কক্সবাজার মহাসড়ক হবে ছয় লেন

চকরিয়ার জনসভায় প্রধানমন্ত্রী । লবলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা হবে । বাজেটের পর জিনিসপত্রের দাম বাড়েনি । একটি মহল বাজেটের বিরুদ্ধে কথা বলছে

চকরিয়া প্রতিনিধি | রবিবার , ১৪ জুন, ২০২৬ at ৬:০১ পূর্বাহ্ণ

বহুল প্রতীক্ষিত চট্টগ্রামকক্সবাজার মহাসড়ককে ছয় লেনে রূপান্তরের ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, অবশ্যই এই মহাসড়ককে বর্তমান সরকার চার বা ছয় লেনে রূপান্তরের কাজ শুরু করবে। পর্যটন নগরী, মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দরসহ ভৌগোলিকগত কারণে কক্সবাজার অতি গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই মহাসড়ককে অনেক আগেই চার বা ছয় লেনে রূপান্তর করা উচিত ছিল। আজ থেকে ২৫ বছর আগে আমি এই সড়ক দিয়ে কক্সবাজার এসেছিলাম। তখন সড়কটি যে অবস্থায় দেখেছিলাম এবার এসেও তা দেখতে হয়েছে, যা খুবই দুঃখজনক। এই মহাসড়ককে অচিরেই চার বা ছয় লেনে রূপান্তর করার কাজ শুরু করা হবে।

গতকাল শনিবার রাত পৌনে ৮টার দিকে চকরিয়া পৌরসভার শহীদ আবদুল হামিদ বাস টার্মিনাল মাঠে চকরিয়া উপজেলা ও পৌরসভা বিএনপি আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি অবগত হয়েছি, এখানকার লবণ চাষিরা তাদের উৎপাদিত লবণের ন্যায্যমূল্য পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছেন। তাই আমি কথা দিচ্ছি আপনাদের এলাকার সন্তান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে লবণের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করে লবণ চাষিদের দীর্ঘদিনের দুঃখ মোচন করা হবে, যাতে এখানকার লবণ শিল্প রক্ষা পায় এবং চাষিরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারেন।

সদ্য ঘোষিত বাজেটকে গণমানুষের বাজেট আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, এবারের বাজেট অবশ্যই গণমানুষের বাজেট। মহান সংসদে এবারের বাজেট ঘোষণার পর থেকে দেশের সকল শ্রেণীপেশার সচেতন মানুষ সাধুবাদ জানাচ্ছেন। এই বাজেট ঘোষণার পর অদ্যাবধি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে বলে শোনা যায়নি। অতীতে বাজেট ঘোষণার আগেই সারা দেশে দ্রব্যমূল্য ঊর্ধগতির দিকে ধাবিত হতো। সেই তুলনায় এবারের বাজেট ঘোষণার পর নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মূল্য তো বাড়েইনি, বরঞ্চ কমেছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এবারের বাজেটে একমাত্র দাম বাড়ানো হয়েছে সিগারেটসহ তামাক জাতীয় পণ্য এবং মদের। হয়তো এই কারণেই বাজেট ঘোষণার পর থেকে ওই মহলটি রাজপথে নেমে বাজেটের বিরুদ্ধে কথা বলছেন। তাহলে কি আমরা বলতে পারি, সিগারেট এবং মদের ওপর বাড়তি ট্যাক্স আরোপের কারণেই কি ওই মহলটি রাজপথে নেমে মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছেন?

তারেক রহমান বলেন, দেশের মানুষের চিকিৎসাব্যয় যাতে আয়ত্তের মধ্যে আনা যায় সেজন্য ঘোষিত বাজেটে চিকিৎসাসংক্রান্ত সকল ধরনের ট্যাক্স প্রত্যাহার করা হয়েছে। যাতে এর সুফল এই দেশের জনগণ পায়। অথচ বিশেষ মহলটি এই বাজেটের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। দেশের জনগণের কল্যাণ চায় না বলেই বাজেট নিয়ে তাদের এই অবস্থান।

নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী জনগণের কল্যাণে সরকার কাজ শুরু করেছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আঙুলে দেওয়া ভোটের কালি মোছার আগেই বিএনপি সরকার দেশের কৃষকশ্রমিক থেকে শুরু করে সকলের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড প্রদানের কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। আগামী এক বছরের মধ্যে প্রতি উপজেলায় ৮ থেকে ১০ হাজার পরিবারকে এই কার্ডের আওতায় নিয়ে আসা হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, এখানকার মানুষের অন্যতম দাবি হচ্ছে চট্টগ্রামকক্সবাজার মহাসড়ককে ছয় লেনে রূপান্তর করা। এছাড়া দেশের একমাত্র লবণ উৎপাদনকারী এ অঞ্চলের চাষিরা তাদের উৎপাদিত লবণের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না। যদিও বাজারে প্যাকেটজাত এক কেজি লবণের মূল্য ৪০ থেকে ৪২ টাকা। তাই লবণ চাষিদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করাসহ দেশীয় লবণ শিল্পকে বাঁচাতে কম করে হলেও দেশীয় উৎপাদিত লবণের মূল্য প্রতি কেজি ১৫ টাকা বা আরো বেশি হওয়া উচিত। তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে লবণ চাষিদের পক্ষে এই দাবি আমি রাখছি।

বাজেটে মদসিগারেটের দাম বাড়ানো বিরোধী দলের পছন্দ হয়নি : এবারের বাজেটে মদ ও সিগারেটের দাম বাড়ানোও বিরোধী দলের অপছন্দ বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, এবারের বাজেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় ৬০টি পণ্যের ওপর কর কমানো হয়েছে, ফলে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে। তবু বাজেটের সমালোচনা করছে বিরোধী দল।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, খবরের কাগজগুলোয় দেখলাম, এবারের বাজেটের পর এখন পর্যন্ত কোনো জিনিসের দাম বাড়েনি। কারণ চাল, ডাল, তেল, নুনসহ সব প্রয়োজনীয় জিনিসের ওপর যে ট্যাক্স ছিল, বর্তমান সরকার ৬০টি পণ্যের ওপর থেকে তা তুলে নিয়েছে। এর উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য একটাই, দেশের মানুষ যাতে ভালো থাকতে পারে।

দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে বিরোধী দল প্রস্তাবিত বাজেটের বিরোধিতা করছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিরোধী দল বলছে যে এই গণবিরোধী বাজেট তারা মানে না। আপনাদের কাছে আমি প্রশ্ন রেখে যেতে চাই, যেই বাজেটে ট্যাক্স কমানো হয়, সেই বাজেটও বিরোধী দল মানে না। যে বাজেটে মদের দাম বাড়ানো হয়, যে বাজেটে সিগারেটের দাম বাড়ানো হয়, সেই বাজেটও বিরোধী দলের পছন্দ নয়। তাহলে এবার বিরোধী দলের উদ্দেশ্য বুঝতে পেরেছেন?

তারেক রহমান বলেন, তাদের (বিরোধী দল) লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানো নয়। তাদের উদ্দেশ্য একটাই, দেশের মধ্যে অস্থিতিশীলতা ও অশান্তি তৈরি করা, মানুষকে বিভ্রান্ত করা।

দেশ আমাদের সবার মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই দেশই আমাদের প্রথম ঠিকানা। এই দেশই আমাদের শেষ ঠিকানা। সেজন্যই আমরা বলি এই দেশকে গড়লে আমরাই ভালো থাকব, আমাদের সন্তানরা শান্তিতে থাকতে পারবে।

চকরিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি এনামুল হকের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক এম মোবারক আলী ও চকরিয়া পৌরসভা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এম আবদুর রহিমের সঞ্চালনায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন কক্সবাজার১ আসনের সংসদ সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এ সময় বক্তব্য দেন পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী, প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন, কক্সবাজার৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান, স্থানীয় বিএনপি নেতা হারুনুর রশীদ ও কক্সবাজার সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল মাবুদ।

পেকুয়ায় প্রধানমন্ত্রী : পেকুয়া প্রতিনিধি জানান, ‘বিএনপি যখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকে না, তখনো দেশের স্বার্থে ও জনগণের স্বার্থে কথা বলে। বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকুক কিংবা বিরোধী অবস্থানে থাকুক, সব সময় দলের প্রধান অঙ্গীকার থাকে দেশ ও দেশের মানুষের কল্যাণ। ভবিষ্যতেও আমরা দেশের স্বার্থে এবং জনগণের স্বার্থে কাজ করে যাব। এটাই বিএনপির মূল লক্ষ্য, এটাই আমাদের প্রতিজ্ঞা এবং এটাই আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য।

কক্সবাজার জেলার পেকুয়া উপজেলায় নবগঠিত পেকুয়া পৌরসভার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন শেষে সমাবেশে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ কথা বলেন। গতকাল বিকাল ৫টায় পেকুয়া শহীদ জিয়াউর রহমান উপকূলীয় কলেজ মাঠে পেকুয়া পৌরসভার ভিত্তি স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আজকে পেকুয়া পৌরসভার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলাম। এখানে আরেকটি ভিত্তিপ্রস্তরের ইতিহাস রয়েছে। যাদের বয়স ২৫ বছরের কম, তারা হয়তো জানেন না, আজ থেকে ২৫ বছর আগে মরহুমা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া পেকুয়া উপজেলার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে গিয়েছিলেন। ২৫ বছর পর আবারও দেশনেত্রী খালেদা জিয়ারই দল বিএনপি সরকারের মাধ্যমে পেকুয়া পৌরসভার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হলো। এখানে যে দুটি কলেজ রয়েছে সে কলেজ দুটি দেশনেত্রী দিয়ে গিয়েছিলেন।

পেকুয়াবাসীর উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই মাঠে আমি বহু বছর আগে একবার জনসভা করেছিলাম। তখন গরু, ছাগল, হাঁসমুরগি বিতরণ করেছিলাম। ভবিষ্যতেও আমি এই মাঠে আবার আসব, আপনাদের সঙ্গে কথা বলব এবং একটি বিশাল জনসভা করব ইনশাআল্লাহ।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমসহ মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

নিজেই গাড়ি চালিয়ে এলেন পেকুয়ায় : পেকুয়ায় সফরে এসে ব্যতিক্রমী এক দৃশ্যের অবতারণা করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরকালে তিনি নিজেই গাড়ি চালিয়ে পেকুয়ায় পৌঁছান। এ সময় তাঁর পাশের আসনে বসেছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

গতকাল বিকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের গাড়িবহর পেকুয়া পৌঁছায়। প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। ৭ কিলোমিটার সড়কের দুই পাশে হাজারো নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ দাঁড়িয়ে তাকে স্বাগত জানান। প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর পেকুয়ায় প্রবেশ করলে উপস্থিত জনতা হাত নেড়ে ও স্লোগানে তাকে অভিনন্দন জানান। এ সময় প্রধানমন্ত্রী জনতার উদ্দেশে হাত নাড়েন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধরাঙ্গুনিয়ার যুবদল নেতাকে রাউজানে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা
পরবর্তী নিবন্ধআনোয়ারায় নিজ বাড়ি থেকে মা-মেয়ের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার