বিদ্যুতের পাইকারি ও খুচরা মূল্য এবং সঞ্চালন ব্যয়ে পরিবর্তন আনার প্রস্তাব নিয়ে ২০ ও ২১ মে গণশুনানি করবে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। গতকাল বুধবার কমিশনের নোটিশে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) বিদ্যুতের পাইকারি ও খুচরা দামে পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছে। বিতরণ কোম্পানিগুলোর মূল্যহার পরিবর্তনের প্রস্তাবও কমিশনের কার্যক্রমে রয়েছে।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ (পিজিবি) দিয়েছে সঞ্চালন মূল্যহার পরিবর্তনের প্রস্তাব। আর বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (বাপবিবো), ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি), ঢাকা ইলেক্ট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (ডেসকো), ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ওজোপাডিকো) ও নর্দান ইলেক্ট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসি (নেসকো) খুচরা মূল্যহার পরিবর্তনের প্রস্তাব জমা দিয়েছে। খবর বিডিনিউজের।
বিইআরসি বলছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন ট্যারিফ প্রবিধানমালা ২০০৮, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ট্যারিফ প্রবিধানমালা ২০১৬ এবং বিদ্যুৎ বিতরণ খুচরা ট্যারিফ প্রবিধানমালা ২০১৬ অনুযায়ী প্রস্তাবগুলোর বিষয়ে গণশুনানি করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বিইআরসি সচিব মো. নজরুল ইসলাম সরকার বিদ্যুতের পাইকারি, সঞ্চালন ও খুচরা মূল্যহার পরিবর্তনের প্রস্তাবের ওপর ২০ ও ২১ মে গণশুনানি করার কথা জানিয়েছেন। তবে কী পরিমাণ দাম বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে গণশুনানির আয়োজন করা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাতে পারেননি তিনি। কমিশনের সময়সূচি অনুযায়ী, ২০ মে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত পিডিবির পাইকারি মূল্যহার পরিবর্তনের প্রস্তাবের ওপর শুনানি হবে। একই দিন দুপুর ২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত শুনানি হবে পিজিবির সঞ্চালন মূল্যহার পরিবর্তনের প্রস্তাবের ওপর। ২১ মে সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত পিডিবি, পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড, ডিপিডিসি, ডেসকো, ওজোপাডিকো ও নেসকোর খুচরা মূল্যহার পরিবর্তনের প্রস্তাবের ওপর শুনানি হবে। সব শুনানি হবে ঢাকার খামারবাড়ি রোডে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশের (কেআইবি) মিলনায়তনে।
গণশুনানিতে অংশ নিতে আগ্রহী ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সংস্থাকে ১৭ মের মধ্যে কমিশনে নাম তালিকাভুক্ত করতে বলা হয়েছে। শুনানির আগে লিখিত বক্তব্য বা মতামত ১৮ মের মধ্যে কমিশনে পাঠাতে হবে। তালিকাভুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান শুনানিতে অংশ নিয়ে বিদ্যুতের পাইকারি, সঞ্চালন ও খুচরা মূল্যহার পরিবর্তনের প্রস্তাবের বিষয়ে বিশ্লেষণধর্মী তথ্য, উপাত্ত ও সংশ্লিষ্ট দলিল উপস্থাপন করতে পারবে।
পাইকারিতে কত বাড়তে পারে : পিডিবি পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৭ থেকে ২১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের পাইকারি মূল্য গড়ে ৭ টাকা ৪ পয়সা। ১৭ থেকে ২১ শতাংশ বাড়লে ইউনিটপ্রতি দাম বাড়তে পারে ১ টাকা ২০ পয়সা থেকে দেড় টাকা পর্যন্ত। পিডিবির প্রস্তাবে পাইকারিতে ইউনিটপ্রতি ৫০ পয়সা, ১ টাকা এবং ১ টাকা ২০ পয়সা পর্যন্ত বাড়ানোর তিনটি বিকল্প রাখা হয়েছে। এসব বিকল্পের সঙ্গে খুচরা পর্যায়েও সংশ্লিষ্ট মূল্য সমন্বয়ের কথা বলা হয়েছে।
খুচরায় চাপ কত : খুচরা পর্যায়ে ব্যবহারভিত্তিক স্তরে ভিন্ন হারে দাম বাড়তে পারে। প্রস্তাব অনুযায়ী, আবাসিক শ্রেণিতে বেশি ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে ইউনিটপ্রতি ৭০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৮০ পয়সা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। তবে ৭০ থেকে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী গ্রাহকদের ক্ষেত্রে দাম না বাড়ানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
ভর্তুকি কমানোর যুক্তি : মন্ত্রণালয়ের একটি সারসংক্ষেপধর্মী নথিতে বলা হয়েছে, বর্তমান ট্যারিফে বিদ্যুৎ বিক্রি চলতে থাকলে ২০২৫–২৬ অর্থবছরে পিডিবির সম্ভাব্য ঘাটতি ৫৬ হাজার ৪৭৫ কোটি ২০ লাখ টাকা হতে পারে। পিডিবির প্রস্তাব অনুযায়ী, পাইকারি ট্যারিফ ইউনিটপ্রতি ৫০ পয়সা বাড়ালে সরকারের ভর্তুকি ৫ হাজার ২৪৪ কোটি ৫৮ লাখ টাকা কমবে। ১ টাকা বাড়ালে ভর্তুকি কমবে ১০ হাজার ৪৮৯ কোটি ১৬ লাখ টাকা। আর ১ টাকা ২০ পয়সা বাড়ালে ভর্তুকি কমতে পারে ১২ হাজার ৫৮৬ কোটি ৯৯ লাখ টাকা।
মন্ত্রণালয়ের যুক্তি, মূল্য না বাড়িয়ে বিদ্যুতের বর্তমান সরবরাহ ধরে রাখতে ভর্তুকির চাপ সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাপনার ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। জ্বালানি আমদানি ব্যয়, ডলার সংকট, এলএনজি, কয়লা ও তেলের দাম এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যয় বৃদ্ধিকে দাম সমন্বয়ের যুক্তি হিসেবে দেখানো হচ্ছে। সঞ্চালন খরচও বাড়ানোর প্রস্তাব এসেছে। পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি প্রতি ইউনিটে সঞ্চালন চার্জ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে।
আগে কবে বেড়েছিল : সবশেষ ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়। তখন খুচরায় ৮ দশমিক ৫ শতাংশ এবং পাইকারিতে ৫ শতাংশ দাম বাড়ে। তাতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের পাইকারি মূল্য গড়ে ৬ টাকা ৭০ পয়সা থেকে ৩৪ পয়সা বেড়ে ৭ টাকা ৪ পয়সা হয়। বর্তমানে খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় মূল্য ইউনিটপ্রতি ৮ টাকা ৯৫ পয়সা।
বিইআরসির নোটিশে বলা হয়েছে, বিদ্যুতের পাইকারি, সঞ্চালন ও খুচরা মূল্যহার পরিবর্তনের প্রস্তাবের অনুলিপি অফিস চলাকালে কমিশন কার্যালয় থেকে সংগ্রহ করা যাবে। কমিশনের ওয়েবসাইট থেকেও ডাউনলোড করা যাবে।














