চট্টগ্রামকে অর্থনৈতিক করিডোর হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, আজ সকালে আমি মাতারবাড়ীসহ চট্টগ্রামের মহেশখালী ও মীরসরাই অঞ্চল পরিদর্শন করেছি। বিশাল সমুদ্র আমাদের জাতীয় সম্পদ। চট্টগ্রাম অঞ্চলকে কেন্দ্র করে দেশি–বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা হচ্ছে। সম্প্রতি চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ অঞ্চলের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যেখানে বহু শিল্প–কারখানা গড়ে উঠবে এবং হাজার হাজার যুবকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
গতকাল রোববার দুপুরে বাঁশখালীর বাহারছড়ায় সমুদ্রসৈকতে জনসভায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন ও সহায়তা প্রদান অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর বাঁশখালীতে এটি প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সফর। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ মাতারবাড়ি গিয়েছিলাম। মীরসরাই থেকে সমগ্র অঞ্চল হেলিকপ্টার থেকে দেখেছি। দেখার কারণ এই বিশাল সমুদ্র বাংলাদেশের সম্পদ। এই সমুদ্রকে ব্যবহার করে দেশের মানুষের জীবন উন্নয়ন করা যায়। মাতারবাড়ি থেকে মীরসরাই পর্যন্ত মিল–কারখানা স্থাপন করে ব্যবসা–বাণিজ্যের ব্যবস্থা করার জন্য আমি মাতারবাড়ি গিয়েছিলাম। আনোয়ারায় চায়নাকে জায়গা দিয়েছি। তারা সেখানে কয়েক শত মিল–কারখানা করবে। সেখানে সমগ্র চট্টগ্রামের মানুষ কাজ করার সুযোগ পাবে। বেকার সমস্যার সমাধান হবে। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করবে। সেই মুদ্রার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি গড়ে তুলবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশ স্বাধীন হয়েছে ৫০ বছরের বেশি সময় আগে। এখন আর পেছনে তাকানোর সুযোগ নেই। এখন কাজ করার ও দেশ গড়ার সময়। তিনি বলেন, নির্বাচনে আমরা যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, সরকার গঠনের এক মাসের মধ্যেই আমরা ফ্যামিলি কার্ডের ব্যবস্থা করব। আমরা তা শুরু করেছি। ফ্যামিলি কার্ডের পাইলট প্রকল্পের কাজ সফলভাবে শেষ হয়েছে এবং চলতি মাসের ১৬ তারিখ থেকে মূল কাজ শুরু হতে যাচ্ছে। আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরে দেশের প্রায় ৪১ লাখ পরিবারের প্রধান নারীদের হাতে এই কার্ড তুলে দেওয়া হবে। বাঁশখালী উপজেলাতেও প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার পরিবার এই সুবিধার আওতায় আসবে।
তিনি বলেন, মা–বোনদের জন্য ফ্যামিলি কার্ডের পাশাপাশি কৃষকদের জন্যও চালু করা হচ্ছে কৃষক কার্ড, যা সাধারণ কৃষকের পাশাপাশি লবণ চাষিরাও পাবেন। লবণ চাষিদের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা ফেরাতে লবণের নতুন মূল্য নির্ধারণের ঘোষণাও শিগগিরই দেওয়া হবে। যার ফলে লবণ চাষি ভাইদের আর আগের মতো কষ্ট পোহাতে হবে না।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত নিয়ে তারেক রহমান বলেন, বিগত স্বৈরাচার আমলে এই দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতকে হাতে গোনা কিছু ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল, যা এই দেশের মানুষের পক্ষে ছিল না। কিছু মানুষের সুবিধার জন্য অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা এই ব্যবস্থাকে জনগণের স্বার্থে পুনর্গঠন করতে কিছুটা সময় প্রয়োজন। আমরা এরই মধ্যে এই কাজ শুরু করেছি। ইনশাআল্লাহ, আগামী ১০ বছরে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা কেমন হবে সেই প্রস্তাবনা আমরা জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করব। তিনি বলেন, আমরা এমন পরিকল্পনা নিচ্ছি, যাতে স্কুল–কলেজ, হাসপাতাল, মিল–কারখানা কিংবা বাসাবাড়ি, সব জায়গায় মানুষ ঠিকভাবে বিদ্যুৎ পায় এবং গাড়ি–মোটরসাইকেলসহ সবকিছুতে মানুষ যেন সহজে গ্যাস পেতে পারে।
সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে চট্টগ্রামের নেতৃত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী স্থানীয়দের ধৈর্য ধারণ ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আপনাদের চট্টগ্রাম থেকে আমরা দুইজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে সরকারের দুটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়েছি, একটি অর্থ মন্ত্রণালয়, আরেকটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। যে অঞ্চলের দুইজন ব্যক্তি এত গুরুত্বপূর্ণ দুটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন, সেই এলাকার উন্নয়ন কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না ইনশাআল্লাহ।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আর পিছনে পড়ে থাকা যাবে না। এখন একটি লক্ষ্য, একটি উদ্দেশ্য, তা হলো জনগণের জীবন মান উন্নত করা। দেশের ভাগ্যের পরিবর্তন করা। আমরা জনগণের জন্য যেসব পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি তাতে আপনাদের সমর্থন থাকতে হবে। কারণ আমরা সব সময় বলি, বিএনপির সকল ক্ষমতার উৎস হচ্ছে জনগণ। জনগণের সমর্থন থাকলে আমরা জনগণের স্বার্থে যতগুলো কর্মসূচি নিয়েছি সবগুলো বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হব।
তিনি বলেন, আমরা চাই বাংলাদেশের ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি শ্রমিকের হাতকে কর্মশক্তিতে রূপান্তর করতে, যাতে করে প্রত্যেকটি মানুষ দেশ গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে। যাতে করে প্রত্যেকটি মানুষ পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজের এবং পরিবারের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে পারে।
অনুষ্ঠানে বাঁশখালীর উন্নয়নে বিভিন্ন দাবি তুলে ধরেন অনুষ্ঠানের সভাপতি দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পাপ্পা। তা বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ পাপ্পার দাবির প্রেক্ষিতে ‘আঁরার ভাইপুত যা চাইয়ে তারতুন বেশি দিলে ওবা কন সমস্যা আছে না?’ এ প্রশ্ন রেখে বলেন, এটা পর্যটন স্পট হয়ে গেছে। লবণের ন্যায্যমূল্য পাওয়া শুরু করেছে। প্রধানমন্ত্রী অচিরেই ঘোষণা করবেন ন্যূনতম দাম কত পাবে। বেড়িবাঁধের উন্নয়নের ব্যাপারেও কথা বলেন। তিনি বলেন, জামায়াত থেকে এমপি হয়েছে বলে এখানে কি কোনো ত্রাণ দেয়নি? বাঁশখালীর উন্নয়নে সকল প্রদক্ষেপ নেওয়া হবে। সাতকানিয়ার এমপি শাহজাহান চৌধুরীকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, আমার বড় ভাই জামায়াতের এমপি। সেখানেও উন্নয়ন বরাদ্দ দেওয়া হবে। কোনো বৈষম্য রাখা হবে না।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বাঁশখালীর দাবিদাওয়া লাগবে না। বর্তমান তারেক রহমানের রাজনীতি ভিন্ন ধারার রাজনীতি। গোটা বাংলাদেশের যুব সমাজ, শিশু, মহিলা, কৃষিজীবী, ব্যবসায়ী, প্রত্যেকটি মানুষের কথা বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ভিন্ন ধারার রাজনীতির মাধ্যমে প্রত্যেকটি মানুষের জন্ম থেকে জীবন ধারণ পর্যন্ত বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেবে। প্রত্যেক মানুষের ঘরে ঘরে যাবে, ফ্যামিলি কার্ড যাবে, কৃষক কার্ড, আলেম ওলামাদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বাঁশখালীর সকল সমস্যা ও উন্নয়ন সরকারের পক্ষ থেকে করা হবে।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বাঁশখালী পৌরসভার সাবেক মেয়র কামরুল ইসলাম হোছাইনী ও বিএনপি নেতা রাসেল ইকবাল মিয়া। উপস্থিত ও বক্তব্য দেওয়া নেতৃবৃন্দের মধ্যে ছিলেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান, মো. এনামুল হক, জসীম উদ্দিন, সাচিংপ্রু জেরি, সরওয়ার নিজাম চৌধুরী, অধ্যক্ষ মুহাম্মদ জহিরুল ইসলাম ও মোহাম্মদ শাহাজাহান চৌধুরী, এনজিও ব্যুরোর মহাপরিচালক ড. মোহাম্মদ জকরিয়া, দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ইদ্রিস মিয়া, সাধারণ সম্পাদক হেলাল উদ্দিন, জহিরুল ইসলাম চৌধুরী আলমগীর, বাঁশখালী উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক মাস্টার মোহাম্মদ লোকমান আহমদ, আমিনুর রহমান চৌধুরী, ইব্রাহিম বিন খলিল, রেজাউল হক চৌধুরী, দেলোয়ার আজিম, অ্যাডভোকেট মো. নাছির উদ্দিন, অ্যাডভোকেট শওকত ওসমান, নাছির উদ্দিন শাওন প্রমুখ।
বানভাসিরা পেলেন নতুন ঘর : বাঁশখালীতে সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের হাতে টিনের নতুন ঘরের চাবি তুলে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল দুপুরে বাহারছড়া ইউনিয়নের পশ্চিম বাঁশখালীতে বন্যা কবলিত এলাকায় গিয়ে সরকারপ্রধান ঘরের চাবি দেন তিনি। বন্যার্তদের পুনর্বাসন ও সহায়তা প্রকল্পে নতুন ১০০ জনের মধ্যে ১০ জনের হাতে ঘরের সরাসরি চাবি হস্তান্তর করেন। ২০০ জননকে খাদ্যসামগ্রী সহায়তা এবং প্রতিবন্ধীদের মাঝে সহযোগিতা প্রদান করেন।
দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে উপস্থিত হওয়ার কথা থাকলেও প্রধানমন্ত্রী ১টা ৩৫ মিনিটে বাঁশখালীতে আসেন। গৃহহারা পশ্চিম বাহারছড়ার বিধবা সাজেদা বেগমের বাড়িতে যান। সেখানে গিয়ে তার নতুন বাড়ি উদ্বোধন এবং গৃহ হস্তান্তর করেন। এ সময় নতুন বাড়ির আঙিনায় একটি মেহগনি গাছের চারাও রোপণ করেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটিকে চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ও হাঁস–মুরগি প্রদান করেন।
গেল মাসের শুরুতে অতি বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে বাঁশখালী উপজেলার বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছি। বন্যায় শত শত মানুষের ঘর–বাড়ি, পুকুর, জলাশয় ও ঘেরের মাছ পানিতে ভেসে যায়।











