কিছু বিদায় কখনো বিদায় নয়, সেগুলো সারাজীবনের কান্না হয়ে থেকে যায়। কিছু মানুষ পৃথিবীতে আসে খুব অল্প সময়ের জন্য, অথচ চলে যাওয়ার পর বুঝিয়ে দিয়ে যায়, কতটা গভীরভাবে তারা আমাদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল। ছোট্ট ইশরাকের চলে যাওয়া তেমনই এক বেদনার গল্প।
২৭ অক্টোবর ২০২৫। হাটহাজারী উপজেলার ফরহাদাবাদ ইউনিয়নের মন্দাকিনী গ্রামের জাফর ও সাইবার ঘর আলো করে জন্ম নেয় মুহাম্মদ ইশরাক সাবের। ছোট্ট দুটি হাত, নিষ্পাপ মুখ আর মায়াভরা হাসিতে অল্প সময়েই সে আপন করে নিয়েছিল পরিবারের সবাইকে। কেউ তখন ভাবেনি, এই শিশুটির পৃথিবীর সফর এত অল্প সময়ের হবে।
ফটিকছড়িতে একটি রাইস কুকারের গরম পানিতে ভয়াবহভাবে দগ্ধ হয় মাত্র সাড়ে নয় মাস বয়সী ইশরাক। প্রথমে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার আশায় তাকে ঢাকার বার্ন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রায় এক সপ্তাহ মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করেছে ছোট্ট শিশুটি। পরিবারের সবাই প্রার্থনা করেছে। অপেক্ষা করেছে–ইশরাক সুস্থ হয়ে আবার মায়ের কোলে ফিরবে। আবার ঘর ভরে উঠবে তার হাসিতে। আবার তার ছোট্ট পায়ের শব্দে মুখর হবে বাড়ি। কিন্তু ১৮ আগস্ট ২০২৬ রাত ১০টায় ঢাকার বার্ন হাসপাতালের আইসিইউতে থেমে গেল ইশরাকের ছোট্ট হৃদস্পন্দন। পৃথিবীতে তার জীবন ছিল মাত্র ৯ মাস ২২ দিন। ২৭ অক্টোবর ২০২৫–পৃথিবীর আলো দেখেছিল মুহাম্মদ ইশরাক সাবের। ৯ মাস ২২ দিন–ক্যালেন্ডারের হিসাবে খুব সামান্য একটি সময়। কিন্তু এই অল্প সময়ের মধ্যেই ইশরাক হয়ে উঠেছিল একটি পরিবারের অসীম ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দু। শিশুরা আসলে ঘরে শুধু আসে না–তারা সঙ্গে করে নিয়ে আসে এক পৃথিবী আনন্দ।
ইশরাকও এসেছিল তেমনই। মায়ের কোলে ছিল তার পৃথিবী। বাবার বুকে ছিল নিরাপত্তা। দাদী–নানা নানীর আদরে ছিল তার ছোট্ট রাজত্ব। স্বজনদের কাছে ছিল সে আদরের, ভালোবাসার, মায়ার এক নাম। কে জানত, সেই পৃথিবীর সফর এত অল্প সময়ের হবে? জীবন কখনো কখনো এমন কিছু প্রশ্ন সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়, যার কোনো উত্তর মানুষের কাছে থাকে না। সেদিন একটি শিশুর মৃত্যু হয়নি শুধু–একটি পরিবারের স্বপ্নেরও মৃত্যু হয়েছে। একজন মায়ের বুক হঠাৎ করে শূন্য হয়ে গেছে। যে মা প্রতিদিন সন্তানের মুখ দেখে দিন শুরু করতেন, সন্তানের হাসিতে নিজের কষ্ট ভুলে যেতেন, আজ সেই মাকেই সন্তানের স্মৃতি বুকে নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে। একজন বাবার কাঁধে যে সন্তানের ভবিষ্যৎ বহন করার কথা ছিল, সেই বাবাকেই শেষ পর্যন্ত সন্তানের নিথর দেহ কাঁধে নিতে হয়েছে। নিয়তির এর চেয়ে নির্মম পরিহাস আর কী হতে পারে! যে কাঁধে একদিন ইশরাক বসে পৃথিবী দেখার কথা ছিল, সেই কাঁধেই তাকে শেষ বিদায়ের পথে যেতে হলো। এই দৃশ্য কোনো বাবার জীবনে না আসুক।
একটি শিশুর পৃথিবী তো এত ছোট হওয়ার কথা নয়। তার তো আরও অনেক কিছু দেখার ছিল। আরও অনেক হাসি ছিল। আরও অনেক দুষ্টুমি ছিল। আরও অনেক আদর পাওয়ার ছিল। কিন্তু সৃষ্টিকর্তার লিখন কে বদলাতে পারে? তবে এ মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে মন চায় না।
সময় একদিন হয়তো পরিবারের মানুষগুলোকে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে নেবে। তারা আবার কথা বলবে, হাসবে, কাজ করবে, মানুষের সঙ্গে মিশবে। কিন্তু শূন্যতাটা থেকে যাবে। কারণ কিছু শূন্যতা কখনো পূরণ হয় না। একজন মা হয়তো সারাজীবন সন্তানের জন্মদিনে থমকে যাবেন। ২৭ অক্টোবর এলেই তার বুকের ভেতর কেঁপে উঠবে কোনো এক পুরোনো স্মৃতি। মনে পড়বে–এই দিনেই তো আমার ইশরাক পৃথিবীতে এসেছিল। আর ১৮ আগস্ট এলে মনে পড়বে–এই দিনেই সে চলে গিয়েছিল।









