঁরা বাংলা সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে খ্যাতিমান হয়েছেন তাঁদের মধ্যে রয়েছেন শশাঙ্কমোহন সেন, শরচ্চন্দ্র দাশ, জীবেন্দ্রকুমার দত্ত, মৌলানা মনিরুজ্জামান ইসলাবাদী, মাহবুব উল আলম, আবুল ফজল, আশুতোষ চৌধুরী, ওহীদুল আলম, শেখ মুজাফফর আহমদ, আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, ড. মু. এনামুল হক, ড. কালিকারঞ্জন কানুনগো, আসহাবউদ্দিন আহমদ, সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ, বুলবুল চৌধুরী, ড. সুনীতিভূষণ কানুনগো, চৌধুরী জহুরুল হক, মাহবুব উল আলম চৌধুরী, সৈয়দ আবদুস সাত্তার, সুচরিত চৌধুরী, আহমদ ছফা প্রমুখ। নবীনদের মধ্যেও অনেকে বর্তমানে বাংলা সাহিত্যের সেবা করছেন। চট্টগ্রামের যে সকল লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয় বিভিন্ন উপলক্ষে এবং চট্টগ্রামের প্রকাশকরা যে সকল বই প্রকাশ করছেন প্রতিবছর, তুলনা করলে তা বাংলার অন্যান্য জেলা অপেক্ষা বেশি ছাড়া কম হবে না।
২.১ দুর্বোধ্যতার জন্য চট্টগ্রামের ভাষার খ্যাতি আছে। বৃহত্তর চট্টগ্রামের পাঁচটি জেলার অন্যূন এক কোটি চল্লিশ লক্ষ লোক এই ভাষায় কথা বলে। খ্রিস্টীয় কয়েক শতকে সারা ভারতবর্ষে যে আর্যায়ণ প্রক্রিয়া চলে, তারই প্রভাবে সমসাময়িককালে এই অঞ্চলে এই ভাষার উৎপত্তি। চট্টগ্রামে আর্যগোষ্ঠী বিশেষ একটা আসে নাই। কিন্তু তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি এসেছে। আর্যায়ণের আগে এখানকার আদিবাসীদের মধ্যে যে ভাষা প্রচলিত ছিল, আর্যায়ণের মাধ্যমে সে ভাষাটির উচ্চারণ ও স্বরাঘাত বৈশিষ্ট্যে বড় ধরনের কোন পরিবর্তন ঘটাতে পারেনি, আর্যায়ণের পরেও তা কার্যকর রয়ে গেছে। আগে পরে এই চট্টগ্রামে ব্যবসায়িক প্রয়োজনে এসেছে প্রচুর আরবিফারসি ভাষাভাষী, তুর্কী এবং চীনা ভাষার লোক। আরও পরে এসেছে হিন্দীভাষী প্রচুর আমলা মোগল এবং ব্রিটিশ সরকারের বদৌলতে। সর্বশেষ এসেছে পর্তুগীজ এবং ইংরেজগণ। সব মিলিয়ে চট্টগ্রামের ভাষা হয়েছে বাংলা ভাষার পারিবারিক গোষ্ঠীর ভাষা হয়েও ভিন্নতর বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। প্রাথমিক হিসাবে দেখা গেছে, এর শতকরা ৬০টি শব্দ তদ্ভব, যে কারণে একে আর্য ভাষাপরিবারভুক্ত বলতেই হয়। আরবি ফারসি শব্দের শতকরা হার ২০টি; মান বাংলায় এর অনুপাত শতকরা ৭/৮টি। অনার্য শব্দের পরিমাণও তুলনামূলকভাবে বাংলা থেকে অনেক বেশি। (‘ভাল’ অর্থে ‘গম’ শব্দটি অনার্য কোন ভাষা থেকে আগত। শব্দটি চাকমা ভাষায়ও ব্যবহৃত হয়। এই ধরনের আরও কিছু শব্দ চট্টগ্রামী ভাষায় আছে) তৎসম শব্দ নাই বললেই চলে। কিছু অর্ধতৎসম শব্দ হিন্দু সমপ্রদায়ের মধ্যে প্রচলিত আছে। এসকল কারণে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা বাংলা ভাষার অন্যতম উপভাষা হয়েও অন্যান্য অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষা তথা উপভাষার চাইতে বেশ খানিকটা ভিন্ন। কোলকাতা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হওয়ার সুবাদে আধুনিক যুগে বাংলা ভাষার সাধু সাহিত্যিক রূপটি গড়ে উঠেছে কোলকাতা তৎপার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মানুষের মুখের ভাষার উপর ভিত্তি করে। কিন্তু মজার ব্যাপার হল এই যে, মধ্যযুগে চট্টগ্রামকে ঘিরে যখন বাংলা সাহিত্যের ব্যাপক চর্চা হচ্ছিল, তখনও চট্টগ্রামের কবিগণ যে ভাষাভঙ্গীটি মান ভাষা হিসেবে অনুসরণ করেছেন, তা ঠিক চট্টগ্রামের মুখের ভাষা ভিত্তিক ছিল না। তাতেও বোঝা যায়, চট্টগ্রামের ভাষাটি বাংলা ভাষা থেকে ঠিক স্বতন্ত্র কোন ভাষা নয়। তবে এটাও ঠিক যে, চট্টগ্রামের কবিদের রচিত সাহিত্যকর্মের ভাষাভঙ্গীতে চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রচলিত বেশ কিছু শব্দ স্থানে স্থানে সুন্দর ভাবে প্রযুক্ত হয়েছে (ক.‘পরম যতনে শুক রাখিল ছাপাই’– লুকিয়ে অর্থে: পদ্মাবতী: আলাওল খ. পশ্চাতে বাঝিলে ফান্দে বড়ই কর্কস-‘আটকালে’ অর্থে; পদ্মাবতী:। গ. তা দেখিয়া লোক সবে চক্ষু খাটে ভএ-‘মোদে’ অর্থে ; হানিফার দিদ্বিজয়: সাবিরিদ খান)।
৩. চট্টগ্রামের লোকসমাজে নন্দনসংস্কৃতির একটি বলিষ্ঠ প্রবাহ আছে। চট্টগ্রামের কবিগান একসময় বেশ বিনোদন দান করত সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্যে। দুই জন কবিয়ালের মধ্যে নানা বিষয় অবলম্বন করে পাল্টার মাধ্যমে জমে উঠত এবং দারুণ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করত গ্রামীণ সমাজে এই কবিগান। কবিগানের কতগুলো রীতিনীতি ছিল, যা কঠোর ভাবে অনুসরণ করা হত প্রতিযোগিতার নির্ভেজাল আমেজ বজায় রাখার জন্য। বিষয়গুলোও হতো খুব সময়োপযোগী। নারী বনাম পুরুষ, আধুনিক যুগ বনাম প্রাচীন যুগ, শরীয়ত বনাম মারফত. ধনী বনাম দরিদ্র, সমাজতন্ত্র বনাম ধনতন্ত্র ইত্যাদি নানা রকমের বৈচিত্র্যপূর্ণ ছিল বিষয়গুলো। আজগর আলী, করিম বখশ, রমেশ শীল, মনীন্দ্র দাশ, সারদা শীল, ফণি বড়ুয়া, সাবের সরকার, ইয়াকুব আলী প্রমুখ এক সময় কবিগান গেয়ে বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন। চট্টগ্রামে একই রকমভাবে মারফতি গান, গাইনের পালা, গাজীর গান ইত্যাদিও হতো। মাইজভান্ডারী গান মাইজভান্ডারী তরিকার অনুসারীদের সাধনসঙ্গীত। তবে মানবিক বৈশিষ্ট্যের জন্য এই গান জনসাধারনের মধ্যেও ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়। বিয়েশাদীর অনুষ্ঠান উপলক্ষে অন্দরমহলে মহিলাদের দ্বারা পরিবেশনীয় ‘হঁঅলা’ গান একসময় খুব জনপ্রিয় ছিল। চট্টগ্রামে বেশ কিছু প্রেমসঙ্গীতও মানুষের মুখে মুখে ফিরত। আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কল্যাণে কোলকাতায় রেকর্ড সঙ্গীতের প্রসার হলে আমাদের সমাজ থেকে এসমস্ত গ্রামীণ বিনোদনসমূহে অবক্ষয়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়। এই অবস্থায় বিগত শতকের তিরিশ ও চল্লিশের দশকের দিকে চট্টগ্রামের কয়েকজন বিশিষ্ট সাহিত্যিক সংস্কৃতিকর্মী এই গানগুলো ধরে রাখার উদ্যোগ নেন। এই প্রসঙ্গে কবি ওহীদুল আলমের নাম বিশেষভাবে স্মরণ করতে হয়। সেসময় মোহাম্মদ হারুন (‘মলকাবানু’ খ্যাত) এবং মোহাম্মদ নাসির (‘মনপাখিরে বুঝাইলে সে রে বুঝে না’ খ্যাত।) কয়েকটি গান রেকর্ড করেন। পরবর্তীকালে মলয় ঘোষ দস্তিদার (আঁআরা চাটগাইয়া নওজোয়ান), দ্বিজেন ঘোষ, বেলা খান, শেফালী ঘোষ, শ্যামসুন্দর বৈষ্ণব, এমএন আকতার প্রমুখের নাম রেডিও ও রেকর্ডের মাধ্যমে দৃশ্যপটে আসেন। এর মধ্যে শেফালী ঘোষ এবং শ্যামসুন্দর বৈষ্ণব চট্টগ্রামী গানকে এক অত্যুজ্জ্বল মহিমা দান করেন। চট্টগ্রামের গানের একটি বিশিষ্ট সুর আছে, যেমনটা আছে রংপুরের ভাওয়াইয়ার এবং পদ্মার তীরের পল্ল্লীগীতির। এই সুর আমাদেরকে চট্টগ্রামের হালদা এবং কর্ণফুলীর কথা মনে করিয়ে দেয় পৃথিবীর যে প্রান্তে থাকিনা কেন।
আজ দিন এসেছে চট্টগ্রামের সেই লোকজ সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার। এবিষয়ে আমাদেরকে আর বিলম্ব করলে চলবে না। আমরা যারা চট্টগ্রামে জন্ম নিয়েছি, চট্টগ্রামকে ভালোবাসতে হবে আমাদেরই। চট্টগ্রামের সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্বও নিতে হবে আমাদেরকেই।
লেখক: শিক্ষাবিদ, গবেষক, সাবেক উপাচার্য, কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।











