সৌদি ও মিশরিরা ফুটবল পাগল। বিশ্বকাপ ঘিরে এসব করার মার্কেটিং যুক্তি অবশ্যই আছে। কিন্তু কমপ্লায়েন্সের দিক থেকে এ তো মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। কোনমতেই এসব আমার কোম্পানির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তারপরও বড় কথা হল, এ থেকে তো একদিকে যেমন জানা গেল অন্যান্য কোম্পানির কার্যক্রমের খবর, তেমনি জানা গেল গুরুত্বপূর্ণ কাস্টমার মেন্টালিটি ও মার্কেট প্রাকটিস! ‘হাই বাডি! ইফ ফ্রি, প্লিজ পপ ইন টু মাই রুম !’ ফিলের ফোনেই বুঝেছি ডাকছে কী জন্য। আজ সে নিচ্ছিল আমার দুই সেমিফাইনালিস্টের ফাইনাল ভাইভা। হ্যাঁ পাঁচজনের মধ্যে দুইজনকে ঠিক করেছিলাম, ফিলের ইন্টারভিউর জন্য। যার মধ্যে আছে ঐ মিশরি তরুণ, যার কাছে পেয়েছিলাম এইডস রোগ বিষয়ক অভিজ্ঞান। ফিলের রুমে পা দিতেই একরাশ ধোঁয়ার সাথে টেবিলের ওপাশ থেকে ভেসে এলো– ‘হা, হা, হা সেলিম। এতো সোজা একটা পরীক্ষা দিলা আমারে! ইজ নট ইট অভিয়াস। নাহ, খুব কঠিন ধাঁ ধাঁ দিতে পারো নি। দুইজনের মধ্যে তুমি যে কাকে নিবা, তা সহজে বুঝে গেছি। নিয়ে নাও, নিয়ে নাও।’ প্রথামাফিক এইদিকে ঠেলে দেয়া ফিলের ফিলিপ মরিস সিগারেটের প্যাকেট থেকে সিগারেট নিয়ে সেটির মুখাগ্নি করতে করতে বলি, তুমি হইলা আমার বস। তোমার পরীক্ষা নেব আমি! সব মার্কেটেই ভাল লোক বিরল। এখানে আছে ইকামা বিষয়ক ঘাপলা। ভাল লোক, কে ছাড়তে চায় বল? বাকী তিনজনকে তো পাঠাই নাই, তোমার সময় নষ্ট হবে বলে। যে দুইজনকে পাঠিয়েছি তাদের একজন ১০০ হলে আরেকজন তো কমপক্ষে ৮৫ দিতে হয়। ‘সেটাই তো। আই এম কনভিন্সড। নিয়ে নাও বিজয় কাপাই কে। লং সৌদি এক্সপেরিয়েন্স। ম্যাচিরড, সাকসেসফুল উইথ কমপ্লায়েন্ট মাইন্ডসেট। আর ভারতীয় হওয়াতে তোমার টিমের ব্যালান্সও ঠিক হবে। দেরি করো না। তাড়াতাড়ি অফার দিয়ে নিয়ে নাও।’
থ্যাংকস বস। ‘দাঁড়াও, দাঁড়াও ! শোন স্যালারি নেগশিয়েশনের সময় তুমি কিন্তু থেকো গিউসির সাথে। শুধু বেতনের জন্য এই ক্যান্ডিডেট হারানো চলবে না।’ গট ইট। টেক ইট এজ ডান! ধোঁয়ার সাথে এ কথাগুলো ছড়িয়ে দিয়ে রওয়ানা করলাম গিউসির রুমের উদ্দেশ্যে। ‘লুক মিঃ সেলিম, ইউ হ্যাভ ফ্রেন্ডস দেয়ার।’ উদ্দেশ্যমূলক হাসিতে কথা ক’টি উচ্চারণের সাথে করলো তর্জনী নির্দেশও। পড়লো চোখে দিগন্ত বিস্তৃত খাকি বালির সমুদ্রের মাঝে, দূরে নড়াচড়া করতে থাকা মনুষ্যাকৃতিগুলো। একই সাথে গাড়ীর ট্যাঙ্ক ভর্তি করে বিল নিতে আসা উপমহাদেশীয় আকার, আকৃতি, রং ও আদলের কর্মীটিকে দেখিয়ে বলল– ‘হিয়ার ইজ এনাদার।’ শুরু থেকেই ফাহাদের এই অভ্যাসটি লক্ষ করেছি। ইংরেজি বলতে গিয়ে বেশীরভাগ সময়ই ও, আ, ইয়া, ইয়ান্নি এই রকম অর্থহীন কিছু কষ্টব্যঞ্জক ধ্বনি উচ্চারণের সাথে বীরদর্পে ভুলভাল ইংরেজি বাক্য গঠন করলেও, আমাকে খোঁচা দেয়ার সময় বাক্যগঠন হয় মোটামুটি ঠিকঠাক।
দ্যাটস কূল! থ্যাংকস ফাহাদ, ইউ ফাউনড মাই ব্রাদার্স ইন দিস ডিপ ডেজার্ট অলসো। কি ভাই বাংলাদেশ নাকি? বাড়ী কোথায়? অনেকটাই আন্দাজে এক ঢিলে দুই পাখি মারার এই দ্বিভাষিক বয়ানে, ফাহাদ ও আগুন্তুক দুজনেই গেল হকচকিয়ে। ফাহাদ সম্ভবত কল্পনাই করেনি দেশীয় ভাইদের পেশাগত পরিচয় উপেক্ষা করে আমি তাকে ভাই বলে ঘোষণা দেব। এ যাবতকালে সউদি সংস্কৃতির কিঞ্চিৎ বুঝেছি যা, জানি তাতে, এদের কাছে ভাই সম্পর্কের তুমুল গুরুত্ব। কোম্পানি প্রদত্ত আমার পদমর্যাদা ও ক্ষমতার কাছে স্বভাবদোষে ফাহাদ নতজানু হলেও, আছে তা নিয়ে তীব্র মনোবেদনা তার।
প্রায়শই আমার গায়ের রং আর জাতিগত পরিচয় মাথাচাড়া দেয় তার মনে। সেই মনোকষ্ট লাঘবের জন্য, সৌদিতে তথাকথিত ছোট কাজে নিযুক্ত দেশী যে ভাইয়েরা আছেন, তাদেরকে আমার বন্ধু অভিধা দিয়ে প্রায়শই খোঁচা দেয় ফাহাদ। রা করিনি কখনো, তা নিয়ে এ পর্যন্ত। আজই প্রথম এক্কেবারে ঘোষণা দিয়ে তাদের ভাই বলে বুকে টেনে নিতেই, হতভম্ব সে। অন্যদিকে পেট্রলের দাম নিতে আসা ভাইটিও গেছেন ভড়কে। হতে পারে হয়েছে তা মরুর এই লু হাওয়ায় হঠাত উড়ে আসা অপরিচিত একজনের মুখ থেকে সুমধুর বাংলা শুনে। কিম্বা এও হতে পারে, খাস সৌদিচালিত আম্রিকান জেনারেল মটরসের জবরদস্ত এসইউভির যাত্রীসিট থেকে ভূতো এই বাঙ্গালকে নামতে দেখে গেছেন ঘাবড়ে!
থতমত খেয়ে একবারই চোখ তূলে তাকিয়ে দ্রুতই চোখ নামিয়ে তমিজের সাথে বলল -‘জি স্যার । কুমিল্লার, চৌদ্দগ্রাম।’
এরপর ফাহাদের কাছ থেকে দাম বুঝে নিয়ে দ্রুত চলে গেল সে পাম্পের অফিস ঘরের দিকে। চলে যাওয়ার তার দেহভঙ্গিটির পালাই পালাই ভাব, দৃষ্টি এড়ায়নি ফাহাদের। নিজের ভ্যাবাচ্যাকা অবস্থা কাটানোর একটি মোক্ষম সুযোগ পেয়ে, জোর হাসিতে বলল ফাহাদ– ‘তোমাকে দেখে কি লজ্জা পাচ্ছে নাকি?’ না না, ভাইয়ের কাছে ভাইয়ের লজ্জা আবার কী? বলেই জানলাম যেতে হবে প্রাকৃতিক ডাকে সাড়া দিতে।
দ্রুত অগ্রসমান দিনগুলোর গতিকে অতিক্রম করে ঘটতে থাকা ঘটনার ঘনঘটায় উঠেছিলাম হাঁফিয়ে। তার উপর বোঝার উপর পাষাণভারের মতো বসেছে চেপে ঘাড়ে জরুরি অবস্থা, মোকাবেলা দায়। এমতবস্থায় ভাবছিলাম যখন, “বিশ্রাম কাজের অঙ্গ এক সাথে বাঁধা” তখনই ফাহাদ দিয়েছিল প্রস্তাব সাথী হবো কিনা তার সাপ্তাহিক মরুভ্রমণে? অগ্রপশ্চাৎ না ভেবেই হয়েছিলাম রাজী, এককথায়। সে মোতাবেক রিয়াদ থেকে মরুর বুক চিরে আল–গাসিম মুখি হাইওয়েতে একটানা তিন ঘণ্টা গাড়ী চালানোর পর, আধা ঘণ্টা আগে ঢুকেছিল ফাহাদ এই পার্শ্ব রাস্তায়। উদ্দেশ্য, আমার বহুলপ্রার্থিত মরুর গ্রাম দেখতে যাওয়া।
দিগন্তবিস্তারি নানান উচ্চতার নানান সেইডের পুলিশি রঙ্গয়ের বালির সাগরের মাঝের, এই পেট্রল পাম্পে ডুকিয়েছিল গাড়ী ফাহাদ, ট্যাঙ্কি ভরার জন্য। পেট্রল পাম্প লাগোয়া এই এলাকায় আরো বেশ কটা দোকানও আছে। বিক্রি করছে ওরা নানান কিছু। এদিকে টয়লেট থেকে আমি ফিরতেই, ফাহাদেরও পেল মনে হয় প্রাকৃতিক ডাক। ডিসেম্বরের এই সময়টায় শুনেছি সন্ধ্যার দিকে ঝপ করেই নেমে যায়, মরুর থার্মোমিটারের পারদ। মাঝারি ধরনের জ্যাকেট চাপিয়ে বেড়িয়েছিলাম তাই। এখন এই দুপুরে, লক্ষ কোটি চক্ষু বিস্ফোরিত করে দিগন্তবিস্তারি বালিরসমুদ্রের তাকিয়ে থাকা মার্তন্ডের তেজে, টের পাচ্ছি বাতাসে আগুনের হল্কা। গাড়ি থেকে বেরিয়ে ঘেমে গেছি তাই এরই মধ্যে।
আমি তো আমি, মরুবাসি ফাহাদও দেখছি এই শীতের দুপুরের গরমে উঠেছে হাঁফিয়ে। প্রাকৃতিক ঘরে হাজিরা শেষে হাচড়ে পাছড়ে উঠেছে সে ড্রাইভিং সিটে। দুপুর আড়াইটার মতো বাজলেও পায়নি খিদে মোটেও। (চলবে)
লেখক : প্রাবন্ধিক, ভ্রমণ সাহিত্যিক।













