চট্টগ্রামসহ সারা দেশের ট্যানারি শিল্পের বেহাল দশায় চামড়া ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। চট্টগ্রামে এবার ৪ লাখেরও বেশি কাঁচা চামড়া সংগ্রহের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও ট্যানারি রয়েছে কেবলমাত্র একটি। সারা দেশে ১৭২টি ট্যানারি থাকলেও চালু রয়েছে সর্বোচ্চ ৩০টি। এতে করে কাঁচা চামড়া ঠিকঠাকভাবে প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং ব্যবসার পুঁজি উঠানো নিয়েও ব্যবসায়ীরা চিন্তিত।
সূত্র জানিয়েছে, ট্যানারি শিল্পে বেহাল দশা বিরাজ করছে বেশ কয়েকবছর ধরে। পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা লাভের পর বাংলাদেশের চট্টগ্রামে ২২টি ট্যানারি গড়ে ওঠে। কিন্তু ক্রমে তা বন্ধ হতে হতে বর্তমানে মাত্র একটিতে ঠেকেছে। এতে করে চট্টগ্রামে কাঁচা চামড়া ব্যবসার সাথে জড়িত ব্যবসায়ীরা ঢাকার ট্যানারির ওপর নির্ভরশীল। চট্টগ্রামে ট্যানারি না থাকায় ঢাকার ট্যানারি মালিকেরাও সুযোগ নিয়ে থাকেন বলে চট্টগ্রামের একজন ব্যবসায়ী জানান। তিনি বলেছেন, গতবছরের চামড়ার বকেয়া এবছরও পরিশোধ করেননি ঢাকার ট্যানারি মালিকরা। আমরা কোরবানির আগে গতবছরের বকেয়াগুলো উদ্ধারের চেষ্টা করছি। ঢাকা, হেমায়েতপুর, খুলনা এবং নাটোরের চামড়া শিল্পের অবস্থা ভালো নয় উল্লেখ করে চট্টগ্রামের এই ব্যবসায়ী বলেন, কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াজাত করতে বহু খরচ। এই খরচের যোগান না পেলে কোটি কোটি টাকার চামড়া নষ্ট হয়ে যাবে। সারাদেশের ১৭২টি ট্যানারির বেশিরভাগই বন্ধ উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমানে ২০টির মতো ট্যানারি চালু রয়েছে। কোরবানি উপলক্ষে আরো কয়েকটি চালু হয়ে বর্তমানে ৩০টির মতো ট্যানারি চামড়া সংগ্রহের প্রস্তুতি নিয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন প্রবীণ ব্যবসায়ী বলেন, চট্টগ্রামের চামড়া শিল্পের অবস্থা বেহাল। নানা ধরনের সমস্যায় পড়ে এই শিল্প লাটে উঠার উপক্রম হয়েছে। সরকারের তরফ থেকে বিশেষ পৃষ্ঠপোষকতা না পেলে এই শিল্পে সুদিন ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
সূত্র বলেছে, চট্টগ্রামে পাকিস্তান আমলে গড়ে উঠা ১৯টি এবং স্বাধীনতার পরবর্তীতে গড়ে উঠা তিনটিসহ মোট ২২টি ট্যানারি ছিল। কিন্তু নানামুখী সমস্যার কবলে পড়ে ইতোমধ্যে ২১টি ট্যানারি বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে কেবলমাত্র ১টি ট্যানারি চট্টগ্রামে চালু রয়েছে। কালুরঘাট এলাকায় রীফ লেদারই কেবলমাত্র চালু রয়েছে। এই ট্যানারিতে চট্টগ্রামের প্রতিদিনকার চামড়ার পাশাপাশি কোরবানির বিপুল সংখ্যক চামড়ার একটি বড় অংশ প্রক্রিয়াজাত করা হয়।
চট্টগ্রামে ট্যানারি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখানকার কাঁচা চামড়া আড়তদারেরা সংকটে আছেন। চট্টগ্রাম থেকে কাঁচা চামড়া নিয়ে তাদেরকে ঢাকায় ছুটতে হয়। গতকাল চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার সমিতির সাবেক সভাপতি মোসলেম উদ্দীনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, চামড়া শিল্প বহুমুখী সমস্যার ভিতর দিয়ে সময় পার করছে। কোনো রকমে পুঁজির সংস্থান করে ব্যবসা করছি। চট্টগ্রামে প্রতিদিন দুই থেকে তিন হাজার চামড়া পাওয়া যায়। এবার কোরবানির সময় গরু ছাগল এবং মহিষ ভেড়া মিলে চার লাখের বেশি চামড়া পাওয়া যাবে। এই চামড়া কেনা এবং সংরক্ষণ নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন বলেও তিনি জানান।
সরকার এবার চামড়ার দাম প্রতি ফুটে ২ টাকা করে বাড়িয়েছে।
ঢাকায় গরুর প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৬২ থেকে ৬৭ টাকা, যা গত বছর ছিল ৬০ থেকে ৬৫ টাকা। অন্যদিকে ঢাকার বাইরে গরুর প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয় ৫৭ থেকে ৬২ টাকা, যা গত বছর ছিল ৫৫ থেকে ৬০ টাকা। খাসির চামড়ার প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং বকরি ২২ থেকে ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে কার্যকর হবে।
চামড়া ব্যবসায়ীরা জানান, ছোট আকৃতির একটি গরুতে ২০/২১ ফুট এবং বড় আকৃতির গরুতে ৩৫/৪০ ফুট চামড়া হয়ে থাকে। একটি মহিষেও ৩৫/৪০ ফুট এবং ছাগলে ৪ ফুটের মতো চামড়া পাওয়া যায়।
কোরবানির দিন কাঁচা চামড়া নিয়ে বিভিন্ন সময় নানা ধরনের অঘটন ঘটে থাকে। জোর করে চামড়া নিয়ে যাওয়া কিংবা চামড়া ছিনতাই করার মতো কোনো অঘটন যাতে এবার কোরবানির দিন না ঘটে প্রশাসনের তরফ থেকে সেই উদ্যোগ নেয়া হবে। চট্টগ্রাম নগর পুলিশ এবং জেলা পুলিশের পদস্থ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কোরবানির দিন চামড়া নিয়ে কেউ যাতে কোনো ধরনের বিশৃংখলা তৈরি করতে না পারে সেজন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সতর্কতার প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।












