গর্ভের সন্তানের লিঙ্গপরিচয় প্রকাশ অবৈধ : হাই কোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়

| মঙ্গলবার , ১২ মে, ২০২৬ at ৭:২২ পূর্বাহ্ণ

গর্ভের সন্তান ছেলে না মেয়ে, তা পরীক্ষার মাধ্যমে নির্ধারণ ও তা প্রকাশ করাকে অবৈধ, বৈষম্যমূলক ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করে দেওয়া হাই কোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হয়েছে। সব হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের এ সংক্রান্ত রিপোর্টের তথ্য সংরক্ষণের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে আগামী ছয় মাসের মধ্যে একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে রায়ে। বিচারপতি নাইমা হায়দার ও বিচারপতি কাজী জিনাত হকের হাই কোর্ট বেঞ্চ ২০২৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি সংক্ষিপ্ত রায় দিয়েছিল। ২০২০ সালের ২৬ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান গর্ভের শিশুর লিঙ্গ পরিচয় প্রকাশ বন্ধের নির্দেশনা চেয়ে একটি রিট আবেদন করেন। অ্যাডভোকেট ইশরাত নিজেই রিটের পক্ষে শুনানি করেন, তাকে সহযোগিতা করেন অ্যাডভোকেট তানজিলা রহমান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অমিত দাশ গুপ্ত। খবর বিডিনিউজের। রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপিতে অনাগত শিশুর লিঙ্গপরিচয় প্রকাশ বন্ধে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছে হাই কোর্ট। রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, আল্ট্রাসনোগ্রাফি ও অন্যান্য ডায়াগনস্টিক প্রযুক্তির ‘অপব্যবহার’ করে গর্ভের সন্তানের লিঙ্গপরিচয় নির্ধারণের প্রবণতা বাড়ছে। এর ফলে কন্যাভ্রূণ হত্যা, লিঙ্গ ভারসাম্যহীনতা এবং নারীদের বিরুদ্ধে বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে। এটি অনাগত শিশু ও মায়ের জীবনের অধিকার এবং মর্যাদার সরাসরি লঙ্ঘন।

সংবিধানের ১৮, ২৭, ২৮, ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদের কথা তুলে ধরে আদালত বলেছে, অনাগত শিশুর লিঙ্গ নির্ধারণ জন্মের আগেই বৈষম্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। কেবল লিঙ্গের ভিত্তিতে জীবন ধ্বংস করার সুযোগ তৈরি করা সুস্পষ্টভাবে অসাংবিধানিক। সংবিধানে বর্ণিত জীবনের অধিকার বলতে স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা এবং মর্যাদাপূর্ণ অস্তিত্বকেও বোঝায়। রায়ে বলা হয়, বাংলাদেশ জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ (সিআরসি) এবং সিডিও সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ। নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি বৈষম্য দূর করা রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা। লিঙ্গপরিচয় প্রকাশ ও এর মাধ্যমে বৈষম্য সৃষ্টি করা এসব আন্তর্জাতিক চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

ভারতের ‘পিসিপিএনডিটি অ্যাক্ট, ১৯৯৪’এর উদাহরণ টেনে রায়ে বলা হয়, ভারত, চীন, নেপাল, ভিয়েতনাম ও ইউরোপের অনেক দেশে চিকিৎসাগত কারণ ছাড়া ভ্রূণের লিঙ্গপরিচয় নির্ধারণ আইন করে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। রায়ে সতর্ক করে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল আইন, ২০১০ অনুযায়ী চিকিৎসকদের নৈতিক মানদণ্ড মেনে চলা বাধ্যতামূলক। চিকিৎসাগত প্রয়োজন ছাড়া স্রেফ লিঙ্গ পরিচয়ের তথ্য দেওয়া চিকিৎসকদের জন্য একটি ‘পেশাগত অসদাচরণ’। লিঙ্গ শনাক্তকরণের প্রযুক্তির এই অপব্যবহার বেআইনি গর্ভপাত বা জীবননাশের মত ঘটনা ঘটালে দণ্ডবিধির আওতায় তা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবেও গণ্য হতে পারে। রিট মামলার শুনানিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (বিবাদী) পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, ২০২৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি সরকার এ বিষয়ে একটি জাতীয় নীতিমালা অনুমোদন করেছে। তবে হাই কোর্ট তার পর্যবেক্ষণে বলেছে, নীতিমালা হলেও তা বাস্তবায়নের জন্য কোনো ডিজিটাল পোর্টাল, কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ, মনিটরিং ব্যবস্থা বা শাস্তির বিধান রাখা হয়নি।

আদালত বলেছে, একটি কার্যকর ডেটাবেজ ব্যবস্থা ছাড়া কেবল কাগজেকলমে নীতিমালার অনুমোদন দিয়ে এই অসাধু চর্চা বন্ধ বা মৌলিক অধিকার রক্ষা করা সম্ভব নয়। রুল জারির পর এমন ‘কসমেটিক’ বা বিলম্বে নেওয়া প্রশাসনিক পদক্ষেপ বিচারিক পর্যালোচনার দায় এড়াতে পারে না।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকেউ মিথ্যা মামলা বা আইনি জটিলতায় আটক থাকলে সহায়তা দেওয়া হবে
পরবর্তী নিবন্ধসারা দেশে হাম ও উপসর্গ নিয়ে আরো ৬ শিশুর মৃত্যু