জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আজ যখন পেছনে ফিরে তাকাই, তখন কিছু মানুষের মুখ আলাদা করে মনে পড়ে, যাঁরা শুধু আমাদের শিক্ষা দেননি, আমাদের তৈরি করেছেন। আমার জীবনে তেমনই একজন মানুষ ছিলেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের কিংবদন্তি শিক্ষক, বাংলাদেশের নিউরোসার্জারির অন্যতম পথিকৃৎ প্রফেসর এল এ কাদেরী।
স্যার নিজেই ছিলেন অসাধারণ মেধাবী ছাত্র। কিন্তু তিনি কখনো সাধারণ বা গতানুগতিক পথ বেছে নিতে চাননি। এমন এক সময়ে নিউরোসার্জারিকে নিজের জীবনের ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন, যখন বাংলাদেশে এই বিশেষায়িত চিকিৎসা ছিল প্রায় অজানা ও নবীন। ইংল্যান্ডে উচ্চতর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফিরে চট্টগ্রামে নিউরোসার্জারি বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন। চট্টগ্রাম ও এই অঞ্চলে নিউরোসার্জারির পথচলায় তিনি ছিলেন একজন সত্যিকারের অগ্রদূত।
কিন্তু আমার কাছে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়–তিনি ছিলেন আমার মেন্টর।
মেডিকেল কলেজে খুব অল্প সময়েই স্যারের স্নেহ পাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। সুদর্শন, পরিশীলিত, মেধাবী ও অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী এই মানুষটিকে দেখে আমরা শুধু ভালো চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখিনি, শিখেছি একজন পরিপূর্ণ মানুষ কেমন হওয়া উচিত।
তিনি আমাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের বাইরেও অনেক কিছু শিখিয়েছেন–নেতৃত্ব, মূল্যবোধ, রোগীর প্রতি মমতা, চিকিৎসকের শিষ্টাচার, কাজ ও ব্যক্তিজীবনের ভারসাম্য, এমনকি রুচি ও জীবনযাপনের সৌন্দর্যও। ছাত্রজীবনে কোনো সমস্যায় পড়লে প্রথমেই ছুটে যেতাম তাঁর কাছে। তিনি কখনো ফিরিয়ে দেননি। আমার কাছে তিনি ছিলেন এক বিশাল ছাতার মতো–যাঁর ছায়ায় নিজেকে নিরাপদ মনে হতো।
মেডিকেল কলেজ শেষ হয়েছে, দেশ ছেড়েছি, জীবনের পথ আমাকে অনেক দূরে নিয়ে গেছে–কিন্তু সেই সম্পর্ক কখনো শেষ হয়নি। বাংলাদেশে গেলে তাঁর সঙ্গে দেখা করা ছিল আমার এক অলিখিত নিয়ম। শেষবার তাঁকে দেখেছিলাম লন্ডনে, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ অ্যালামনাই পুনর্মিলনীতে। কলেজ ও অ্যালামনাইদের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল আজীবন।
আজ আমাদের চিকিৎসা শিক্ষা ও একাডেমিক জীবনে সবচেয়ে বড় অভাবগুলোর একটি হলো সত্যিকারের মেন্টরের অভাব। শিক্ষক জ্ঞান দেন, কিন্তু একজন মেন্টর একজন তরুণের ভেতরের সম্ভাবনা দেখতে পান, তাঁকে বড় স্বপ্ন দেখান, সাহস দেন এবং নিজের পথ তৈরি করতে শেখান। প্রফেসর কাদেরী ছিলেন ঠিক তেমনই একজন মেন্টর।
স্যার আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু সত্যিকারের মেন্টররা কি কখনো চলে যান? তাঁরা বেঁচে থাকেন তাঁদের ছাত্রদের চিন্তায়, কাজে, মূল্যবোধে এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া শিক্ষায়।
আমার জীবনে তাঁর স্নেহ ও শিক্ষা এক অমূল্য সম্পদ। আজও মনে হয়–আমাদের আরও অনেক প্রফেসর কাদেরী প্রয়োজন, যাঁরা শুধু চিকিৎসক তৈরি করবেন না, মানুষ তৈরি করবেন, স্বপ্ন দেখাবেন এবং একটি প্রজন্মকে পথ দেখাবেন।
আল্লাহ আমার প্রিয় স্যারকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন। আমিন।
লেখক : ডা. বি এম আতিকুজ্জামান, কনসালট্যান্ট গ্যাস্ট্রো এন্টেরোলজিস্ট, অরল্যান্ডো হাসপাতাল, ফ্লোরিডা, ইউএসএ। শিক্ষক, গবেষক, লেখক ও স্বাস্থ্যসেবা প্রশাসক।












