উপকূলীয় বাঁধ সংস্কারে ৫৫৮ কোটি টাকার প্রকল্প একনেকে অনুমোদন

সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া থেকে কুমিরা পর্যন্ত ঘূর্ণিঝড় জলোচ্ছ্বাস ও সমুদ্রের ঢেউয়ের আঘাত থেকে জনপদ কৃষিজমি যোগাযোগ অবকাঠামো ও শিল্পাঞ্চল রক্ষায় এ উদ্যোগ

হাসান আকবর | বৃহস্পতিবার , ২০ আগস্ট, ২০২৬ at ১০:২২ পূর্বাহ্ণ

সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া থেকে কুমিরা পর্যন্ত দীর্ঘদিনের ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় বাঁধ অবশেষে টেকসইভাবে সংস্কার ও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, অস্বাভাবিক জোয়ার ও সমুদ্রের ঢেউয়ের আঘাত থেকে উপকূলীয় জনপদ, কৃষিজমি, যোগাযোগ অবকাঠামো ও শিল্পাঞ্চল রক্ষায় ৫৫৮ কোটি ৮৩ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। গতকাল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একনেকের সভায় এই প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়া হয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় বাঁশবাড়িয়া ফেরিঘাটের ১ দশমিক ৩১৫ কিলোমিটার বাঁধ টেকসইকরণ, ৫ দশমিক ৪৯০ কিলোমিটার সিডাইক নির্মাণ এবং আটটি স্লুইসগেট পুনর্নিমাণ করা হবে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ‘চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণ্ড উপজেলার বাঁশবাড়িয়া ফেরিঘাট এবং বাঁশবাড়িয়া ফেরিঘাট হতে কুমিরা ঘাট পর্যন্ত উপকূলীয় বাঁধ শক্তিশালীকরণ’ শীর্ষক প্রকল্পের মাধ্যমে উপরোক্ত কার্যক্রম বাস্তবায়িত হবে। প্রকল্পটি সীতাকুণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ বাঁশবাড়িয়াকুমিরা উপকূলীয় অংশকে জলোচ্ছ্বাস ও সমুদ্রের ক্ষয় থেকে সুরক্ষার পাশাপাশি বাঁশবাড়িয়া ফেরিঘাটের স্থায়িত্ব বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে প্রণয়ন করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মূল কাজের একটি অংশ হবে বাঁশবাড়িয়া ফেরিঘাট এলাকার বিদ্যমান বাঁধকে শক্তিশালী করা। এ অংশের দৈর্ঘ্য ১ দশমিক ৩১৫ কিলোমিটার। একই সঙ্গে বাঁশবাড়িয়া ফেরিঘাট থেকে কুমিরা ঘাট পর্যন্ত উপকূল বরাবর ৫ দশমিক ৪৯০ কিলোমিটার সিডাইক নির্মাণ করা হবে। উপকূলীয় এলাকায় সমুদ্রের ঢেউয়ের সরাসরি আঘাত ঠেকানো এবং বাঁধের পাদদেশের মাটি ক্ষয় রোধে সিডাইকটি নির্মাণ করা হবে বলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এ ছাড়া প্রকল্পে আটটি স্লুইসগেট পুনর্নিমানের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশনে বিরাজমান সংকটের সুরাহা করা হবে। এসব স্লুইসগেটের মাধ্যমে ভারী বর্ষণ, জোয়ার ও জলাবদ্ধতার সময় অভ্যন্তরীণ পানি দ্রুত নিষ্কাশনের সুযোগ তৈরি হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।

সীতাকুণ্ডের এই উপকূলীয় অংশ দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষয় ও ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। ছোট কুমিরা থেকে বাঁশবাড়িয়া সৈকত ও আশপাশের এলাকায় বিদ্যমান বাঁধের বিভিন্ন অংশ জোয়ারের পানির চাপে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এতে এলাকাবাসী ঝুঁকির মধ্যে ছিল। সমুদ্রের ঢেউয়ের আঘাতে বাঁধের ব্লক সরে যাওয়া, ব্লকের নিচ থেকে মাটি সরে গর্ত তৈরি হওয়া এবং বাঁধসংলগ্ন মাটির সড়ক ভেঙে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ফলে বর্ষা মৌসুম কিংবা ঘূর্ণিঝড়ের সময় জোয়ারের পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। বড় ধরণের জলোচ্ছ্বাসে এলাকা অতীতে প্লাবিত এবং বিপুল প্রাণহানীর ঘটনাও ঘটেছে। এছাড়া বিস্তৃত এই এলাকায় প্রতিবছরই ফসলহানীর ঘটনা ঘটে। এলাকার হাজার হাজার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে নানাভাবে ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়ছিলেন। তারা দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। বাঁশবাড়িয়াকুমিরা অংশের গুরুত্ব শুধু জনবসতি ও কৃষিজমির কারণে নয়। এই উপকূলীয় এলাকায় রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পপ্রতিষ্ঠান, জাহাজভাঙা শিল্পাঞ্চল, সড়ক যোগাযোগ এবং ফেরিঘাট। বিশেষ করে বাঁশবাড়িয়া ফেরিঘাট দিয়ে সীতাকুণ্ডসন্দ্বীপ নৌযোগাযোগ চালু থাকায় ঘাটটির নিরাপত্তা ও স্থায়িত্বের সঙ্গে বৃহত্তর একটি অঞ্চলের যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের বিষয়টি জড়িত। ২০২৫ সালের মার্চে বাঁশবাড়িয়াসন্দ্বীপ নৌপথে ফেরি সার্ভিসও চালু করা হয়।

সূত্র জানিয়েছে, পাউবো সীতাকুণ্ড ও সন্দ্বীপের উপকূলীয় ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রায় ৭৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছিল। ওই প্রস্তাবে সীতাকুণ্ড অংশে কুমিরা ঘাট থেকে বাঁশবাড়িয়া ফেরিঘাট পর্যন্ত প্রায় ৫ দশমিক ৫ কিলোমিটার বাঁধের কাঠামোগত উন্নয়ন ও পুনর্বাসন, ফেরিঘাট সুরক্ষা এবং চারটি পুরোনো রেগুলেটর প্রতিস্থাপনের কথা বলা হয়েছিল। যাতে পাঁচ লক্ষাধিক মানুষের জীবন ও সম্পদকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দেওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করে ২০২৯ সালের মধ্যে প্রকল্পটির কাজ শেষ করার কথা ছিল।

সূত্র জানায়, পরবর্তী পর্যায়ের প্রকল্প প্রস্তাবে সীতাকুণ্ডের অংশটি আরও নির্দিষ্ট কাঠামোতে এসেছে। নতুন প্রস্তাবে ১ দশমিক ৩১৫ কিলোমিটার বাঁধ টেকসইকরণের পাশাপাশি ৫ দশমিক ৪৯০ কিলোমিটার সিডাইক এবং আটটি স্লুইসগেট পুননির্মাণ করা হবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০২৪ সালে ভারী বর্ষণের সময় বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের সিকদার খালের একটি স্লুইসগেট ভেঙে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছিল। তখন পাউবোর কর্মকর্তারা সীতাকুণ্ডে থাকা ১৮টি স্লুইসগেটের মধ্যে চারটিকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে জানিয়েছিলেন।

প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বাঁশবাড়িয়া থেকে কুমিরা পর্যন্ত উপকূলীয় এলাকার ঝুঁকি কমার পাশাপাশি বাঁশবাড়িয়া ফেরিঘাট ও সীতাকুণ্ডসন্দ্বীপ নৌযোগাযোগ আরও নিরাপদ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে উপকূলীয় কৃষিজমি, জনবসতি, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও সড়ক যোগাযোগকে জলোচ্ছ্বাস ও সমুদ্রভাঙনের হাত থেকেও বিস্তৃত এলাকা রক্ষা পাবে। গতকাল প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন লাভ করায় এটি বাস্তবায়নে আর বড় কোন সংকট নেই বলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান।

পূর্ববর্তী নিবন্ধরাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ আজ, শপথ কাল
পরবর্তী নিবন্ধনিষ্পত্তির চেয়ে নতুন মামলা বেশি