২৫ বছরে ২০ লাখ এসএমই উদ্যোক্তা তৈরি করেছে ব্র্যাক ব্যাংক

সৈয়দ আব্দুল মোমেন | বুধবার , ১ জুলাই, ২০২৬ at ৬:২৫ পূর্বাহ্ণ

প্রশ্ন : এখন পর্যন্ত সিএমএসএমই খাতে ব্র্যাক ব্যাংক কী কী সাফল্য অর্জন করেছে? আপনারা আরও কী ভালো করতে পারতেন?

উত্তর : আমাদের দূরদর্শী প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদ ব্যাংকিং সেবার আওতার বাইরে থাকা ‘মিসিং মিডল’ বা মাঝারি স্তরের বঞ্চিত উদ্যোক্তাদের কাছে এই সেবা নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। সেই চিন্তার ধারাবাহিকতা থেকেই ২০০১ সালে ব্র্যাক ব্যাংকের জন্ম। যাত্রার শুরু থেকে বাংলাদেশে এসএমই ব্যাংকিংয়ের প্রবর্তক হিসেবে ব্র্যাক ব্যাংক ক্ষুদ্র ব্যবসা, বিশেষ করে মফস্বল ও গ্রামীণ এলাকায় সহজে ঋণ পাওয়া নিশ্চিত করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। দীর্ঘ ২৫ বছরের যাত্রায় ব্র্যাক ব্যাংক এখন কুটির, অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে (সিএমএসএমই) বাংলাদেশের বৃহত্তম মর্টগেজ বিহীন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান। এখন পর্যন্ত আমরা ২০ লাখের বেশি গ্রাহককে ২ লাখ কোটি টাকা সিএমএসএমই ঋণ দিয়েছি। এসব ঋণের ৮৫ শতাংশের বেশি ক্ষেত্রে কোনো মর্টগেজ নেওয়া হয়নি। এভাবেই আমরা ২০ লাখ পরিবারের কোটি মানুষের জীবন স্পর্শ করতে সক্ষম হয়েছি, যা আমাদের কাছে সাধারণ ব্যাংকিংয়ের চেয়েও বড় কিছু। আমরা দেশের প্রতিটি তৃণমূল পর্যায়ের উদ্যোক্তার পরিপূর্ণ ব্যাংকিং ও আর্থিক অংশীদার হতে চাই।

সিএমএসএমই উদ্যোক্তাদের দক্ষতা উন্নয়নে গতানুগতিক ব্যাংকিংয়ের বাইরে গিয়ে আমরা নানামুখী সেবা দিয়ে থাকি। ব্র্যাক ব্যাংকের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি, নেটওয়ার্কিং ও বাজারে প্রবেশের সুবিধা দেওয়াসহ বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দেওয়া হয়। এছাড়াও ‘উদ্যোক্তা ১০১’ এবং ‘আমরাই তারা’ এর মতো আমাদের দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক সাফল্য পেতে প্রয়োজনীয় জ্ঞান এবং দক্ষতা এনে দেয়। পাশাপাশি আমরা উদ্ভাবনী ডিজিটাল লোন প্রোডাক্ট যেমন-‘সাফল্য’, ‘জীবিকা’ এবং বৈদেশিক রেমিট্যান্সকে উৎসাহিত করতে ‘স্বাবলম্বী’ চালু করেছি।

দেশের সব ব্যাংকের চেয়ে এগিয়ে থাকার পরও, পুরো দেশের সব সিএমএসএমই উদ্যোক্তাকে আনুষ্ঠানিক আর্থিক চ্যানেলের আওতায় নিয়ে আসতে আমাদের আরও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে, কারণ আমাদের দেশে সিএমএসএমই উদ্যোক্তাদের সংখ্যা বিশাল। অবশ্য আমাদের ইন্টারনেট ব্যাংকিং অ্যাপ ‘আস্থা’, স্বয়ংক্রিয় লোন অরিজিনেশন সিস্টেম ‘ইল্যাপ’, এসএমই ট্রানজ্যাকশন ব্যাংকিং প্ল্যাটফর্ম বিজ’পে এবং ডিজিটাল লোনসহ উন্নত ডিজিটাল অবকাঠামো নির্মাণ করার কারণে আমরা এখন অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় প্রত্যন্ত অঞ্চলের উদ্যোক্তাদের কাছে আরও দ্রুত পৌঁছাতে পারছি।

ব্র্যাক ব্যাংকের সিএমএসএমই গ্রাহকেরা ডিজিটাল সলিউশনের মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবা দ্রুত, সাশ্রয়ী ও আরও সহজে পাচ্ছেন। এছাড়াও এসএমই খাতের উন্নয়নকে আরও ত্বরান্বিত, আধুনিকায়ন ও উদ্যোক্তা বিকাশের লক্ষ্যে দেশের সর্বপ্রথম ব্যাংক হিসেবে সমপ্রতি ‘এসএমই ইনোভেশন ল্যাব’ চালু করেছে ব্র্যাক ব্যাংক। এর ফলে আগামী দিনগুলোতে উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন নতুন উদ্ভাবনী সেবা চালু করা সম্ভব হবে।

প্রশ্ন : আগামী পাঁচ বছরে ব্র্যাক ব্যাংকের এসএমই ব্যবসা কোথায় নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন? আপনি এ নিয়ে কতটা আত্মবিশ্বাসী?

উত্তর : বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যাংক হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে ব্র্যাক ব্যাংক। এই পথে আমাদের কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এসএমই ব্যাংকিং। বর্তমানে ব্র্যাক ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৪৭ শতাংশই এসএমই খাতে। গত কয়েক বছরে এই এসএমই খাত প্রায় ২০শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। ব্র্যাক ব্যাংক সবসময় তৃণমূল পর্যায়ের সিএমএসএমই উদ্যোক্তাদের সহজে অর্থায়নের সুযোগ দিতে চায়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে আমাদের এসএমই ঋণ পোর্টফোলিও ৩৪,৯১১কোটি টাকা এবং আমানত পোর্টফোলিও ১৮,৯৮৭ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় যথাক্রমে ১৪% এবং ৩৩% বেড়েছে। দেশের চ্যালেঞ্জিং অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই আমাদের এই অর্জন। আমরা আগামী বছরগুলোতেও এ ধরনের প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে চাই। বর্তমানে দেশে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মোট এসএমই অর্থায়নের ২২% শতাংশই আমাদের, যা আগামী পাঁচ বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।

প্রশ্ন : ব্যাংকগুলো ডিজিটাল দিক থেকে অনেক অগ্রসর হয়েছে, কিন্তু এসএমই খাত এ দিক থেকে পিছিয়ে। এসএমই ডিজিটাইজেশন সম্পর্কে আপনাদের পরিকল্পনা কী?

উত্তর: বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিন ধরে ডিজিটাল রূপান্তর মূলত রিটেইল ও কর্পোরেট ব্যবসাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। তবে এসএমই খাতকে ডিজিটাল ব্যবস্থায় রূপান্তর করা ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে ব্র্যাক ব্যাংক প্রথমবারের মতো এসএমই খাতেও ডিজিটাইজেশন নিয়ে এসেছে। ব্যবসায়িক অ্যাকাউন্ট খোলা সহজ করতে চালু হয়েছে ডিজিটাল অনবোর্ডিং। গত এক বছরে ৫০ হাজার এসএমই উদ্যোক্তার অ্যাকাউন্ট ডিজিটালি খোলা হয়েছে। উদ্যোক্তারা এখন আস্থা অ্যাপ ব্যবহার করেই তাদের লেনদেন সম্পন্ন করছেন, যেখানে মোট লেনদেনের ৬৫% এরও বেশি এসএমই গ্রাহকরা করেন। পাশাপাশি বিজপে ট্রানজ্যাকশন ব্যাংকিং সল্যুশন চালু হয়েছে, যা বাল্ক পেমেন্ট, চালান, ইউটিলিটি বিল, এক ক্লিকে বেতন প্রদান এবং বৃহৎ অঙ্কের লেনদেনকে আরও সহজ করেছে।

এসএমই ব্যাংকিংয়ের বিকাশে উন্নত প্রযুক্তি অপরিহার্য। ব্র্যাক ব্যাংক ইতোমধ্যেই ইল্যাপ সিস্টেমের মাধ্যমে ডিজিটাল এসএমই ঋণ প্রক্রিয়াকরণ চালু করেছে, যা ঋণের আবেদন প্রক্রিয়াকে সহজ করেছে, উৎপাদনশীলতা বাড়িয়েছে এবং ঋণ পাওয়ার সময় কমিয়েছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য চালু হয়েছে দেশের প্রথম ডকুমেন্টলেস রিয়েলটাইম ডিজিটাল এসএমই ইঋণ ‘সাফল্য’ এবং ‘জীবিকা’। এর ফলে অতি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা আধুনিক ব্যাংকিং সুবিধা পাচ্ছেন, যা আগে সম্ভব ছিল না। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী বাংলা কিউআর সেবা দেশব্যাপী সমপ্রসারণের কাজ চলছে, যাতে সিএমএসএমই উদ্যোক্তারা সহজে ডিজিটাল লেনদেন করতে পারেন। একইসঙ্গে বড় শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত সিএমএসএমই উদ্যোক্তাদের ক্যাশ ক্রাঞ্চ সমস্যা সমাধানে সাপ্লাই চেইন ফাইন্যান্সিং প্রোডাক্ট আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে। ব্র্যাক ব্যাংকের লক্ষ্য স্পষ্ট ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে প্রোডাক্ট ও প্রক্রিয়ার আধুনিকায়ন, গ্রাহককেন্দ্রিক উদ্ভাবনী সল্যুশন এবং সাপ্লাই চেইন ফাইন্যান্সিংয়ের উন্নয়ন। এর মাধ্যমে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ব্যবসাকে আরও টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক করে তোলা হবে।

প্রশ্ন : গত এক বছরে আপনারা কি নতুন কোনো প্রোডাক্ট নিয়ে এসেছেন? আগামী ৫ বছরে প্রোডাক্ট ইনোভেশনে আপনাদের পরিকল্পনা কী?

উত্তর : বিগত এক বছরে এসএমই ব্যাংকিং সেবাকে আরও সহজ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে আমরা যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছি। আমাদের ডিজিটাল লোন প্রোগ্রাম ইতোমধ্যেই ২৩,০০০এরও বেশি ব্যাংকবহির্ভূত ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকে কাগজবিহীন ইঋণ ও জীবিকা ঋণ প্রদান করেছে। নৌপথ পরিবহন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে চালু হয়েছে বিশেষ ঋণ প্রোডাক্ট ‘তরঙ্গ’, যা ভেসেল ফাইন্যান্সিংকে ত্বরান্বিত করে দেশের সাপ্লাই চেইনকে আরও সুসংহত করছে। প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবনের ধারাবাহিকতায় এসেছে ‘স্বাবলম্বী’রেমিট্যান্সভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য রিয়েলটাইম ঋণ সুবিধা। পাশাপাশি কুটির ও অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য ডিজিটাল কালেকশন ও কিউআর কোড পেমেন্ট সুবিধা সমপ্রসারিত হয়েছে।

আমরা চালু করেছি ডিজিটাল অনবোর্ডিং, যা এসএমই অ্যাকাউন্ট খোলাকে দ্রুত ও সহজ করেছে। এছাড়া বিজপে ট্রানজ্যাকশন ব্যাংকিং প্ল্যাটফর্ম এসএমই লেনদেনকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। আগামী পাঁচ বছরে আমাদের লক্ষ্য আরও বড়আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এবং ডেটাভিত্তিক ক্রেডিট স্কোরিংয়ের মাধ্যমে এসএমই ব্যবসায় রূপান্তর। উদ্যোক্তাদের ক্যাশফ্লো ও ডিজিটাল লেনদেনের ইতিহাস বিশ্লেষণ করে মুহূর্তেই ঋণের যোগ্যতা নির্ধারণ সম্ভব হবে। আমরা এগিয়ে যাচ্ছি গ্রিন ফিন্যান্সিং, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য আধুনিক ‘তারা’ পোর্টফোলিও, এবং দেশের প্রথম ‘এসএমই ইনোভেশন ল্যাব’ এর মাধ্যমে সাপ্লাই চেইন ফাইন্যান্সিংয়ে নতুন ডিজিটাল সমাধান নিয়ে।

সৈয়দ আব্দুল মোমেন

অ্যাডিশনাল ম্যানেজিং ডিরেক্টর অ্যান্ড হেড অব এসএমই ব্যাংকিং, ব্র্যাক ব্যাংক

পূর্ববর্তী নিবন্ধবিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে এনসিটি ও সিসিটি ইজারা না দেয়ার দাবি