ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রক্ষা এবং ডলার সাশ্রয়ে দেশবাসীকে অন্তত এক বছরের জন্য সোনা কেনা থেকে বিরত থাকা, বিদেশে ভ্রমণ না করা এবং সম্ভব হলে বাড়ি থেকে কাজ করার বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। খবর বিডিনিউজের।
পশ্চিম এশিয়ায় ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার প্রেক্ষাপটে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং রুপির ওপর বাড়তি চাপের মুখে তিনি দেশের নাগরিকদের কাছে এই আর্জি জানান। রোববার হায়দরাবাদ থেকে ভারতীয়দের জ্বালানি সাশ্রয়ে আহ্বান জানিয়ে মোদী বললেন, সীমান্তে প্রাণ বিসর্জন দেওয়াই কেবল দেশপ্রেম নয়। বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে দায়িত্বশীল হওয়া, দৈনন্দিন জীবনে দেশের প্রতি কর্তব্যপালনও দেশপ্রেম। তাই বিশ্বে সঙ্কটের সময় কর্তব্যকে এগিয়ে রাখতে হবে। কিছু সংকল্প নিতে হবে আমাদের, তার প্রতি সমর্পিত থাকতে হবে। সোনা না কেনার অনুরোধ কেন? নেপথ্যে আছে বিশাল অঙ্ক : মোদী সরকারের সোনা না কেনার আহ্বানের পেছনে কাজ করছে বিশাল এক অর্থনৈতিক হিসাব।
ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সোনা আমদানিকারক দেশ এবং এই আমদানির পুরো মূল্যই পরিশোধ করতে হয় ডলারে। তথ্য বলছে, ভারত তার সোনার চাহিদার ৯০ শতাংশই আমদানি করে। ট্রেডিং ইকোনমিক্স এবং আরবিআই–এর তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার প্রায় ৬৯০ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন ডলার। বিশ্বব্যাপী অস্থিরতা বাড়তেই গত ফেব্রুয়ারিতে এটি ৭২৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছলেও এপ্রিলের মধ্যে তা অনেকটাই কমে ৬৯১ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ভারতের চলতি খাতের ঘাটতি (সিএডি) বেড়ে ৮৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার হতে পারে, যা জিডিপি–র প্রায় ২ শতাংশ। এই সিএডি বৃদ্ধির অর্থ হল ভারতে ডলার আয়ের তুলনায় ডলার ব্যয় হচ্ছে বেশি। সোনা আমদানিই এর অন্যতম বড় কারণ। ২০২৬ অর্থবর্ষে ভারত প্রায় ৭২ বিলিয়ন ডলার মূল্যের সোনা আমদানি করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২৪ শতাংশ বেশি।
২০২৬ অর্থবর্ষে মোট আমদানি ব্যয় : ভারতের মোট আমদানি ব্যয়ের চিত্র লক্ষ্য করলে উদ্বেগের কারণ স্পষ্ট হয়। ২০২৬ অর্থবর্ষে মোট আমদানি ব্যয় ৭৭৫ বিলিয়ন ডলার। ভারতের মোট আমদানির ৩১ দশমিত ১ শতাংশই ব্যয় হয় এই চারটি পণ্যে। এর মধ্যে কেবল স্বর্ণ আমদানিতেই ব্যয় হয় মোট বিলের প্রায় ১০ শতাংশ।
সোনা কেনা কমালে কী লাভ? : বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতীয়রা যদি এক বছর স্বর্ণ কেনা উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে দেয়, তবে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে ডলারের মজুতে, যদি সোনার আমদানি ৩০–৪০ শতাংশ কমে, তা হলে প্রায় ২০–২৫ বিলিয়ন ডলার বাঁচবে। অন্যদিকে, যদি আমদানি ৫০ শতাংশ কমে, তাহলে সাশ্রয় হবে ৩৬ বিলিয়ন ডলার। এই পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় করা গেলে ভারতের চলতি খাতের ঘাটতির প্রায় অর্ধেক পূরণ করা যাবে। বর্তমানে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ায় এই বেঁচে যাওয়া ডলার দিয়ে প্রয়োজনীয় জ্বালানি কেনাও সম্ভব হবে। ভারত তার চাহিদার প্রায় ৮৮ শতাংশ তেল বিদেশ থেকে আমদানি করে, যার দাম মেটাতে হয় মার্কিন ডলারে। বিশেষজ্ঞদের মত, বিদ্যুৎ, শিল্প ক্ষেত্রের জন্য অত্যাবশ্যক পণ্য অপরিশোধিত তেল। তবে সোনাকে মূলত সঞ্চয় অথবা বিয়ে বা অন্য কোনও পারিবারিক অনুষ্ঠানে ঐচ্ছিক খরচের অংশ হিসেবে দেখা হয়। তেল কেনা দেশের অর্থনীতি সচল রাখার জন্য বাধ্যতামূলক। অন্যদিকে, সোনা কেনা অনেকটা ব্যক্তিগত বিনিয়োগ বা বিলাসিতার পর্যায়ে পড়ে। প্রধানমন্ত্রী মোদীর দাবি, এই সঙ্কটকালে ভারতীয়রা যদি সোনা কেনা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখে, তবে বিদেশে ডলারের মাধ্যমে কেনাকাটা কম হবে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও রক্ষা করা সম্ভব হবে।














