ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শেষকৃত্যানুষ্ঠানের দ্বিতীয় দিনে লাল পতাকা উড়িয়ে তাকে হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার শপথ নিয়েছে লাখো জনত। খামেনির হত্যাকাণ্ডকে কোনোভাবেই ‘জবাবহীন’ ছেড়ে দেওয়া হবে না বলেও ঘোষণা এসেছে তেহরানের এই জমায়েত থেকে।
শেষকৃত্যানুষ্ঠানের দ্বিতীয় দিন গতকাল রাজধানী তেহরানে সমবেতদের মধ্যে আলি খামেনির তিন পুত্র সন্তানও উপস্থিত ছিলেন। জানাজায় তাদের পরিবারের আরও চার সদস্য উপস্থিত থাকলেও খামেনির পরে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হওয়া তার অপর পুত্র মোজতবা খামেনিকে সেখানে দেখা যায়নি। ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমে খামেনির ছেলে হুজ্জাতুল ইসলাম সৈয়দ মোস্তফা, সৈয়দ মাসুদ ও সৈয়দ মেয়সাম খামেনিকে তেহরানের ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মুসাল্লার বিরাট উঠানে কফিনের সামনে জানাজায় অংশ নিতে দেখা গেছে। প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতার ভাইয়েরাও এ সময় জানাজায় উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া ঊর্ধ্বতন রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মকর্তারাও জানাজায় অংশ নেন। খবর বিডিনিউজের।
ইরানের তাসনিম নিউজ এসেন্সির খবরে বলা হয়, গত শনি ও গতকাল রোববার লাখ লাখ শোকাতুর মানুষ তেহরানের গ্র্যান্ড মুসাল্লায় সমবেত হন। সেখানে গভীর শোক প্রকাশের পাশাপাশি খামেনি হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করা হয়। এ সময় তাদের হাতে ছিল লাল পতাকা, যেখানে আরবি অক্ষরে লেখা ছিল ‘হে হোসেনের রক্তের প্রতিশোধ গ্রহণকারীরা’। এই পতাকা কারবালায় ইমাম হোসেনের শাহাদাতের সঙ্গে জড়িত শিয়া ঐতিহ্যের একটি গভীর ও ঐতিহ্যগত প্রতীক। তাসনিম নিউজের ভাষ্য, ঐতিহাসিকভাবে লাল ব্যানার বা পতাকা দিয়ে বোঝানো হয়, নির্দোষ মানুষের রক্ত অন্যায়ভাবে ঝরানো হয়েছে এবং এর বিচার এখনো বাকি আছে। সাধারণত মহররমের শোক অনুষ্ঠানের সময় শিয়া মুসলমানরা এ পতাকা দেখান। এ পতাকা দিয়ে ন্যায়ের সন্ধান এবং ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে অপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার দৃঢ় সংকল্পও বোঝানো হয়।

গ্র্যান্ড মুসাল্লার জমায়েতে শোকাহত মানুষরা বারবার ‘প্রতিশোধ’, ‘প্রতিশোধ’ স্লোগান দেন। এ সময় তাদের হাতে লাল পতাকা ছাড়াও ইরানের জাতীয় পতাকা, খামেনির প্রতিকৃতি, দেশটির বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়েদ মোজতবা খামেনির ছবি এবং মুষ্টিবদ্ধ হাতের প্রতীক ছিল।
ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান তাদের সর্বোচ্চ নেতার দাফন উপলক্ষ্যে সপ্তাহব্যাপী শেষ বিদায় অনুষ্ঠান ও মিছিলে আয়োজন করেছে। এর অংশ হিসেবে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইরাকের পবিত্র ধর্মীয় স্থানগুলোতেও তার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে। গত শুক্রবার ইরানি নেতা ও সফররত বিদেশি কর্মকর্তাদের শ্রদ্ধা প্রদর্শনের জন্য খামেনির কফিন একদিন ঘরের ভেতরে রাখার পর শনিবার সর্বসাধারণের জন্য বাইরে রাখা হয়। কাঁচ দিয়ে ঘিরে রাখা খামেনির কফিনের পাশে তার মেয়ে সাইয়্যেদা বুশরা হোসেইনি খামেনি, জামাতা মেসবাহ–উল–হুদা বাকেরি, পুত্রবধূ (বর্তমান সর্বোচ্চ নেতার স্ত্রী) জাহরা হাদ্দাদ আদেল ও ১৪ মাস বয়সি নাতনি (বুশরাকন্যা) জাহরা মোহাম্মাদি গোলপায়েগানির কফিন রাখা হয়েছিল।
ইরান যুদ্ধের প্রথম দিন গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন–ইসরায়েলি হামলায় ৮৬ বছর বয়সী খামেনি নিহত হন। হামলায় খামেনির মেয়ে সাইয়্যেদা বুশরা হোসেইনি খামেনি, জামাতা মেসবাহ–উল–হুদা বাকেরি, পুত্রবধূ (বর্তমান সর্বোচ্চ নেতার স্ত্রী) জাহরা হাদ্দাদ আদেল, ১৪ মাস বয়সি নাতনি (বুশরাকন্যা) জাহরা মোহাম্মাদি গোলপায়েগানিও নিহত হয়। ওই একই হামলায় বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা আহত হয়েছিলেন বলে জানানো হয়েছে। কিন্তু ওই ঘটনার পর থেকে আর কখনো মোজতবাকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি আর তার কোনো ছবিও প্রকাশ করা হয়নি। রয়টার্সকে তার নিজ চক্রের ঘনিষ্ঠনজনরা জানিয়েছেন, ওই হামলায় মোজতবা মারাত্মকভাবে আহত হয়েছিলেন, তার মুখমণ্ডল বিকৃত হয়ে গেছে আর তার এক পা বা দুই পা–ই উল্লেখযোগ্য জখম হয়েছে।
গতকাল ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কলিবফ জানাজায় উপস্থিত ছিলেন। মোনাজাতের সময় মাসুদ খামেনিকে কাঁদতে ও একটি কেফিয়া দিয়ে চোখের পানি মুছতে দেখা গেছে। মুসাল্লায় জড়ো হওয়া লাখ লাখ ইরানির অনেকেই রাতেই সেখানে চলে এসেছিলেন। তাদের অনেককে কাঁদতে ও বুক চাপড়াতে দেখা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন গণমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে জানিয়েছেন, খামেনির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াকে ঘিরে শান্তি আলোচনা এক সপ্তাহের জন্য স্থগিত রাখা হয়েছে।
খোমেনির কফিন রাষ্ট্রায় মর্যাদায় আজ সোমবার পর্যন্ত তেহরানে রাখা হবে। আজ কফিন নিয়ে তেহরানজুড়ে শোক মিছিল হবে। শোকযাত্রার পর প্রয়াত নেতার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে ইরানের শিয়া ধর্মীয় নেতৃত্বের প্রধান কেন্দ্র ও ধর্মীয় শিক্ষানগরী কোমে, যেখানে মঙ্গলবার জানাজা ও শোক অনুষ্ঠান হবে। এরপর বুধবার খামেনির কফিন নেওয়া হবে প্রতিবেশী দেশ ইরাকে। সেখানকার নাজাফ ও কারবালা শহরে শোকযাত্রা ও জানাজা হবে। ইরানের সমমনা ও মিত্র শিয়া গোষ্ঠীগুলোর শীর্ষস্থানীয় নেতারা উপস্থিত থাকবেন সেখানে। এরপর বৃহস্পতিবার ইরানের মাশহাদ শহরে আরেকটি শোভাযাত্রার পর আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হযরত ইমাম রেজার মাজারে দাফন করা হবে। একই কবরস্থানে তাঁর নাতনি, জামাতা, কন্যা এবং মোজতবা খামেনির স্ত্রী জাহরা হাদ্দাদ আদেলকেও দাফন করা হবে।












