চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পরিচালনাগত দক্ষতা, আর্থিক সক্ষমতা, ডিজিটাল রূপান্তর এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় একাধিক ঐতিহাসিক মাইলফলক অর্জন করেছে। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর হিসেবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মোকাবিলায় বন্দরটি কনটেইনার, কার্গো ও জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ে রেকর্ড পরিমাণ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। একই সঙ্গে রাজস্ব উদ্বৃত্ত, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, চ্যানেল ড্রেজিং, সাইবার নিরাপত্তা, স্মার্ট পোর্ট ব্যবস্থাপনা এবং জাহাজের অপেক্ষাকাল শূন্যে নামিয়ে আনার মতো অর্জন চট্টগ্রাম বন্দরকে আঞ্চলিক সামুদ্রিক কেন্দ্র হিসেবে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
চলতি অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দরে মোট ৩৫ লাখ ৩১ হাজার ১১৮ টিইইউস (TEUs) কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ২ লাখ ৩৫ হাজার ৫১ টিইইউস বেশি এবং প্রবৃদ্ধির হার ৭ দশমিক ১৩ শতাংশ। একই সময়ে কার্গো হ্যান্ডলিং বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ কোটি ৮০ লাখ ৭২ হাজার ৮২৬ মেট্রিক টনে, যা আগের বছরের তুলনায় ৭৩ লাখ ৪৮ হাজার ৪৩ মেট্রিক টন বেশি। জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে; ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট ৪ হাজার ৩৩৬টি জাহাজ হ্যান্ডলিং করা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২৫৯টি বেশি।
বন্দরের অপারেশনাল দক্ষতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক জাহাজের অবস্থানকাল বা টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম। এ ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম বন্দর উল্লেখযোগ্য উন্নতি করেছে। কনটেইনারবাহী জাহাজের গড় অবস্থানকাল ২ দশমিক ৫৮ দিন থেকে কমে ২ দশমিক ৩৮ দিনে নেমে এসেছে, যা প্রায় ৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ হ্রাস নির্দেশ করে। এর ফলে শিপিং লাইনের পরিচালন ব্যয় কমেছে এবং বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
আর্থিক ক্ষেত্রেও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ নতুন রেকর্ড গড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বন্দরের মোট রাজস্ব আয় দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৬২৯ কোটি ১৭ লাখ টাকা, যেখানে রাজস্ব ব্যয় কমে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৭৩ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। ফলে রাজস্ব উদ্বৃত্ত বেড়ে হয়েছে ৪ হাজার ৩৫৫ কোটি ২১ লাখ টাকা। একই সময়ে সরকারকে ৯৬০ কোটি ৪ লাখ টাকা কর প্রদান করা হয়েছে। কর-পরবর্তী রাজস্ব উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৩৯৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা, যা বন্দরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
টার্মিনাল ম্যানেজার বিভাগের প্রত্যক্ষ রাজস্ব আদায়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যেখানে আয় ছিল ৩১৭ কোটি ২৭ লাখ টাকার কিছু বেশি, সেখানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে ৪০০ কোটি ৭৪ লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে। এতে প্রবৃদ্ধির হার ২৬ দশমিক ৩১ শতাংশ। একই সঙ্গে রাজস্ব ব্যয় ১৮ শতাংশের বেশি কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। ফলে কর-পরবর্তী ৩ হাজার ৭১৭ কোটি টাকারও বেশি উদ্বৃত্ত অবশিষ্ট রয়েছে, যা ভবিষ্যৎ উন্নয়ন প্রকল্পে বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
চ্যানেল ড্রেজিং ব্যবস্থাপনাতেও ব্যতিক্রমী সাফল্য অর্জন করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। গত ছয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ব্যয়ে প্রতি ঘনমিটার ড্রেজিং খরচ ৩৭৫ দশমিক ৬৭ টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে ৫ দশমিক ৩৫ লাখ ঘনমিটার ড্রেজিংয়ের জন্য মোট ব্যয় হয়েছে মাত্র ২০ কোটি ১০ লাখ টাকা। পরিকল্পিত ড্রেজিং কার্যক্রমের মাধ্যমে গড়ে অন্তত ৪৩ কোটি ৮১ লাখ টাকা সাশ্রয় হয়েছে। পাশাপাশি নগরীর খাল ও জলপথে ড্রেজিং কার্যক্রম পরিচালনার ফলে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রায় ৯০ কোটি টাকা ব্যয় সাশ্রয় হয়েছে এবং জলাবদ্ধতা হ্রাসে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (AI) মনিটরিং ও ড্রেজিং পরিকল্পনা ব্যবস্থাও চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
ডিজিটাল রূপান্তরের ক্ষেত্রে ২০২৫-২৬ অর্থবছর ছিল চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য যুগান্তকারী। বন্দরের সব গেটে শতভাগ ই-গেট পাস ব্যবস্থাপনা চালু করা হয়েছে। এর ফলে ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান চালকদের আর দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে নগদ অর্থ জমা দিতে হচ্ছে না। বিকাশ, নগদ, রকেট ও অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে আগে থেকেই ফি পরিশোধ করে ই-গেট পাস সংগ্রহ করা যাচ্ছে। প্রতিদিন প্রায় ৫ হাজার যানবাহন কিউআর কোড ও বারকোড স্ক্যান করে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বন্দরে প্রবেশ ও প্রস্থান করতে পারছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) ASYCUDA World সিস্টেমের সঙ্গে বন্দরের টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম (TOS)-এর সরাসরি ডাটা সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে বিল অব এন্ট্রি, আইজিএম এবং কনটেইনার ও জাহাজসংক্রান্ত তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে আদান-প্রদান ও ট্র্যাকিং করা সম্ভব হচ্ছে। একই সঙ্গে ই-গেট পাস, ইলেকট্রনিক ডেলিভারি অর্ডার (E-DO), অনলাইন NOC, ই-চালান ও অন্যান্য সেবা শতভাগ পেপারলেস পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দর ‘CPA SKY’ নামে নতুন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু করেছে, যা আমদানি-রপ্তানি ও বন্দর ব্যবস্থাপনাকে একীভূত করেছে। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কাস্টমস, এনবিআর, ব্যাংক, শিপিং এজেন্ট, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডারসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে একটি অভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে রিয়েল-টাইম কনটেইনার ট্র্যাকিং এবং বাংলাদেশ সিঙ্গেল উইন্ডো ও ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডোর সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ সংযুক্তি নিশ্চিত করা হয়েছে।
বৈশ্বিক সাইবার ঝুঁকি মোকাবিলায় চট্টগ্রাম বন্দর অত্যাধুনিক সাইবার সিকিউরিটি সিস্টেম চালু করেছে। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে গড়ে তোলা এ ব্যবস্থায় প্রো-অ্যাকটিভ থ্রেট ডিটেকশন, ডাটা কনফিডেনশিয়ালিটি কন্ট্রোল, রিয়েল-টাইম সাইবার ইন্টেলিজেন্স, অ্যান্টি-ডিডস (DDoS) সুরক্ষা, নেটওয়ার্ক নজরদারি, ফরেনসিক আর্কাইভিং এবং ২৪ ঘণ্টা নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে বন্দরের ডিজিটাল অবকাঠামো আন্তর্জাতিক মানের সুরক্ষা পেয়েছে।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও চট্টগ্রাম বন্দর গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি অর্জন করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বন্দরের IORIS প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের জাতীয় ফোকাল পয়েন্ট হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরকে মনোনীত করেছে। এর মাধ্যমে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের সামুদ্রিক তথ্য আদান-প্রদানে বাংলাদেশ একটি কেন্দ্রীয় অবস্থান লাভ করেছে।
চট্টগ্রাম বন্দর আবারও ‘জিরো ওয়েটিং টাইম’ অর্জন করেছে, যা দেশের বন্দর ব্যবস্থাপনায় এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এর ফলে জাহাজগুলোকে আর বহির্নোঙরে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে না। গত সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে জিরো ওয়েটিং টাইম বজায় রাখা হয়। কিছু সময় ব্যাঘাত ঘটলেও পুনরায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা সম্ভব হয়েছে। ঈদুল আজহার ছুটির মধ্যেও ২৪ ঘণ্টা অপারেশন চালিয়ে অপেক্ষমাণ জাহাজের সংখ্যা শূন্যে নামিয়ে আনা হয়েছে। এর ফলে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে গতি এসেছে, লজিস্টিক ব্যয় কমেছে এবং ভোক্তাপর্যায়ে পণ্যের মূল্য হ্রাসে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনাতেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কোস্টগার্ড পরিচালিত আন্তর্জাতিক বন্দর নিরাপত্তা মূল্যায়নে (IPS Team Inspection) চট্টগ্রাম বন্দর ‘জিরো অবজারভেশন’ অর্জন করেছে। অর্থাৎ পরিদর্শনে কোনো আপত্তি বা নেতিবাচক পর্যবেক্ষণ পাওয়া যায়নি। বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, আইএসপিএস কোড বাস্তবায়ন, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক মান অনুসরণের বিষয়ে ইতিবাচক মূল্যায়ন করা হয়েছে।
বহির্নোঙরে সশস্ত্র ডাকাতি ও চুরির ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। এ জন্য বাধ্যতামূলক পোর্ট ওয়াচম্যান নিয়োগ, বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের যৌথ টহল, ভিটিএমআইএস প্রযুক্তির মাধ্যমে নজরদারি, নৌ-পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বিত কার্যক্রম এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখা হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনের আস্থা বৃদ্ধি পেয়েছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০৪০ সালের মধ্যে কার্গো হ্যান্ডলিং ৩০ কোটি ৭০ লাখ মেট্রিক টন এবং কনটেইনার হ্যান্ডলিং ৮ দশমিক ৭ মিলিয়ন টিইইউসে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনে বে-টার্মিনাল, ডিপ সি কনটেইনার টার্মিনাল, মাল্টিপারপাস টার্মিনাল, হেভি লিফট কার্গো জেটি এবং অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি সড়কের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে রেল ও নৌপথে পণ্য পরিবহনের অংশ বাড়ানোর কৌশল নেওয়া হয়েছে।
সার্বিকভাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছর চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য রেকর্ড সাফল্যের বছর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পরিচালন দক্ষতা, আর্থিক সক্ষমতা, ডিজিটাল আধুনিকায়ন, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, সাইবার নিরাপত্তা এবং জিরো ওয়েটিং টাইম অর্জনের মাধ্যমে বন্দরটি নিজেকে একটি আধুনিক, স্মার্ট ও আঞ্চলিক বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেছে।












