চট্টগ্রামের আভিজাত্য-মেজ্জান

সৈয়দ জিয়াউদ্দীন | বৃহস্পতিবার , ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৭:৫৩ পূর্বাহ্ণ

মেজবান বা মেজবানী শব্দের অর্থ আতিথেয়তা বা অতিথি আপ্যায়নের এক বিশেষ আয়োজন। মেজবানী থেকেই চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় মেজ্জান এবং মেজ্জান বলতেই দেশ এবং দেশের বাইরের বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে এক কথায় ভোজন বিলাসী চট্টগ্রামের সুস্বাদু গরুর মাংসের খাবারের বড়সড় আয়োজন। মেজ্জানের বাস্তবতাও তাই। মেজ্জান বলতে চট্টগ্রাম আর চট্টগ্রাম বলতে জিহ্বায় পানি টলোমল মেজ্জান। দেশে এবং প্রবাসে বাংলাদেশের মানুষের কাছে চট্টগ্রামের মানুষের পরিচয় বদ্দা এবং সাথেই উচ্চারিত হয় এই মেজ্জানের কথা। সুতারাং অস্বীকার করার উপায় নেই যে মেজ্জান চট্টগ্রামের এক অবিচ্ছেদ্য আভিজাত্যের অংশ। চট্টগ্রামের প্রায় প্রতিটি পারিবারিক এবং সামাজিক অনুষ্ঠানকে ঘিরে সীমিত বা বৃহদাকারের মেজ্জান অনুষ্ঠিত হয়। চট্টগ্রামের নিজস্ব জীবনধারা, ভাষা, সংস্কৃতি, কৃষ্টির সাথে খাদ্যাভ্যাসের এক নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে যা চট্টগ্রামের এক স্বতন্ত্র পরিচয়। মেজ্জানের যেমন শত বছরের ইতিহাস আছে তেমনি মেজ্জানকে ঘিরে অনেক মুখরোচক প্রবাদও শোনা যায় যেমন ভাগ্য নিয়ে চট্টগ্রামের এক প্রসিদ্ধ আঞ্চলিক প্রবাদ – ‘যার খোয়ালত নাই / তার মেজ্জান্যা বাড়িতও নাই’। অর্থাৎ ভাগ্যে না থাকলে মেজবানিতেও জোটে না। এই প্রবাদ চট্টগ্রামের মেজবানি বা মেজ্জানের বিশালতার বিষয়টি প্রমাণ করে। মেজ্জান বলতে ধনী গরীব নির্বিশেষে উদরপুর্তি খাবারের এক মিলন ঊৎসব। ফার্সি ভাষা থেকে অনুসৃত মেজবান বা মেজওয়ান অর্থ ‘অতিথি আপ্যায়নকারী’ আর মেজবানি বা মেজোয়ানি অর্থ ‘আতিথেয়তা’ বা ‘মেহমানদারি’ থেকে চট্টগ্রাম তথা চাটগাঁইয়া ভাষায় মেজ্জান শব্দের উৎপত্তি। শুরু থেকেই মেজ্জান একটি সম্মৃদ্ধ চট্টগ্রামের আঞ্চলিক অনুষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। মেজ্জানের সাথে বৈচিত্রময়ী চট্টগ্রামের ভৌগোলিক অবস্থান ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সম্পর্কটিও সুপ্রাচীন। হাজার বছরের শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির ক্ষেত্রে চট্টগ্রামের যেমন স্বাতন্ত্র স্বকীয়তা তেমনি খাওয়া দাওয়া রসনা ব্যাঞ্জনাতেও আলাদা বৈশিষ্ট লক্ষণীয়। ভৌগোলিকভবে সমুদ্রতীরবর্তী অবস্থানের কারণে চট্টগ্রামের নাম এবং ইতিহাস প্রাচীনকাল থেকে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের পরিব্রাজক শাস্ত্রবিদ এবং পণ্ডিতগণের লিখিত বিবরণ ও মানচিত্রে পাওয়া যায়। বিভিন্ন সময় সুলতান ও রাজাদের শাসনামলের মুদ্রায়ও চট্টগ্রামের উল্লেখ আছে। প্রায় ১৩৫০খৃঃর দিকে বিশিষ্ট পরিব্রাজক ইবনে বতুতা চট্টগ্রামের কথা উল্লেখ করে লিখেছেন ‘যে শহরে আমরা প্রবেশ করলাম তা হল সোদকাওয়াঙ (চট্টগ্রাম)। এটি মহাসমূদ্রের তীরে অবস্থিত একটি বিরাট শহর।’

ঐতিহাসিকভাবে চট্টগ্রামের অনেকগুলো নামের মধ্যে ইবনে বতুতা চট্টগ্রামকে সোদকাওয়াঙ নামে উল্লেখ করেছেন। প্রায় ১৪১৫খৃঃর দিকে চীনা পরিব্রাজক ফেইশিন এর বইতেও তাঁর চট্টগ্রাম ভ্রমণ নিয়ে চট্টগ্রামের সম্মৃদ্ধি ও সংস্কৃতি সম্পর্কিত বর্ণনা পাওয়া যায়। তিনি চট্টগ্রাম হয়ে সোনারগাঁও ভ্রমণে তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন ‘এই দেশটির উপসাগরের কূলে একটি সামুদ্রিক বন্দর আছে তার নাম চাটিকিয়াং (চট্টগ্রাম)’। তিনি লিখেছেন রাষ্ট্রীয়ভাবে তাঁর আগমনে “রাজা যখন শুনলেন আমাদের জাহাজ সেখানে পৌঁছেছে, তিনি পতাকা ও অন্যান্য উপহার সমেত উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারীদের সেখানে পাঠালেন। হাজারেরও বেশি ঘোড়া ও মানুষ বন্দরে এসে হাজির হল।” তাঁর এই লেখায় তখনকার সম্মৃদ্ধশালী চট্টগ্রামের অতিথিপরায়ণতা অর্থাৎ মেজবানির এক চমৎকার দৃষ্টান্ত ফুটে উঠেছে। আগেকার দিন অর্থাৎ ১৫০০ / ১৬০০ সালের দিকে কবি শিল্পী সাহিত্যিকদের লেখা কবিতা গান ও শিল্পকর্মে চট্টগ্রামের মেজবানির প্রচলনের উল্লেখ পাওয়া যায়। বিজয়গুপ্তের ‘পদ্মপুরাণ’ কাব্যগ্রন্থে তৎকালীন সময়ের বাংলা সাহিত্যের প্রসিদ্ধ কবি উত্তর চট্টগ্রামের নানুপুর এলাকার শাহ বারিদ খানের রচনায় মেজবান ও মেজোয়ানি শব্দ দুটির অস্তিত্ব পাওয়া যায়। ১৩৫৩ সালের দিকে বাংলার প্রথম স্বাধীন সুলতান ইলিয়াস শাহ চট্টগ্রামকে বাংলার প্রধান বন্দর হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেন। সেই সুবাদে এবং বঙ্গোপসাগর তীরবর্তী শহর হওয়ার কারণে ভৌগোলিকভাবে গুরুত্বপুর্ণ সমুদ্র বন্দরকে ঘিরে চট্টগ্রাম একটি ব্যবসায়িক অঞ্চল হিসেবে গড়ে উঠে এবং আরব সহ ভারত উপমহাদেশের ব্যাবসায়িদের কাছে চট্টগ্রামের গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে আরব দেশ থেকে আগত পীর আওলিয়া দরবেশ সহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল ও পরিবেশের লোকজনের যাতায়ত ও অবস্থানের কারণে এই অঞ্চলে তাদের সংস্কৃতি ভাষা ও খদ্যাভ্যাসের সংমিশ্রণ ঘটে। তাদের উচ্চারণে চট্টগ্রামের অনেক এলাকার নামও প্রবর্তিত হয় যেমন শুলকুল বাহার (শোলকবহর), আলকারান (আলকরণ) কিংবা আন্দরকেল্লা ইত্যাদি যা এখনো বিদ্যমান। বন্দর ঘনিষ্ঠ ও ব্যবসা মনষ্ক গুণের কারণে আগে থেকেই অনেকটা আত্মনির্ভরশীল চট্টগ্রামের মানুষের পরোপকারী ও অতিথিপরায়ণ মানোভাবের জন্ম নেয় ফলে মেজ্জান ভোজন রসিক চট্টগ্রামের আভিজাত্যে অতিথিপরয়নতার এক সর্বজনীন অনুষ্ঠানে স্থান করে নেয়। বর্তমানে এই মেজ্জানের ব্যাপকতা সর্বজনবিদিত ও প্রতিষ্ঠিত। চট্টগ্রামের মানুষ যেমন ধর্মপ্রাণ তেমনি সংস্কৃতি প্রবণ। পীর আউলীয়ার পদধন্য ও বিশেষভাবে বারআউলিয়ার পুণ্যভূমি হওয়ার সুবাদে চট্টগ্রামে পারিবারিক সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানমালা ভাবগম্ভীর ও জাঁকজমকের সাথে উদযাপন হয়ে থাকে। এইসব অনুষ্ঠানের সাথে সম্পর্কিত সামর্থ অনুযায়ী খাওয়া দাওয়ার আয়োজনটিই হয়ে উঠে মেজ্জান। প্রতিবছর শতশত গরু মহিষ ছাগল মুরগীর ব্যাপক বাবহারে চট্টগ্রামের প্রতিটি গ্রাম পাড়া মহল্লা ও শহরের আবাসিক এলাকাগুলোতে বিশাল মেজ্জানের সাথে ঊদযাপিত হয় পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (দঃ)। চট্টগ্রামের সওদাগর বা ধনী নামিদামী মানুষের নিজস্ব পুকুরের মাছ দিয়েও মাছের মেজবানির প্রচলন আছে।

চট্টগ্রামের মানুষের মধ্যে আঞ্চলিকতার সম্পর্কটি চমৎকার। মেজ্জানের মেন্যুতেও সেই আঞ্চলিকতার প্রভাব বিশেষভাবে লক্ষণীয়। জন্ম, মৃত্যু, নবজাতকের আকিকা, বার্ষিকী উদযাপন, বিয়ের ওয়ালিমা, খৎনা, কান ছেদানু, নতুন ব্যবসা কিংবা নতুন বাড়ি নির্মাণ সর্বত্রই মেজ্জানের আয়োজন থাকে। এতে আত্মীয়স্বজন ছাড়াও পাড়াপ্রতিবেশী ও বিশিষ্টজনদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। ধনীগরিব একসাথে বসে খাওয়ার মতো আনন্দঘন হয় মেজ্জানের পরিবেশ। নিকট অতীতেও খোলা মাঠ বা বাড়ির আঙ্গিনায় সামিয়ানা টাঙ্গিয়ে হ্যাজাক বাতির আলোয় মাটিতে মাদুর বা চাটাইয়ে বসে মাটির বাসনসানকিতে মেজ্জান খাওয়ার নিয়ম ছিল। আজকাল বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দৃষ্টিনন্দন কম্যুনিটি সেন্টারে চেয়ারে বসে মেলামাইনের প্লেটে খাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। খাওয়ার মেন্যুতে ভাতের সাথে কমপক্ষে চার পদের মধ্যে প্রধান আইটেম গরু বা মহিষের মাংস, হাড্ডিমাংসের সাথে বুটের ডাল, মাংসের সুরবা, ও নলা থাকে। স্বাদ ও পছন্দে গরুর মাংসই এখনো মেজ্জানের সেরা জনপ্রিয়। খাবার পরিবেশনের ব্যবস্থাপনাও অত্যন্ত সাজানো ও নিয়মতান্ত্রিক। মেজ্জানের রান্নার সুঘ্রাণে মৌ মৌ করে পুরো এলাকা। দাওয়াতের ধরনটিও উল্লেখযোগ্য। আগের মতো এখনো অন্তত এক বা দুইদিন আগে বাড়ি বাড়ি গিয়ে লোক মারফৎ দাওয়াত দেওয়ার রীতি আছে। বড়সড় আয়োজনে তৎকালীন গ্রামের বাজারে ঢোল পিটিয়ে বা টিনের চোঙি ফুঁকিয়ে দাওয়াতের প্রচলন থাকলেও বর্তমানে আধুনিক যোগাযোগ সুবিধায় কার্ড, মোবাইল ইমেইলে দাওয়াতের সুব্যবস্থা হয়েছে।

আগেই উল্লেখ করেছি চট্টগ্রামবাসী মানুষের মধ্যে আঞ্চলিকতার টান ও পারস্পরিক আন্তরিকতার সম্পর্ক অতুলনীয়। চট্টগ্রামের মানুষ দেশের ভেতরে কিংবা বিদেশ বিভুঁয়ে যেখানে যতদুরে থাকুক না কেন কোনও না কোনওভাবে একত্রিত হওয়ার চেষ্টা করে। এটা এক ঈর্ষণীয় সামাজিক বন্ধন। মানবিকতা ও পারষ্পরিক আন্তরিকতা যেন চৌম্বকীয় আকর্ষণে পরষ্পরকে কাছে টেনে নেয়, একত্রিত করে এবং ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় গড়ে উঠে কল্যাণ ও উন্নয়নমুখি সামাজিক সমবায় সংগঠন। এই ধরনের সংগঠনের মধ্যে বৃহৎ পরিসরের মানবিক ও কল্যাণমুখি সংগঠনটি হয়ে থাকে ‘চট্টগ্রাম সমিতি’। চট্টগ্রামের বাইরে দেশের অভ্যন্তরে কিংবা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চট্টগ্রাম সমিতির অস্তিত্ব বিদ্যমান। ঢাকাস্থ চট্টগ্রাম সমিতির নাম ও খ্যাতি বিশ্বব্যাপি। এই সমিতির ইতিহাস প্রায় শতবর্ষের। ১৯১২ সালের দিকে অবিভক্ত ভারতের কলকাতায় এটি গঠিত হয় এবং দেশ ভাগের পরে স্থানন্তরিত হয়ে পর্যায়ক্রমে দুই তিন দফা নাম পরিবর্তন করে ১৯৬৩ সালের দিকে চট্টগ্রাম সমিতি ঢাকা নামে প্রতিষ্ঠিত হয়। যেহেতু চট্টগ্রামের সংগঠন মানে হৃদয়ের মেলা ও তার বহিঃপ্রকাশ মেজ্জান তাই ঢাকাতেও তার ব্যতিক্রম হয়নি এবং ১৯৭৮ সাল থেকে নিয়মিতভাবে প্রায় ৩০/৩৫ হাজার মানুষের মিলন মেলায় অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে সেখানে মেজ্জান ঊৎসব।

স্বাধীন জাতি হিসেবে বাংলাদেশীদের প্রবাস জীবনের বয়স প্রায় চার দশকেরও বেশি। মধ্যপ্রাচ্যর দেশগুলিতে বাংলাদেশী প্রবাসীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রবাসী চট্টগ্রাম অঞ্চলের। বলতে গেলে সফল ব্যবসায়ী কম্যুনিটি চট্টগ্রামের। পাশাপাশি অনেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও মন্ত্রণালয়ে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার ও পেশাজীবী হিসেবে কর্মরত আছেন। এই প্রবাসী চট্টগ্রামবাসীদের কাছে কমপক্ষে বছরে একবার হলেও মেজ্জান আয়োজনের ব্যবস্থা হয়ে থাকে যা প্রকারান্তরে বিদেশের মাটিতে শত প্রতিকূলতার মধ্যেও পরিবার পরিজন নিয়ে এক মহামিলনের উপলক্ষ্য হয়ে থাকে।

লেখক: প্রাবন্ধিক, শিশুসাহিত্যিক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধচট্টগ্রামের জলাশয় : যার সাথে অস্তিত্ব জড়িত
পরবর্তী নিবন্ধচট্টগ্রামের প্রাচীন হাট-বাজার