চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানে অশ্লীলতা

নাসির উদ্দিন হায়দার | সোমবার , ২৫ মে, ২০২৬ at ৯:২৭ পূর্বাহ্ণ

(দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব)

মোহাম্মদ নাসির ছিলেন চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের প্রথম বিশ্বায়নের নায়ক। ১৯৩২ সালে এইচএমভি থেকে বের হওয়া গ্রামোফোন রেকর্ডে তিনি গেয়েছিলেন, ‘চাঁন মুখে মধুর হাসি/দেবাইল্যা বানাইল মোরে সাম্পানের মাঝি।’ ’৯০ দশক পর্যন্ত লন্ডনের বিখ্যাত রয়েল আলবার্ট হলে বাংলাদেশের মাত্র দুইজন শিল্পী গান গাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন, তাদের একজন রুনা লায়লা, অপরজন শেফালী ঘোষ। গত দুই দশক ধরে আবদুল গফুর হালীর জীবন ও গান নিয়ে আমেরিকা জার্মানিতে মূল্যবান গবেষণা হচ্ছে। আজ সেই আঞ্চলিক গান কেন অশ্লীলতায় আক্রান্ত?

চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানে ‘রঙ্গরসাত্মক’ একটা ধারা আছে। এই ধারার গানে অপরূপ রূপে এসেছে ভাবীদেবরের খুনসুঁটি, তালতভাইতালতবৈনের নিটোল প্রেম। আবার শ্যামশেফালী স্বামীস্ত্রীর ভূমিকায় রসের ভিয়েন দিয়ে দ্বৈত আঞ্চলিক গান করতেন। এসব গান সুজনের কাছে রসবোধের পরিচায়ক, দুর্জনের কাছে ‘স্থুল’। কিন্তু মূলধারার আঞ্চলিক গানকে ‘অশ্লীল’ বলার কোন সুযোগ নেই। আমাদের আঞ্চলিক গান রসাত্মক হতে পারে, কিন্তু আদি রসাত্মক নয়।

কিন্তু ওই যে বলেছি, পেকুয়া এলাকার একজন শিল্পী যখন গাইতে থাকে…‘হাত গলাই দি চিন্ডা মারে বেলউচর ভিতর/এ্যান কা গরর হইলে হদে গরিদ্দে আদর’এই গান তো অবশ্যই অশ্লীল । কিন্তু এটা কি আসলে গান? যে গায় সে কি শিল্পী? এইসব অশ্লীল ‘কাওয়া আঞ্চলিক’ গানের সাথে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী আঞ্চলিক গানকে এক করে দেখা কি উচিত? তবে সেটাই যে গত অর্ধশতাব্দী ধরে হয়ে আসছে, সে কথা শুনুন ‘কইলজার ভিতর গাঁথি রাইখ্যুম তোঁয়ারে’ গানের স্রষ্টা এমএন আখতারের মুখে। ‘আদি আমলে সংগীতমোদী রসিক লোকেরা দোভাষাভাষী যেসব রসালো শব্দের সংমিশ্রণে আঞ্চলিক গান তৈরি করতেন সেসব গান পরবর্তী প্রজন্মের কাছে কাউয়া আঞ্চলিক নামে তথা অশ্লীল ও অপসংস্কৃতি বলে গণ্য হতো।’ (সূত্রমানবদরদী সুরসাধাক এমএন আখতারের গান)

আসলে একশ্রেণীর মানুষের কাছে আঞ্চলিক গান মানেই অশ্লীল। তাই এমএন আখতারদের মতো শিল্পীকে সেই সত্তরের দশকেও রাস্তায় টিটকারি মারত, তাকে দেখলেই আক্রোশে গেয়ে উঠত, ‘ও নাসিমন কও কি কারণ/শাড়ি পিনতে লাগে যদি এতক্ষণ’ অথবা ‘ও পরানের তালভাই/চিডি দিলাম পত্র দিলাম নঅ আইলা কিল্লাই।’ আচ্ছা, এসব গানে অশ্লীলতা কোথায়? আদিরস কোথায়?

কেউ কেউ এমএন আখতারের ‘ও চোড দেওরা ভাই/আলগা কথা ন হইও বারবার’, মলয় ঘোষ দস্তিদারের ‘ঢেংকুরকুর ঢেংকুরকুর/ঢেউত পল্লত পরে/সুন্দরীর ঠেঙ্গর চাবে/ঢেঁই স্বর্গত চড়ে’ অথবা আবদুল গফুর হালীর ‘আইলা অসমত বেইন্যা ফজরত/এন সুন্দর রাইত্তান কাডাইলা তার ঘরত’ গানের উদাহারণ দিতে পারেন। বলতে পারেন এগুলো কি অশ্লীল নয়? আগেই বলেছি ‘রঙ্গরস’ আর ‘আদি রস’ কিন্তু এক জিনিস নয়। উপরে উল্লিখিত গানগুলো প্রায় ৪০৫০ বছর ধরে তুমুল জনপ্রিয়। এগুলো চিরসবুজ আঞ্চলিক গান। যদি এসব গানকে অশ্লীল বলা হয়, তাহলে বাংলা গানের কিংবদন্তী শিল্পী রুনা লায়লার নিচের গানটিকে কী বলবেন?

আমার রসের দেওরা বাড়ির কাছে

প্রেমের নদী ডুব দিলানা।

রিমিঝিমি বৃষ্টি পড়ে আর তো থামে না,

ভিজ্যা গেল শাড়ি আমার চাইয়াও দেখলা না।।।

কত জায়গায় গেলা তুমি দিল্লি গেলা না

দেওরা পানসুপারি খাইলা, মধু খাইলা না।।’

(কথা ও সুর : হাসান মতিউর রহমান, অ্যালবাম ‘অন্তরে প্রেম’।’)

অশ্লীল আঞ্চলিক গানের অনেক শিল্পীকে আমি চিনি, নাম উচ্চারণ করতে চাই না। কারণ সব গান গান নয়, সব শিল্পী শিল্পী নয়। দর্শকশ্রোতার রুচির উপর নির্ভর করে শিল্প তৈরি হয়। শিল্পের সব শাখায়ই অশ্লীলতা আছে। কিন্তু বর্তমানে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানে অশ্লীলতার মহামারি চলছে। এর কারণ আঞ্চলিক গানে এখন বড় ধরনের শূন্যতা চলছে। এই গানের কিংবদন্তী শিল্পী, গীতিকার ও সুরকাররা প্রায় সবাই পরপারে। দিকপাল হিসাবে পরিচিত শিল্পী কল্যাণী ঘোষ, বুলবুল আকতার, সিরাজুল ইসলাম আজাদরাও এখন বয়সী বট। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলো সব বন্ধ হয়ে হয়ে গেছে। আঞ্চলিক গানে সাড়া জাগানো কোন শিল্পী তৈরি হচ্ছে না, শ্রোতার মনজয়ী কোন গানও আসছে না। এই ফাঁকে চলছে আগাছার দাপট। আঞ্চলিক গানকে বাঁচাতে হলে পৃষ্ঠপোষকতা জরুরি। আগের অডিও শিল্পের চেয়ে বর্তমানের ফেসবুকইউটিউব অনেক বেশি শক্তিশালী। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই হবে আঞ্চলিক গানের নবজাগরণএটা আমার বিশ্বাস।

লেখক: চট্টগ্রামের লোকসংগীত গবেষক ও সাংবাদিক

পূর্ববর্তী নিবন্ধরাশেদ রউফ – এর অন্ত্যমিল
পরবর্তী নিবন্ধআব্বার শেষ হাসি