উপরে ফিটফাট, ভিতরে ‘আবর্জনাঘাট’

সুলতান মাহমুদ সেলিম | শনিবার , ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৯:৩৬ পূর্বাহ্ণ

উপরে ফিটফাট, ভিতরে সদরঘাট’ এই প্রবাদের সাথে যেন ঠিক মিলে যাবে কাজের দেউড়িতে অবস্থিত নগরীর অন্যতম টাইলস মার্কেট বলে খ্যাত সিজেকেএস শপিং কমপ্লেক্স বা স্টেডিয়াম শপিং কমপ্লেক্সের বর্তমান অবস্থা। পাঁচতলা মার্কেটের বহিরাঙনে ঝাঁ চকচকে উজ্জ্বল আলোয় সুদৃশ্য সব টাইলসের দোকান। কিন্তু ভেতরে গেলে বোঝা যাবে কী জঘন্য পরিবেশ বিরাজ করছে সেখানে। এমন পরিবেশ দেখে অনেক মন্তব্য করেন, উপরে ফিটফাট, ভিতরে আবর্জনাঘাট। মার্কেট কমিটির ভাষ্যমতে, দীর্ঘ ১১ বছর ময়লা আবর্জনার স্তূপ জমা হয়ে আছে মার্কেটের ভেতরে, সিঁড়ির গোড়ায় গোড়ায়, ভেতরের বিশাল পার্কিং মাঠে এবং রাস্তায় রাস্তায়। অবস্থা এমন পর্যায়ে গেছে ময়লার ভাগাড় মার্কেটের দোতলা পর্যন্ত ছুঁয়েছে। এসব ময়লাআবর্জনা কিন্তু জমা হয়েছে মার্কেটে যাদের অবস্থান সেইসব দোকানসমূহের মাধ্যমে। তাদের প্রতিদিনের ফেলে দেয়া আবর্জনা থেকেই এর উৎপত্তি।

সরেজমিনে পরিদর্শনে দেখা যায়, সিজেকেএস শপিং কমপ্লেক্সের অভ্যন্তরভাগ যেন একটি বিশাল ডাস্টবিন বা ময়লার ভাগাড়। মার্কেটে অবস্থানকারীদের ফেলে দেয়া ময়লা আবর্জনা জমতে জমতে উঁচু পাহাড়ের মতো হয়েছে। নিচতলা থেকে উপরে ওঠার সিঁড়ির রাস্তাও বন্ধ হয়ে গেছে তাতে করে। বন্ধ হয়ে গেছে ভেতরের অনেক রাস্তাও। দোকানের ময়লা ফেলার নির্দ্দিষ্ট কোনো জায়গা নেই। দোকানিরা নিজ নিজ ইচ্ছেমত প্রতিদিনের জমাকৃত ময়লা ফেলে তাদের নিকটেই সিঁড়ির গোড়ায়। এতে করে অনেক দিনের জমাকৃত ময়লায় এক ভয়ংকর অবস্থা বিরাজ করছে মার্কেটের অভ্যন্তরে। যা ভেতরে প্রবেশ না করলে কেউ বুঝতে পারবেন না।

এই মার্কেটের মালিকানা চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থার। তারাই এই মার্কেটের দোকান ভাড়া, অফিস ভাড়া ইত্যাদি সংগ্রহ করে। মূলত ১৯৮৮ সালে চালু হয় এই মার্কেটটি। তবে পরিপূর্ণভাবে চালু হয় আরো পরে ২০১২ সালের দিকে। ২০১৯২০২০ সালের দিক থেকে মার্কেটের কমিটি গঠিত হতে থাকে। বর্তমান কমিটি দায়িত্ব পেয়েছেন তিন চার মাস আগে। তাঁদের ভাষায় আগের কমিটিগুলো এ ব্যাপারে খুব বেশি সক্ষমতার পরিচয় দিতে পারেননি। যার ফলে এ অবস্থা। সিজেকেএস স্টেডিয়াম শপিং কমপ্লেক্স দোকান মালিক ও ব্যবসায়ী সমিতির বর্তমান সভাপতি মো. মোখলেছুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক মো. কামাল হোসেন এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. সালাউদ্দিন চৌধুরী। তাঁরা জানান, বর্তমানে এই শপিং কমপ্লেক্সে ছয়শ’রও বেশি দোকান ও অফিস ঘর আছে। শুধু টাইলস নয় এখানে প্লাই বোর্ড, কেমিক্যাল, পলিথিন এবং অন্য সামগ্রীরও দোকানও আছে। দোতলায় আছে কেমিক্যাল আইটেমের দোকান। শপিং কমপ্লেক্সটির অবস্থান জামালখান, বাগমনিরাম এবং এনায়েত বাজার ওয়ার্ডের সংযোগস্থলে। কমিটি নেতৃবৃন্দের মতে, এর ফলে কেউই দায়িত্ব নিতে চান না। তাঁরা জানান, এখানে বর্জ্য ফেলা হয় যত্রতত্রভাবে। আবার অপসারণের কোনো সিস্টেম নেই। জমতে থাকা বর্জ্য আজ বিশাল ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। এ থেকে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ, ময়লা পানি, মশামাছি ইত্যাদি। এখান থেকে হতে পারে ডেঙ্গুর মতো মারাত্মক কোনো রোগও। আরো বড় আতংকের ব্যাপার যে এই দাহ্য ময়লা আবর্জনায় কেউ বিড়ি সিগারেটের জ্বলন্ত অবশিষ্টাংশ ছুঁড়ে ফেললে তা থেকে আগুন ধরে মারাত্মক বিপদ ঘটাতে পারে। নিমিষে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে কোটি কোটি টাকার সম্পদ। ব্যবসায়ীরা জানান, অগ্নি নিবার্পক গাড়ি মার্কেটের অভ্যন্তরে ঢুকতে পারে না। মেইন রোড থেকেই অগ্নি নির্বাপনের কাজ করতে হবে।

ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ বলেন, একটা দুঃসহ, আতংকজনক পরিস্থিতিতে আছি আমরা। শপিং কমপ্লেক্সের মালিক সিজেকেএস কোনো দায়িত্ব নেয় না। আমরা ভাড়া, ট্যাক্স নিয়মিত প্রদান করছি কিন্তু বিপরীতে প্রয়োজনীয় অনেক সুযোগ সুবিধা থেকেই বঞ্চিত। তাঁদের ভাষায় বর্তমান ময়লা আবর্জনার পরিমাণ হবে অন্তত ২০০ ট্রাক। আমরা কিছু ময়লা অপসারণ করেছিলাম নিজেদের অর্থে। কিন্তু এই বিশাল বর্জ্য সরানো আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। এই পাহাড়সম বজ্যের কারণে এখানে গাড়ি পার্ক করা যায় যায় না, ক্রেতারাও এই মার্কেটে ঢুকতে অস্বস্তি বোধ করেন। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. সালাউদ্দিন চৌধুরী জানান, আমরা এ ব্যাপারে সিজেকেএস সভাপতি, চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মহোদয় বরাবরে পত্র দিয়েছি। সিজেকেএস এর পক্ষ থেকে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) গত বছর চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন বরাবরে সিজেকেএস শপিং কমপ্লেক্সের ভেতরে এবং এর চারপাশে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য চিঠি দেন। কিন্তু কোনো সুরাহা হয়নি। গতকাল রাতে সিজেকেএস অ্যাডহক কমিটির সদস্য সচিব হাজী মোহাম্মদ সালাউদ্দিন দৈনিক আজাদীকে জানান, দু’মাস আগেও আমরা সিজেকেএস এর পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে অবহিত করেছি। তারা এ নিয়ে এখনও কিছু আমাদের বলেননি।

গত ১৩ মে স্টেডিয়াম শপিং কমপ্লেক্স দোকান মালিক ও ব্যবসায়ী সমিতি নিজেরাই কমপ্লেক্সের ভেতর জমা হয়ে থাকা ময়লা আবর্জনার স্তূপ অপসারণের অনুরোধ করে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র বরাবরে অনুরোধ পত্র দেয়। এরপর চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে আবর্জনা স্থল পরিদর্শন করা হয়। তবে আর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। এদিকে এদিকে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরীর সাথে গত রাতে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আগামীকালই (আজ) এ ব্যাপারে খোঁজ নেব। আশা করি একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে। তবে তিনি এ ব্যাপারে আগে কোনো অভিযোগ পাননি বলে জানিয়েছেন।

স্টেডিয়াম শপিং কমপ্লেক্স দোকান মালিক ও ব্যবসায়ী সমিতির পক্ষ থেকে আরো বলা হয়, এ বিশাল মার্কেটে নিরাপত্তা সংকটও আছে। সাতজন আনসার সদস্য নিরাপত্তার কাজে আছেন কিন্তু পরিপূর্ণ সক্ষমতা দেখাতে পারছেন না তারা। এমন অসুস্থ পরিবেশ নতুন উৎপাত শুরু হয়েছে মাদক দ্রব্যের বিস্তার। বখাটে জাতীয় কিছু লোক মাদকদ্রব্য বিকিকিনি এবং ব্যবহারের জন্য স্থানটিকে উপযুক্ত বলে ভেবে নিয়েছে। ফলে নতুন আরেক সংকট দেখা দিচ্ছে এলাকাটাকে ঘিরে। তবে সচেতন মহলের মতে মার্কেটের ব্যবহারকারী দোকান মালিক এবং ব্যবসায়ীরা কোনোভাবেই এই পাহাড়সম বর্জ্য জমা করার দায় এড়াতে পারেন না। নির্ধারিত জায়গা ছেড়ে যত্রতত্র নিজেদের ইচ্ছেমত ময়লা ফেলার কারণেই তাদের এই পরিণতি। এ থেকে মুক্তি পেতে হলে তাদেরই এগিয়ে আসতে হবে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অনুকূল সহায়তা করতে হবে দায়িত্বরত যাঁরা আছেন তাঁদেরকে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধমিয়ানমারে পাচার হচ্ছিল সিমেন্ট, দুটি কার্গো বোটসহ ১,২৬০ বস্তা জব্দ
পরবর্তী নিবন্ধআজ স্টাডি ইন মালয়েশিয়া এক্সপো শুরু