এলো ক্রুড অয়েল, পুরোদমে চালু হচ্ছে ইস্টার্ন রিফাইনারি

আড়াই মাস পর সৌদি থেকে এক লাখ টন বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছেছে দেশের জ্বালানি তেল সেক্টরে স্বস্তি

হাসান আকবর | বৃহস্পতিবার , ৭ মে, ২০২৬ at ৮:৩১ পূর্বাহ্ণ

সৌদি আরব থেকে এক লাখ টন ক্রুড নিয়ে বহুল প্রত্যাশার এমটি নিনেমিয়া গতকাল দুপুর নাগাদ চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছেছে। গতরাত ৮টা নাগাদ এই জাহাজ থেকে ক্রুড লাইটারিং শুরু হয়েছে। আজ বিকেলের মধ্যে এসব ক্রুড ইস্টার্ন রিফাইনারির ট্যাংকে পৌঁছাবে। আজ রাত অথবা কাল সকাল থেকে ইস্টার্ন রিফাইনারির বন্ধ থাকা দুইটি ইউনিটসহ পুরো প্ল্যান্ট পুরোদমে উৎপাদনে যাবে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দীর্ঘ প্রায় আড়াই মাসেরও বেশি সময় পর দেশে ক্রুডের চালান পৌঁছেছে। গত ১৮ ফেব্রুয়ারির পর এই প্রথম কোনো জাহাজ ক্রুড অয়েল নিয়ে দেশে এলো। চরম অনিশ্চিত পরিস্থিতিতেও ঠিকঠাকভাবে ক্রুডের চালানটি পৌঁছায় দেশের জ্বালানি তেল সেক্টরে স্বস্তি দেখা দিয়েছে।

সূত্র জানিয়েছে, ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ইস্টার্ন রিফাইনারির জন্য ১ লাখ টন ক্রুড বোঝাই করেও এমটি নরডিক্স পল্যাক্স জাহাজটি বাংলাদেশে আসতে পারেনি। জাহাজটি এখনো হরমুজের কারণে আটকা পড়ে আছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে জ্বালানি পরিবহন কার্যত বন্ধ হয়ে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের আগে দেশে পৌঁছানো ক্রুডের চালানটিই ছিল সর্বশেষ চালান। ইস্টার্ন রিফাইনারিতে দৈনিক প্রায় সাড়ে চার হাজার ক্রুড পরিশোধন করা হয়। এতে করে আগে ২১ জানুয়ারি আসা চালানের কিছু এবং ১৮ ফেব্রুয়ারির এক লাখ টন মিলে ইস্টার্ন রিফাইনারি উৎপাদন অব্যাহত রাখার চেষ্টা করে। পরবর্তীতে উৎপাদন কমিয়েও দেয়া হয়। কিন্তু এরপরও ক্রুড না আসায় এক পর্যায়ে গত ১৪ এপ্রিল ইস্টার্ন রিফাইনারির চারটি ইউনিটের মধ্যে দুইটি পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে হয়। অপর দুইটি ইউনিটও সীমিত পরিসরে বিটুমিন এবং পেট্রোল উৎপাদন করতে থাকে।

ইস্টার্ন রিফাইনারির জন্য ক্রুডের সংস্থান করতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) নানাভাবে চেষ্টা করে। সৌদি আরব থেকে এক লাখ টন ক্রুড নিয়ে আসার ব্যাপারে সবকিছু চূড়ান্ত করা হয়। বিপিসির ক্রুড পরিবহনের যাবতীয় ব্যবস্থা করে থাকে বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন (বিএসসি)। সৌদি আরবের ওই ক্রুড আনার জন্য বিএসসি ‘এমটি নিনেমিয়া’ ট্যাংকারটিকে ভাড়া করে। এক লাখ ধারণক্ষমতার এই ট্যাংকারটি সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে গত ২১ এপ্রিল চট্টগ্রাম বন্দরের উদ্দেশ্যে নোঙর তোলে। মার্শাল আইল্যান্ডের পতাকাবাহী ‘এমটি নিনেমিয়া’ জাহাজটি লোহিত সাগর হয়ে চট্টগ্রামের পথে যাত্রা করে। এতে পথিমধ্যে নানা প্রতিকূলতা থাকলেও শেষতক গতকাল দুপুর ১২টা ১৫ মিনিটে জাহাজ কুতুবদিয়ার অদূরে নোঙর করে।

জাহাজটি বহির্নোঙরে পৌঁছার পর কাস্টমস ও সার্ভেয়ার কোম্পানির আনুষ্ঠানিকতা শেষে গতরাত ৮টা নাগাদ বিএসসির ভাড়া করে লাইটারেজ ট্যাংকারে ক্রুড লাইটারিং শুরু হয়েছে। বিএসসি আটটি ট্যাংকার ভাড়া করেছে। এরমধ্যে ৬টি অপারেশনে গিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, একটি লাইটারেজ জাহাজ বোঝাই করতে সাড়ে চার ঘণ্টার মতো সময় লাগে। কুতুবদিয়া থেকে এটি বন্দর চ্যানেলের গুপ্তাখালস্থ ডলফিন জেটিতে পৌঁছাতে লাগবে আরো পাঁচ ঘণ্টার মতো সময়। আজ দুপুরের মধ্যে অন্ততঃ এক ট্যাংকার ক্রুড ইস্টার্ন রিফাইনারির ট্যাংকে পৌঁছাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করে সূত্র বলেছে যে, এগুলো ট্যাংকে নেয়ার পর সেটেলমেন্ট হতে একটু সময় দিতে হয়। সবকিছু সামলে আজ রাতে অথবা আগামীকাল সকালে ইস্টার্ণ রিফাইনারি পুরোদমে উৎপাদন শুরু করবে। এই ক্রুড দিয়ে ইস্টার্ন রিফাইনারি অন্ততঃ ২৫দিন নিরবিচ্ছিন্ন উৎপাদন চালাতে পারবে বলে উল্লেখ করে সূত্র বলেছে যে, আগামী ১১ মে সংযুক্ত আরব আমীরাতের ‘ফুজাইরা’ বন্দর থেকে এমটি ফসিল নামের অপর একটি ট্যাংকার এক লাখ টন ক্রুড নিয়ে চট্টগ্রামের পথে যাত্রা করবে। জাহাজটি আগামী ২৩ অথবা ২৪ মে চট্টগ্রামে পৌঁছাবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। এই জাহাজটিও হরমুজের পরিবর্তে লোহিত সাগর হয়ে চট্টগ্রামে আসার কথা রয়েছে।

ইস্টার্ন রিফাইনারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী শরীফ হাসনাত গতকাল দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘এমটি নিনেমিয়া’ জাহাজটি পৌঁছে গেছে। আজ আমরা ক্রুড রিসিভ করবো। আজ রাতেই আমরা প্ল্যান্ট পুরোদমে চালু করবো বলে আশা করছি। তবে ওয়েদারসহ কোন কারণে ক্রুড পৌঁছাতে দেরি হলে আগামীকাল সকাল থেকে পুরোদমে চালু হবে ইস্টার্ন রিফাইনারি।

প্রসঙ্গক্রমে তিনি বলেন, ক্রুডের অভাবে আমাদের দুইটি ইউনিট বন্ধ থাকলেও ইত্যবসরে আমরা ওগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ কাজ করে ফেলেছি।

বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক গতকাল দৈনিক আজাদীকে বলেন, ক্রুডবাহী জাহাজ পৌঁছে গেছে। আরো একটি ১১ মে এক লাখ টন ক্রুড নিয়ে যাত্রা করবে। আপাতত ইস্টার্ন রিফাইনারিতে ক্রুডের সংকট হওয়ার আর কোন আশংকা নেই বলেও কমডোর মাহমুদুল মালেক আশ্বস্ত করেন।

উল্লেখ্য, দেশের জ্বালানি তেলের অন্তত ২০ শতাংশ নির্ভরশীল বিপিসির মালিকানাধীন দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত্ব একমাত্র জ্বালানি তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির উপর। এতে বছরে ১৫ লাখ টনের বেশি ক্রুড অয়েল পরিশোধন করে ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন, ফার্নেস অয়েল, কেরোসিন, জেট ফুয়েল, ন্যাপথা, বিটুমিন, এলপিজিসহ ১৩ ধরণের পেট্রোলিয়াম প্রোডাক্ট তৈরি করা হয়।

ইস্টার্ন রিফাইনারিতে ২০২৪২৫ অর্থবছরে ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ১৪০ টন পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদন করা হয়। এর মধ্যে ডিজেল উৎপাদন হয়েছে সর্বোচ্চ ৬ লাখ ৪৮ হাজার ৬১২ টন। দেশে ডিজেলের চাহিদা বছরে গড়ে ৪০ থেকে ৪২ লাখ টন। চাহিদার বাকি ডিজেল পরিশোধিত অবস্থায় বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকটের সময় সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং ভারত থেকে ডিজেল আমদানি বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল।

উল্লেখ্য, ইস্টার্ন রিফাইনারির ডিজাইনে মধ্যপ্রাচ্য কেন্দ্রিক ক্রুডই পরিশোধন করা যায়। বাংলাদেশ জিটু জিপদ্ধতিতে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এসব ক্রুড আমদানি করে। আমদানি করা ক্রুডের শতভাগ পরিবহন করে সরকারি পতাকাবাহী প্রতিষ্ঠান বিএসসি। আমেরিকান প্রতিষ্ঠান নর্ডিক এনার্জি থেকে চার্টারে ট্যাংকার ভাড়া নিয়ে বিএসসি ইস্টার্ন রিফাইনারির সব ক্রুড পরিবহন করে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধনির্ভয়ে নিরপেক্ষভাবে কাজ করুন
পরবর্তী নিবন্ধসৌন্দর্যবর্ধনের নামে নির্মাণাধীন বাণিজ্যিক স্থাপনা উচ্ছেদ