কাগজে মুদ্রিত বই পড়ার অনুভূতি আলাদা

সুপ্রতিম বড়ুয়া | সোমবার , ৩ আগস্ট, ২০২৬ at ৭:৪১ পূর্বাহ্ণ

নিজের মনের ভাব ও তথ্য বিনিময় করতে গিয়েই লিপি আবিষ্কার করে মানুষ। এভাবেই বিবর্তিত হতে হতে মানুষ আজকের চেহারা ও গঠন পেয়েছে। যে মানুষ একসময় তার মস্তিষ্ক ব্যবহার করে লিপি আবিষ্কার করেছিলো, সে মানুষই আজ তার মস্তিষ্কের ব্যবহার কমিয়ে দিচ্ছে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও যন্ত্রের মধ্যে এসে মানুষকে আর নিজের মস্তিষ্ক ব্যবহারই করতে হচ্ছে না। এতো বেশি যন্ত্রের মধ্যে বুঁদ হয়ে থাকে যে, চারপাশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ভার্চুয়াল জগতেই আচ্ছন্ন হয়ে থাকে অনেক মানুষ। এ মানুষের আজ মস্তিষ্ক থেকেও যেন নেই! কান থেকেও যেন নেই, কারণ, চারপাশের শব্দ তার কানে যায় না। চোখের ক্ষমতাও কমছে দিন দিন। এভাবে বিবর্তিত হতে হতে হাজার বছর পরের ভবিষ্যৎ মানুষের মস্তিষ্কের গঠন কেমন হবে, ভাবতে গেলেও অসহায় লাগে। আমরা বারবার বই পড়ার গুরুত্ব নিয়ে কথা বলি। কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের শিশুকিশোরদের বইমুখী করতে পারছি না। কিন্তু এটা স্বীকার করতে হয় বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন শিশুকিশোরেরা বই পড়তে অনেক ভালোবাসে। এটাও স্বীকার করতে হয় আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার এমনই হাল, অভিভাবকেরা তাদের সন্তানদের স্রেফ এ প্লাস পাওয়ার একটি যন্ত্র হিসেবে গড়ে তুলছেন কিন্তু তাদের সন্তানদের পাঠ্য বই ছাড়া নানা বৈচিত্র্যময় বই পড়ার প্রতি আগ্রহ দেখান না। ফলে ক্লাস, পরীক্ষার চাপে পড়ে পাঠ্যবইয়ের বাইরে আরো যে কতো বৈচিত্র্যময়, রঙিন এক পৃথিবী নিয়ে হাজার হাজার বই চুপচাপ পড়ে আছে, সেগুলোর কাছে যাবার এতোটুকু ফুরসত ওরা আর পাচ্ছে না। বই পড়ার চর্চা পরিবার বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও তেমন দেখা যায় না। চর্চা হচ্ছে না ভাষাসংক্রান্ত বুদ্ধিমত্তার। বছর বছর সাফল্যের সাথে প্রচুর এ প্লাস পাওয়া শিক্ষার্থীই শুধু আমরা পাচ্ছি। কিন্তু মননশীল, সৃষ্টিশীল, নতুন সময়ের নতুন মানুষ তো আর পাচ্ছি না! এটি খুবই হতাশাজনক। শিশুরা অনুকরণপ্রবণ। বড়রা যা করে তারা তাই করে। তাই তাদের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস তৈরি করতে হলে প্রথমে বাবামায়েরও বই পড়ার চর্চা থাকা জরুরি। বই পড়ার কথা উঠলেই বেশিরভাগ বাবামা কারণ দেখান সময় কোথায় এত বই পড়ার? এমনকি শিক্ষকদের মধ্যেও বৈচিত্র্যময় বই পড়ার চর্চা বলতে গেলে নেই। অথচ ইচ্ছে থাকলে প্রতিদিন অন্তত এক পাতা বই চাইলেই পড়া যায়, যেখানে প্রতিদিন ফেসবুকে ঠিকই অনেকটা সময় আমরা অনায়াসে খরচ করে ফেলতে পারি মনেরই অজান্তে। অনেকে অবশ্য যুগের দাবিতে যান্ত্রিক বই পড়ে থাকেন। তবুও কাগজের বই পড়ার অনুভূতি সম্পূর্ণ আলাদা। এছাড়া এটি স্বাস্থ্যকরও বটে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও শিক্ষার্র্থীদের মধ্যে বইপড়ার চর্চা তৈরি করতে সহশিক্ষা কার্যক্রমে পাঠচক্র চালু করতে পারে। এমন কার্যক্রম চালাতে হলে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠাগারও থাকা দরকার। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠাগার থাকলেও এত বেশি ক্লাস ও পরীক্ষার ব্যস্ততার মধ্যে শিক্ষার্থীদের ডুবিয়ে রাখা হয় যে, পাঠাগারে উঁকি দেবার সময়টুকুও তাদের থাকে না। তাদের বইপড়ার ইচ্ছেগুলোকে মেরে ফেলা হয়।

বই পড়াকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠানগুলো উৎসব করতে পারে। এসব উৎসবে খ্যাতিমান লেখকদেরকে আমন্ত্রণ জানানো যেতে পারে। বিখ্যাত লেখকদের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা যেতে পারে। এছাড়াও দেশের বিখ্যাত ও বড় পাঠাগারগুলোতে শিক্ষার্থীদের সফরে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। মানতেই হবে সৃজনশীলতা ও কল্পনাশক্তির বিকাশ ঘটানোর একটি মাধ্যম বইপাড়া চর্চা। বই পড়া একজন মানুষের মধ্যে সৃজনশীলতা গড়ে তোলে। বিশেষ করে সাহিত্য, বিজ্ঞান কল্পকাহিনি ও দার্শনিক বইগুলো মানুষের চিন্তার জগৎকে প্রসারিত করে। এই কল্পনাশক্তিই পরে শিল্প, সাহিত্য, প্রযুক্তি এমনকি উদ্ভাবনের জন্ম দেয়। পৃথিবীর নামী বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক ও দার্শনিকদের জীবনে বই ছিল অনন্য প্রেরণার উৎস। সমাজ গঠনে বই পড়ার গুরুত্ব: বই একজন মানুষকে সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে। একজন সচেতন নাগরিকই পারে একটি সুশৃঙ্খল ও প্রগতিশীল সমাজ গড়ে তুলতে। বই পড়ার অভ্যাস মানুষকে কুসংস্কারমুক্ত, যুক্তিবাদী ও দায়িত্বশীল করে তোলে।

লেখক: প্রাবন্ধিক, অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবাংলাদেশের আত্মপরিচয়ের শিকড়
পরবর্তী নিবন্ধএআই যুগে মানবিক মূল্যবোধের ভবিষ্যৎ