বাংলাদেশ জাতীয় দলের অধিনায়কত্ব করার সময়ও বাবার একটি কথা প্রায়ই কানে বাজত শাহরিয়ার নাফীসের, ‘ক্রিকেট শেষ পর্যন্ত ভাত দেবে না।’ সে সময় বাবার এমন কথা শুনে বিরক্ত হতেন বাংলাদেশের সাবেক এই অধিনায়ক। জাতীয় দলের অধিনায়ক হওয়ার পরও কেন পড়াশোনার ওপর এত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, সেটি বুঝতে পারতেন না তিনি। তবে সময়ের সঙ্গে বদলেছে তার উপলব্ধি। পড়াশোনা ও খেলাধুলার মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয় যে একজন মানুষের জীবন গঠনে কতটা জরুরি, এবার সেই বার্তাই নিজের বই ‘প্লে অ্যান্ড স্টাডি, উইন দ্য রেস’–এ তুলে ধরেছেন নাফীস। ২০০৬ সালে খুলনায় বাংলাদেশের প্রথম টি–টোয়েন্টির অধিনায়ক ছিলেন নাফীস। দেশের ক্রিকেটের অধিনায়ক হয়েও বাবার এমন কথা কেন শুনতে হচ্ছে, সেটিই তখন বুঝতে পারতেন না। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই কথার অর্থ উপলব্ধি করেছেন তিনি। খেলাধুলার পাশাপাশি পড়াশোনার গুরুত্ব নিয়ে এবার সেই অভিজ্ঞতাই অন্যদের কাছে পৌঁছে দিতে চেয়েছেন বাংলাদেশের সাবেক এই অধিনায়ক। শনিবার মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে নাফীসের লেখা ‘প্লে অ্যান্ড স্টাডি, উইন দ্য রেস’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়েছে। বইটির সহলেখক এইচ এম আতিফ ওয়াফিক। খেলাধুলা ও পড়াশোনার মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরাই বইটির মূল লক্ষ্য। বই উন্মোচনের অনুষ্ঠানে নিজের ছোটবেলার কথা স্মরণ করে নাফীস বলেন, ‘আমি যখন একদম ছোট, বাসায় আব্বা–আম্মু প্রচণ্ড রকমের প্রেশার দিতেন। অনেক সময় স্যাররা বলতেন, ‘তুই ক্রিকেট খেলে কী করবি, তুই পড়াশোনা কর সারাদিন।’ কিন্তু আমার বাসায় সব সময় এই চাপটা ছিল।’ এরপরই বাবার সেই কথাটি তুলে ধরেন সাবেক এই ক্রিকেটার, ‘আমি যখন জাতীয় দলের ক্যাপ্টেনও হয়েছিলাম, তখনও আমার আব্বার কথা এখনো আমার কানের মধ্যে ভাসে। আব্বা একটা কথা বলতেন, ‘ক্রিকেট শেষ পর্যন্ত ভাত দেবে না।’ তখন খুব বিরক্ত লাগত। আমি জাতীয় দলের ক্যাপ্টেন্সি করছি, আর আব্বা বলছে ক্রিকেট ভাত দেবে না! কিন্তু ওই কথার মর্মটা আমি এখন বুঝি।’ শুধু নিজের অভিজ্ঞতা নয়, খেলাধুলার পাশাপাশি পড়াশোনা জীবনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা তুলে ধরতে গত চার বছর ধরে তথ্য সংগ্রহ করেছেন নাফীস ও তাঁর সহলেখক। বইটিতে রয়েছে ৩৫ জন অ্যাথলেটের গল্প। এমন অনেকের অভিজ্ঞতাও আছে, যারা প্রতিশ্রুতিশীল খেলোয়াড় ছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত খেলাধুলার সর্বোচ্চ পর্যায়ে যেতে পারেননি। পরে পড়াশোনাই তাদের জীবনের অন্য পথে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। নাফীস বলেন, ‘আমাদের বইয়ের মূল ভাবনা ছিল, এমন কিছু মানুষের গল্প তুলে ধরা, যারা অনেক প্রমিজিং ক্রিকেটার বা স্পোর্টস পারসন ছিল, কিন্তু খেলাটাতে শেষ পর্যন্ত সর্বোচ্চ জায়গায় যেতে পারেনি। তাদের জীবনে পড়াশোনা কতটা কাজে এসেছে, সেটাই তাঁরা সুন্দর করে ব্যাখ্যা করেছেন।’ বইটির জন্য দেশ–বিদেশের নামকরা ক্রীড়াবিদ, কোচ ও শিক্ষাবিদদের সঙ্গে কথা বলেছেন নাফীস।
বইয়ের আরেকটি অংশে শিক্ষাজীবনে খেলাধুলার গুরুত্ব নিয়ে কাজ করেছেন সহলেখক আতিফ ওয়াফিক। বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনিভার্সিটি অব স্কলার্স ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সহযোগিতায় দীর্ঘ কয়েক বছরের তথ্য–উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে। বিভিন্ন দেশের শিক্ষাবিদ ও অধ্যাপকদের মতামতও নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলার প্রয়োজনীয়তার কথা আলাদা করে উল্লেখ করেছেন নাফীস। তিনি বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশে বাস করি, বাংলাদেশের বাস্তবতা আমাদের মেনে নিতে হবে। এখানে খেলাধুলা বলেন, নাটক–অভিনয় বলেন, এই সেক্টরগুলো এখনো এত বড় ইন্ডাস্ট্রি হয়ে ওঠেনি যে পরে আপনার কোনো ব্যাকআপ না থাকলেও চলবে। এ জন্য আমার কাছে পড়াশোনাটা খুবই জরুরি।’












