চট্টগ্রামে আবারও গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। চাহিদার তুলনায় প্রায় অর্ধেক গ্যাস সরবরাহ পাওয়ায় নগরীর বাসাবাড়ি, সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশন, শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে এর প্রভাব পড়েছে। কোথাও চুলা মিটমিট করে জ্বলছে, কোথাও একেবারেই জ্বলছে না। গ্যাসের চাপ কম থাকায় নগরীর বিভিন্ন সিএনজি স্টেশনে গাড়ির দীর্ঘ লাইন তৈরি হচ্ছে। শিল্পকারখানায় উৎপাদন কমছে। একই সঙ্গে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বিদ্যুৎ সংকটের চাপও বাড়ছে।
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম অঞ্চলে বর্তমানে গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে গত কয়েক দিনে সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় ২১০ মিলিয়ন ঘনফুটে। অর্থাৎ দৈনিক ঘাটতি প্রায় ১৯০ মিলিয়ন ঘনফুট। সরবরাহ চাহিদার মাত্র ৫২ দশমিক ৫ শতাংশ।
গ্যাস সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রামের গ্যাস সংকটের মূল কারণ এখন অনেকটাই কাঠামোগত। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো চট্টগ্রামে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রের সরবরাহের ওপর নির্ভর করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সুযোগ সীমিত। চট্টগ্রামের গ্যাস সরবরাহ মূলত মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে আসা আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরশীল। মহেশখালীতে একটি টার্মিনাল পরিচালনা করে মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি এবং অপরটি সামিট এলএনজি। দুটি টার্মিনাল মিলিয়ে স্বাভাবিক সময়ে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব। চট্টগ্রামের গ্যাস সরবরাহে এ দুই টার্মিনালের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এই দুই টার্মিনালে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে চট্টগ্রাম গ্যাস পায়, বন্ধ হলে গ্যাস সংকট হয়।
এই নির্ভরশীলতার ঝুঁকি আগে চট্টগ্রাম টের পেয়েছে, এবারও পাচ্ছে। ২১ জুলাই মহেশখালীর এঙিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর টার্মিনালটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এতে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। টার্মিনালটি সাধারণত প্রতিদিন প্রায় ৫০০ থেকে ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করত।
প্রায় দুই সপ্তাহ বন্ধ থাকার পর ৬ আগস্ট টার্মিনালটির একটি বয়লার আংশিকভাবে চালু করা হয়। তখন ১১৫ মিলিয়ন ঘনফুট পুনঃগ্যাসীকৃত এলএনজি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ শুরু হয়। অর্থাৎ টার্মিনালটি চালু হলেও পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে পারেনি। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা ক্ষতিগ্রস্ত বৈদ্যুতিক, নিয়ন্ত্রণ ও ইন্সট্রুমেন্টেশন ব্যবস্থার মেরামত এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ প্রতিস্থাপনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। পরে জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে। দুটি এফএসআরইউ মিলিয়ে ৭৫০ থেকে ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে আসছিল। কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে সরবরাহ বাড়লেও চট্টগ্রামে এর সুফল পৌঁছেনি। এখানেই চট্টগ্রামের গ্যাস ব্যবস্থার দুর্বলতাটি সামনে এসেছে। মহেশখালীর টার্মিনাল থেকে এলএনজি জাতীয় গ্রিডে ঢোকার পর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে গ্যাস বণ্টন করা হয়। ফলে চট্টগ্রামের জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ নিশ্চিত না হলে টার্মিনাল আংশিক চালু হলেও নগরীর গ্রাহকেরা তার সুফল পান না। সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে সেটিই ঘটছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
চট্টগ্রামের গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি নাজুক হওয়ায় শিল্প, বাণিজ্যিক এবং আবাসিক গ্রাহকদের দুর্ভোগ বেড়েছে। গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক অভিঘাত পড়ছে শিল্প খাতে। চট্টগ্রামের অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান উৎপাদনের জন্য গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে ক্যাপটিভ পাওয়ারের মাধ্যমে নিজেদের বিদ্যুৎ উৎপাদন করা শিল্পকারখানাগুলোতে গ্যাসের চাপ কমে গেলে একসঙ্গে জ্বালানি সংকট এবং বিদ্যুৎ সংকট তৈরি হয়।
গ্যাসের চাপ কম থাকায় শিল্পকারখানার বয়লার, চুল্লি ও জেনারেটর পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। ফলে উৎপাদন কমে যাচ্ছে। কোনো কোনো কারখানায় শিফট কমানো হচ্ছে, আবার কোথাও উৎপাদন আংশিক বন্ধ রাখার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। গ্যাসনির্ভর শিল্পের ক্ষেত্রে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করলে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। ফলে গ্যাস সংকট দীর্ঘায়িত হলে চট্টগ্রামের শিল্পকারখানাগুলো প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হারানোর পাশাপাশি সময়মতো পণ্য রপ্তানি করতে ব্যর্থ হবে, যা কর্মসংস্থানের ওপর সরাসরি চাপ তৈরি করতে পারে বলে শিল্পপতিরা জানিয়েছেন।
অন্যদিকে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনগুলোতে ভোগান্তি হচ্ছে। পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় অনেক স্টেশন চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস দিতে পারছে না। ফলে গাড়ি নিয়ে স্টেশনের সামনে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও একাধিক সারিতে গাড়ির জট তৈরি হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে গণপরিবহন ও ব্যক্তিগত পরিবহনে। গ্যাসের জন্য অতিরিক্ত সময় অপেক্ষা করায় যানবাহনের চলাচল ব্যাহত হচ্ছে এবং যাত্রীদেরও দুর্ভোগ বাড়ছে।
গ্যাস সংকটের সঙ্গে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির সম্পর্কও সরাসরি। চট্টগ্রাম অঞ্চলের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। সাম্প্রতিক সময়ে শিকলবাহা ২২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনের জন্য প্রায় ৩৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হলেও সরবরাহ পাওয়া গেছে ২৮ থেকে ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে কেন্দ্রটির উৎপাদন সক্ষমতার তুলনায় কম ছিল। একই সময়ে রাউজানের দুটি ২১০ মেগাওয়াট ইউনিট দীর্ঘদিন বন্ধ রয়েছে।
আবাসিক গ্রাহকদের দুর্ভোগও প্রকট। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় দিনের বড় একটি সময় চুলায় গ্যাসের চাপ থাকে না। কোথাও আগুন জ্বলছে মিটমিট করে, কোথাও একেবারেই জ্বলছে না। বিশেষ করে উঁচু ভবন এবং গ্যাস লাইনের শেষ প্রান্তের বাসিন্দাদের দুর্ভোগ বেশি। ফলে অনেক পরিবারকে বাধ্য হয়ে এলপিজি সিলিন্ডার, বৈদ্যুতিক চুলা কিংবা অন্যান্য বিকল্প ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
সূত্র বলেছে, চট্টগ্রামের মানুষ এখন একই সঙ্গে দুই ধরনের জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। বাসায় রান্নার গ্যাস নেই, আবার গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎও অনিয়মিত হচ্ছে। নগরীতে প্রতিদিন দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিং করা হচ্ছে। গ্রামাঞ্চলের অবস্থা আরো খারাপ।
চট্টগ্রামের গ্যাস খাতের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, তাৎক্ষণিকভাবে বড় কোনো বিকল্প উৎস নেই। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন দিয়ে চট্টগ্রামের ঘাটতি পূরণ করার মতো অবকাঠামোগত পর্যাপ্ত সক্ষমতা নেই। মহেশখালীর দুটি এফএসআরইউ কার্যত চট্টগ্রামের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার প্রধান এবং একমাত্র ভরসা। ফলে একটি টার্মিনালে দুর্ঘটনা বা কারিগরি ত্রুটি দেখা দিলে তার অভিঘাত সরাসরি এসে পড়ে চট্টগ্রামে। চট্টগ্রামের বর্তমান সংকটের পেছনে আমদানিকৃত এলএনজির ওপর অতিনির্ভরতা এবং জাতীয় গ্রিড থেকে চট্টগ্রামের জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ নিশ্চিত করতে না পারার মতো একাধিক কারণ মুখ্য হয়ে আলোচিত হচ্ছে। শুধু একটি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটির ধকল চট্টগ্রামের গ্যাস সেক্টরকে যেভাবে ভোগাচ্ছে সেটি স্বাভাবিক নয়।
জানা যায়, চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন ধরে নতুন আবাসিক গ্যাস সংযোগ বন্ধ। শিল্পে নতুন সংযোগের চাহিদাও রয়েছে। অথচ বিদ্যমান গ্রাহকদের প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ করা যাচ্ছে না। ফলে নতুন শিল্পায়ন, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চট্টগ্রামকে ঘিরে নতুন নতুন বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের যে আশাবাদ সরকার থেকে ব্যক্ত করা হয়েছে গ্যাস সেক্টরে বিরাজমান পরিস্থিতি তাকে সংকটে ফেলবে।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, চট্টগ্রামের গ্যাস নিরাপত্তার জন্য এখন শুধু মহেশখালীর একটি বা দুটি এফএসআরইউ সচল রাখা যথেষ্ট নয়। বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত পাইপলাইন সক্ষমতা, জাতীয় গ্রিডে চট্টগ্রামের জন্য নির্দিষ্ট সরবরাহ নিশ্চয়তা এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে এলএনজি আমদানির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, টার্মিনালগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা জরুরি।
তারা বলেছেন, মহেশখালীর একটি টার্মিনাল বন্ধ হলে চট্টগ্রামের চুলা নিভে যায়, সিএনজি স্টেশনে গাড়ির লাইন বাড়ে, শিল্পের চাকা ধীর হয়ে যায় এবং গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কমে গিয়ে বিদ্যুৎ সংকটও বাড়ে। অর্থাৎ চট্টগ্রামের গ্যাস ব্যবস্থা এখন এমন এক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে, যেখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ অবকাঠামোর সামান্য বিপর্যয় পুরো নগরীর অর্থনীতি ও জনজীবনে অভিঘাত সৃষ্টি করতে পারে। চট্টগ্রাম দেশের প্রধান বন্দর, বৃহত্তম শিল্পাঞ্চলগুলোর একটি এবং জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। অথচ এই শহরের জ্বালানি নিরাপত্তা যদি একটি–দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের ওপর নির্ভরশীল থাকে, তাহলে ভবিষ্যৎ শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক সম্প্রসারণ নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।












