মৃত্যু কী? চার বছর বয়সি কন্যাসন্তানটি হয়তো এখনো বোঝে না। বাবার নিথর দেহের পাশে দাঁড়িয়ে যখন সে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল, তখন উপস্থিত হাজারো মানুষের চোখ অশ্রুসজল হয়ে ওঠে। ২০১৯ সালে সংসার শুরু করা মাকসুদুল হক চৌধুরী মাসুদের (৪৫) এই আকস্মিক ও নৃশংস বিদায় কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না তার পরিবার ও এলাকাবাসী। ছোটবেলায় মাকে হারানোর পর যে বড় বোন তাকে মাতৃস্নেহে আগলে বড় করেছিলেন, তার আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে আকাশ–বাতাস। অন্যায়ের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর আর সাধারণ মানুষের বিপদের বন্ধু হিসেবে পরিচিত এই নেতার এমন বিদায় স্তব্ধ করে দিয়েছে পুরো জনপদকে। ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল রোববার দুপুর সোয়া ২টার দিকে রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাকসুদুল হক চৌধুরী মাসুদের লাশ এলাকায় এসে পৌঁছালে এই দৃশ্য দেখা যায়। স্বজনরা জানান, ঘর থেকে বের হওয়ার সময় একমাত্র মেয়েকে চুম্বন করে বের হয়েছিলেন। জীবিত অবস্থায় সন্তানের সাথে এটাই ছিল তার শেষ দেখা।
গত শনিবার দুপুরে রাউজানে প্রকাশ্য দিবালোকে রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এই ঘটনার সিসি ক্যামেরা ফুটেজ ঘুরছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। যেখানে দেখা যায়, ফিল্ম কায়দায় প্রকাশ্যে তাকে একাধিক গুলি করে হত্যা করছে সন্ত্রাসীরা। গতকাল বিকালে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়েছে।
এদিকে মাসুদ হত্যাকাণ্ডে জড়িতরা শনাক্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। সিসিটিভি ফুটেজ ও স্থানীয়দের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে হত্যা মিশনে অংশ নেওয়া দুর্বৃত্তদের নাম–পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে। গতকাল বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে রাঙ্গুনিয়া উপজেলার বেতাগী চম্পাতলী ঈদগাহ মাঠে নিহত মাকসুদুল হক চৌধুরীর নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় রাঙ্গুনিয়া, রাউজানসহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা হাজারো মানুষের ঢল নামে। জানাজায় অংশ নেন যুবদলের কেন্দ্রীয় ও চট্টগ্রাম উত্তর জেলার শীর্ষ নেতৃবৃন্দ। রাজনৈতিক সহকর্মীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিগত সরকারের আমলে অর্ধশতাধিক রাজনৈতিক মামলার শিকার হয়েও রাজপথে টিকে থাকা এই নেতাকে এভাবে নির্মমভাবে প্রাণ হারাতে হবে, তা ভাবা যায় না। তারা এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার দাবিতে লাগাতার আন্দোলনের ঘোষণা দেন। এছাড়া জামায়াতে ইসলামী রাঙ্গুনিয়া উপজেলার নেতৃবৃন্দও জানাজায় শরিক হন। তারা ঘটনার নিন্দা ও জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানান।
ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল দুপুর সোয়া ২টার দিকে মাসুদের মরদেহ এলাকায় পৌঁছালে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। লাশবাহী গাড়ি এলাকায় প্রবেশ করতেই স্থানীয় রাজনৈতিক সহকর্মী ও স্বজনদের কান্নায় পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে।
নিহতের বড় ভাই ও উপজেলা বিএনপি নেতা নিজামুল হক চৌধুরী তপন শনিবার রাতে সান্ত্বনা দিতে আসা রাঙ্গুনিয়ার সংসদ সদস্য হুমাম কাদের চৌধুরীকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে তাকে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলতে শোনা যায়, ‘আমার ভাইকে কেন ভাড়াটিয়া খুনি দিয়ে হত্যা করা হলো? তাকে না মেরে আমাকে মারত!’
পরিবারের দাবি, তাদের জানামতে কোনো ব্যক্তিগত বা পারিবারিক শত্রুতা ছিল না। তবে স্থানীয় সূত্র ও এলাকাবাসীর মতে, এলাকায় ব্যাপক জনপ্রিয় এবং আসন্ন ইউপি নির্বাচনে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী মাসুদ বরাবরই সামাজিক নানা অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। বিশেষ করে এলাকার অবৈধ বালু ব্যবসার বিরুদ্ধে তার শক্ত অবস্থানের কারণেই পেশাদার ‘ভাড়াটে খুনি’ দিয়ে তাকে টার্গেট করা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শনিবার দুপুর দেড়টার দিকে রাউজান উপজেলার চুয়েট সংলগ্ন পাহাড়তলী বাজারের ব্যস্ত সড়কে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, একটি সিএনজি টেঙি থেকে ৬ জন সশস্ত্র যুবক নেমে মাসুদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায় এবং গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করে টেঙিযোগে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যায়।
হত্যাকাণ্ডের পর বিক্ষুব্ধ জনতা কাপ্তাই সড়কের একাধিক স্থানে টায়ার জ্বালিয়ে প্রায় ৩ ঘণ্টা সড়ক অবরোধ করে রাখে। পরে জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মো. মাসুদ আলমের আশ্বাসে বিকাল সোয়া চারটার দিকে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
রাঙ্গুনিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন জানান, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে খুনিদের স্পষ্ট ছবি ও কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্লু সংগ্রহ করা হয়েছে। অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ, ডিবি ও র্যাবের একাধিক টিম সমন্বিতভাবে অভিযান চালাচ্ছে। ইতিমধ্যে একজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এই ব্যাপারে পরিবারের পক্ষ থেকে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
সংসদ সদস্য হুমাম কাদের চৌধুরী নগরীর বাসভবনে দলীয় সিনিয়র নেতাকর্মীদের নিয়ে জরুরি বৈঠক করেছেন। তিনি জানান, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিতে প্রশাসনের সর্বোচ্চ মহলের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।
জড়িতদের নাম–পরিচয় জেনেছে পুলিশ : মাসুদ হত্যাকাণ্ডে জড়িতরা শনাক্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। সিসিটিভি ফুটেজ ও স্থানীয়দের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে হত্যা মিশনে অংশ নেওয়া ঘাতকদের নাম পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে।
এ ঘটনায় গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত রাউজান থানায় কোনো মামলা রেকর্ড হয়নি। অবশ্য নিহতের পরিবারের সদস্যরা বলেছেন, তারা রাতে মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। জানা যায়, এই হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছিল মোট ছয়জন অস্ত্রধারী। ঘাতকদের মধ্যে জড়িত ছিল রাউজানের একাধিক সন্ত্রাসীর সাথে শহরের এক ভাড়াটে খুনি। ঘটনার সময় জড়িত সবার হাতে পিস্তল ও শটগান দেখা গেছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, কিলিং মিশন শেষ করে ঘাতকরা সিএনজি টেঙিতে করে রাউজান–পাহাড়তলী সড়ক হয়ে উত্তর দিকে চলে যাচ্ছে। কিছুদূর গিয়ে তারা পূর্বমুখী রাস্তা ধরে চলে যায় পাহাড়ের দিকে।
এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানা যায়, রাউজানের সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আস্তানা উপজেলার পূর্বাংশের সীমানায় থাকা দুর্গম পাহাড়। সূত্র মতে, পাহাড়তলী, কদলপুর, রাউজান সদর ইউনিয়ন ও পৌরসভার ৯ নং ওয়ার্ডে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তীতে যত খুন ও পক্ষ–বিপক্ষে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে সব ঘটনার সাথে জড়িত রয়েছে পাহাড়ে আস্তানা গাড়া সন্ত্রাসীরা। সবশেষ ১৩ জুন দুপুরে যুবদল নেতা মাসদকে গুলি করা হয়। হত্যার মিশন শেষ করে তারা পাহাড়ে গা ঢাকা দেয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।
নিহতের ভাই বেতাগী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান পেয়ারুল হক চৌধুরী স্বপন জানান, রাতেই মামলা করার জন্য সিদ্ধান্ত হয়েছে। হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের পরিবার ও আমার ভাইয়ের কোনো শত্রু নেই। কারা কেন কী কারণে তাকে এভাবে হত্যা করেছে বলতে পারছি না। বিভিন্ন সূত্র থেকে জেনেছি, ঘাতকদের পরিচয় প্রকাশ পেয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তদন্ত করে তাদের খুঁজে বের করবে। সিসিটিভির ফুটেজে যাদের দেখা গেছে তাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে খুনের কারণ উদঘাটন করতে পারবে।
খুনের বিষয়ে জানতে স্থানীয় অনেকের সঙ্গে কথা হয়। কেউ বলেছেন এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে রয়েছে কর্ণফুলী নদী থেকে বালু উত্তোলন নিয়ে বিরোধ। কেউ বলেছেন, নিহত মাসুদের আগামী ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। তাই কোনো প্রভাবশালী মহল পরিকল্পিতভাবে ভাড়াটে খুনি দিয়ে তাকে খুন করিয়েছে।
রাঙ্গুনিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন বলেন, মাসুদ হত্যাকাণ্ডে অস্ত্র হাতে যাদের দেখা গেছে তাদের নাম–পরিচয় সম্পর্কে পুলিশ মোটামুটি ধারণা পেয়েছে। তারা সকলে একটি দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী দলের সদস্য। তাদের ধরতে অভিযান চলছে।









