খন রঞ্জন রায়ের দিবস ভাবনা ও বিস্তৃতি

শাহরিয়ার আদনান শান্তনু | শুক্রবার , ৫ জুন, ২০২৬ at ৯:২১ পূর্বাহ্ণ

আচ্ছা পাঠক, কবে থেকে এই পৃথিবীতে দিবস পালন শুরু হয়েছ্লেবলতে পারেন? আমার মতো আপনিও নিশ্চয়ই ভ্রু কুঁচকে চিন্তায় পড়ে গেলেন। আসলে কীআমিও জানি না। আর এই প্রশ্নটা উদয় হলো একটি বই পড়ার সুবাদে। বইটিও একটি নিজস্ব স্বকীয়তা নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। নাম: দিবস ভাবনা ও বিস্তৃতি। প্রথম দেখায় উল্টে পাল্টে যা নজরে এলো, তা হচ্ছেদুনিয়াশুদ্ধ মানুষ এতো পালন করে দিবস, আর তা এতো বৈচিত্র্যময়। বইয়ের ৭৯টি অধ্যায়ে ৭৯টি দিবস। এবং সেই দিবস নিয়ে পরিচিতি ও আলোচনা। আমাদের দেশেও বিভিন্ন দিবস পালন করা হয়। কিছু আছে বিশ্ব, আর কিছু আন্তর্জাতিক। স্থানীয় দেশীয় আরও দিবস আছে। এই গ্রন্থের সুবাদে অনেক দিবসের সন্ধান পাওয়া গেল, যা আগে শুনিনি। এই প্রসঙ্গে গ্রন্থকার খন রঞ্জন রায় ভূমিকায় লিখেছেন: ‘দিবস ভাবনা ঘোরেঅঘোরে ঘুরপাক খাচ্ছিল। খচখচানি বাড়ছিল। বিশেষ করে অপ্রচলিত নিষ্প্রাণ কিছু দিবস ঘিরে।’ মূলতঃ এই খচখচানি থেকেই আমরা পেয়ে যাই একটি প্রয়োজনীয় গ্রন্থ।

ইংরেজি বর্ষের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত নানান দিবস পালন করা হয়। এই দিবসগুলোর সাথে হয়তো আমরা কিছুটা পরিচিত। আবার অনেক দিবস সম্পর্কে জানা নেই।

দিবস ভাবনা ও বিস্তৃতি” বইটি শুরু হয়েছে ‘বিশ্বযুদ্ধঅনাথ শিশু দিবস’ নামে একটি দিবস দিয়ে। ৬ জানুয়ারি দিবসটি পালন করা হয়। যুদ্ধ এমনই ভয়াবহতার, তা জানা সত্ত্বেও থেমে থাকেনি যুদ্ধ। আজও চলছে। শত শত শিশু অনাথ হয়ে যাচ্ছে প্রতি মুহূর্তে। কিন্তু সভ্য সমাজ তা নজরেই আনে না।

গ্রন্থকার খন রঞ্জন রায় এই প্রসঙ্গে লিখেছেন: “যুদ্ধ এবং গৃহযুদ্ধ একে অপরকে জড়াজড়ি করে, কোলাকুলি করে, আলিঙ্গন করে। আর এই আলিঙ্গনেই সৃষ্টি হয় মানবিকতার কলঙ্ক, ভয়াবহ ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুর শব্দ ‘অনাথএতিম’( পৃ: ১৫)। সেই অনাদিকাল থেকেই যুদ্ধের দামামা চলছে। আজও থামেনি। আমাদের মতো শান্তিকামী মানুষের প্রত্যাশা, আর নয় যুদ্ধ। আর কেউ অনাথ হোক এটা আমাদের কাম্য নয়। গ্রন্থকার এই প্রসঙ্গে আরও লিখেছেন: “কেবল দিবস উদযাপন নয়, যুদ্ধগৃহযুদ্ধ, হানাহানি, মারামারি থেকে নিজ, সমাজ, দেশকে রক্ষা করে সৌহার্দ্যসমপ্রীতি, শান্তিময় বিশ্ব প্রতিষ্ঠার নিয়ামক শক্তি হোক এই দিবস”

(পৃ:১৭)

আমরাও চাই এমনটিই হোক আগামীর বিশ্ব।

মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের একটি হলো গামছা। কিন্তু “গামছা দিবস” পালন করা হয়এই বিষয়ে কী আপনি অবগত? সম্ভবত: না। কিন্তু মজার বিষয় এই যে, ২৫ মে বিশ্ব গামছা দিবস পালন করা হয়। গামছা যে কতোটা গুরুত্বপূর্ণ, তা উল্লেখ করতে গিয়ে গ্রন্থকার এই অধ্যায়ের শুরুতেই আব্বাসউদ্দীন আহমেদের বিখ্যাত গানের দুটি কলি উল্লেখ করেছেন:

যদি বন্ধু যাবার চাও

ঘাড়ের গামছা থুইয়া যাওরে….

আমরা তো মনে করি গামছা দেশীয় বস্ত্র। কিন্তু এই দিবস নিয়ে লেখায় জানা গেলো, বিশ্বখ্যাত কথাসাহিত্যিক ডগলাস এডামসসএর গামছা পছন্দ করতেন খুব। এডামসস তাঁর বিভিন্ন লেখায় নানানভাবে গামছাকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পরে এডামসের ভক্তরা সিদ্ধান্ত নেয়, ২৫ মে পালন করা হবে গামছা দিবস। মূলতঃ মানুষের জীবনে গামছার ব্যাপক গুরুত্ব এবং এর উপকারিতা তুলে ধরা এই দিবসের উদ্দেশ্য।

বিনোদনের আরেকটি পর্ব হচ্ছে : বনভোজন। আমরা তো বছরের একটি দিন লেখাপড়া, কাজের ফাঁকে নিরিবিলি প্রাকৃতিক দর্শনীয় স্থানগুলোয় চলে যাই। এ যেন সকল বয়সীদের, সমমনার সমন্বয়ে দারুণ এক মিলনমেলা। আরও জেনে অবাক হই, ১৮ জুন তারিখে আন্তর্জাতিক বনভোজন দিবস পালন করা হয়। ইংরেজিতে বলা হয়েছে : পিকনিক ডে। শুরু হয়েছিল ফরাসি দেশে। “ঊনিশ শতকে ফরাসিরা তাঁদের আটকে দেওয়া কিছু পার্কে ঢোকার জন্য সমবেত হওয়া, দাবি জানানো, শেষে খাবার আয়োজনের ব্যবস্থা করা থেকেই মূলত এই দিবসের উদ্ভব। ফরাসি বিপ্লবের পরে তা আনুষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। সেই শুরু। শেষে বিশ্বের অনেক পর্যটন সংস্থা মিলিত হয়ে কেবল ‘পিকনিক’ শব্দটিকে আলাদা মর্যাদা দিতেই ‘আন্তর্জাতিক পিকনিক ডে’ বা ‘আন্তর্জাতিক বনভোজন দিবস’ আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন সূচনা করে (পৃ: ১১৬)। আজকের এই বিশ্বে বনভোজন যে শুধুই আনন্দ ও বিনোদনের নয়, তা এখন ঐতিহ্য শিক্ষার অংশযা নতুন করে উপলব্ধি করা যায়, এই বিষয়ক নিবন্ধটি পাঠ করলে।

হাসির দিবসে নির্মল বার্তা: পরিশুদ্ধ হয় দেহমনআত্মা’কথাটি আজকের আধুনিক বিশ্ব মেনে নিয়েছে। ‘চিকিৎসকদের গবেষণায় প্রমাণিত যে হাসাহাসি করলে রক্ত চলাচল বাড়ে, রক্তনালিগুলো প্রসারিত হয়। ফলে শিরাধমনির উপর স্বভাবতই চাপ কমে, ফল হয় ব্লাডপ্রেসার নিয়ন্ত্রণ, কমতে থাকা (পৃ:১৮৯)’-এমনই করে লিখেছেন গ্রন্থকার বিশ্ব হাসি দিবস সম্পর্কে লিখতে গিয়ে। আপনিও হয়তো বা মুচকি হেসে ভাববেন, হাসি দিবসও আছে? হ্যাঁ, আছে। ১৯৯৯ সাল থেকে অক্টোবর মাসের প্রথম শুক্রবার হাসি দিবস পালন করা হয় সারা বিশ্বে।

চিকিৎসা তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকিতে বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রবন্ধে জনগুরুত্বপূর্ণ তথ্যাদি উপস্থাপন করেছেন গ্রন্থকার। বিষয়টি নিয়ে আলোকপাত করেছেন ‘বিশ্ব রেডিওলজি দিবস’ পালন করা প্রসঙ্গে। ৮ নভেম্বর এই দিবস পালন করা হয়। ‘এক্সরে নামক তেজস্ক্রিয়তা বিচ্ছুরণের মাধ্যমে ষাটের দশকে আলট্রাসনোগ্রাফি, সত্তর দশকে সিটিস্ক্যান, আশির দশকে এমআরআই চিকিৎসা বিজ্ঞানের পুরোপুরি সহায়ক শক্তি হিসাবে নিপুণতার স্বাক্ষর রাখছে (পৃ:২৩০)’। এটা যেমন সত্যি, তেমনি দক্ষ টেকনিশিয়ানের অভাবে বাংলাদেশের অনেক হাসপাতালে মূল্যবান যন্ত্রপাতি অকেজো পড়ে আছে। আর সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে রোগীরা। আবার সঠিকভাবে মেশিন পরিচালনা করতে না পারার কারণে মারাত্মক তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকিতে রয়েছে জনগণ। এই বিষয়টিকেই গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেছেন গ্রন্থকার। দিবস পালন জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমে অবদান রাখছে, এটি তারই ধারাবাহিকতা।

আপনি কি জানেন : ১৯ নভেম্বর বিশ্ব টয়লেট দিবস? আমার মতো অনেকের কাছে অজানা তা। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, সারা বিশ্বের সমগ্র মানুষের স্যানিটেশন কার্যক্রমকে শতভাগ সঠিক ব্যবস্থাপনায় আনতে, সচেতনতা সৃষ্টিতে চালু হয়েছে ‘বিশ্ব টয়লেট দিবস।’ জাতিসংঘের নিয়ন্ত্রণে পৃথিবী ব্যাপী ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা’ নির্ধারণ করা হয়েছে। ওখানে পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাকে অতি গুরুত্বের সাথে ৬নং ধারায় সম্পৃক্ত করা হয়েছে। দিবস পালনের আড়ালে পয়োব্যবস্থাপনার শক্তিশালী অর্থনীতি, স্বাস্থ্যের উন্নতি, সামাজিক নিরাপত্তা, নারীর মর্যাদার অপরাপর উন্নতি ঘটবে।

এই বিষয়ে গ্রন্থকার লিখেছেন: “নিরাপত্তার দিক বিবেচনা করে টয়লেট ব্যবহার পরবর্তীকালে অবশ্যই জীবাণুনাশক সাবান, সোডা, গ্রামে হলে ছাই দিয়ে হাত ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে। অনেকে টয়লেটে বসে ধূমপান করে, ধোঁয়ায় টান নাদিলে পায়খানা বের হয় না, জীবনসংহারী মারাত্মক এই বদঅভ্যাস পরিত্যাগ করতে হবে (পৃ: ২৪৭)।”

অপ্রচলিত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিবস হচ্ছে: বিশ্ব উপশমদায়ক দিবস। ৩১ ডিসেম্বর সারাবিশ্বে এই দিবস পালন করা হয়। “১৯৮৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর, পৃথিবীর ৭০টির অধিক দেশে ৫০০ মিলিয়ন মানুষ অত্যন্ত বিশ্বস্ততা, আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সাথে যথানিয়মে পালন শুরু করে আত্মশুদ্ধির মর্মমূলে আঘাতচিন্তার এই উপশমদায়ক দিবস ( পৃ:৩২৬)।”

… “ বিশ্ব উপশমদায়ক দিবসের মূল প্রতিপাদ্যই হলো ‘একটি মাত্র নিশ্বাস, বাড়ুক নিয়তপ্রতিনিয়ত আত্মবিশ্বাস’ ( পৃ: ৩২৮)

এমন করেই ৭৯ টি দিবস এবং এই বিষয়ক প্রবন্ধ লিখেছেন খন রঞ্জন রায় তাঁর “দিবস ভাবনা ও বিস্তৃতি” বইতে। নিঃসন্দেহে বইটি প্রকাশ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, উন্নয়নকর্মীগবেষকশিক্ষকশিক্ষার্থীসাধারণ মানুষের জন্য অনেক কিছু বিষয় অজানার শূন্যতা পূর্ণ করতে সহায়তা করবে। এতগুলো দিবসের সন্ধান করে এবং পরবর্তীতে বিশদভাবে লেখা সহজ নয়। প্রচলিত লেখা পাঠের বাইরে অন্যরকম অভিজ্ঞতা হয়েছে এই বইটি পাঠে। আশা করি, পাঠকের অনেক কৌতূহল মেটাতে বইটি সহায়তা করবে। এমন ব্যতিক্রমী বই রচনা ও সমাজ সচেতকের দায়িত্ব পালন করার জন্য গ্রন্থকার খন রঞ্জন রায়কে জানাই আন্তরিক শুভকামনা।

পূর্ববর্তী নিবন্ধঅনাবৃত
পরবর্তী নিবন্ধহাটহাজারীর ২নং ধলই ইউপি চেয়ারম্যানের পদ শূন্য ঘোষণা