যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারি, সামরিক তৎপরতা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে সামপ্রতিক হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, মার্কিন জাহাজে হামলা হলে দেশটিকে ‘পৃথিবীর মানচিত্র থেকেই মুছে ফেলা হবে’।
গত সোমবার ফঙ নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ চলাকালে ইরান যদি কোনো মার্কিন জাহাজে হামলা চালায়, তাহলে তার পরিণতি হবে ভয়াবহ। একইসঙ্গে তিনি দাবি করেন, চলমান উত্তেজনার মধ্যেই ইরান এখন আলোচনায় ‘অনেক বেশি নমনীয়’ অবস্থানে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা ইরানের তুলনায় অনেক এগিয়ে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এর আগে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প জানান, হরমুজ প্রণালিতে অভিযান পরিচালনার সময় যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী ইরানের সাতটি ছোট নৌযানে হামলা চালিয়েছে। পাশাপাশি ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করার দাবিও করে ওয়াশিংটন। ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামে এই সামরিক উদ্যোগের ঘোষণা দিয়ে ট্রাম্প বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অনুরোধেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যাদের বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজ প্রণালিতে আটকে পড়েছিল। এই উদ্যোগের লক্ষ্য নিরাপদ নৌ–চলাচল নিশ্চিত করা। ট্রাম্প আরও দাবি করেন, ইরান এখন চুক্তি করতে চায়। তাদের সামরিক শক্তি ভেঙে পড়েছে বলেই তারা আলোচনায় আগ্রহী। তিনি বলেন, আমরা এখন তাদের সঙ্গে যা খুশি করতে পারি।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ একটি সাময়িক অভিযান, যার লক্ষ্য হরমুজ প্রণালিতে একটি নিরাপদ করিডোর তৈরি করা, যাতে বাণিজ্যিক জাহাজ নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে। আল–জাজিরা অ্যারাবিককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সেন্টকমের এক মুখপাত্র বলেন, এই উদ্যোগে জাহাজ মালিক ও বিমা কোম্পানিগুলো ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে।
অন্যদিকে, ইরান এই পদক্ষেপকে উসকানিমূলক হিসেবে দেখছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এঙে লিখেছেন, হরমুজ প্রণালির সামপ্রতিক ঘটনাগুলো প্রমাণ করে এই সংকটের কোনো সামরিক সমাধান নেই। তিনি জানান, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা এগিয়ে যাচ্ছে। আরাঘচি যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেন, কিছু শক্তি ওয়াশিংটনকে নতুন সংঘাতে জড়িয়ে ফেলতে চাইছে। তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতকেও একই ধরনের সতর্কতা দেন এবং ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’কে অচলাবস্থা প্রকল্প হিসেবে আখ্যা দেন।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার এবং আলোচনার প্রধান প্রতিনিধি মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ হরমুজ প্রণালিতে নৌ–পরিবহন ও জ্বালানি নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে অবরোধ আরোপ করছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহকে বিপন্ন করছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছেন, ওয়াশিংটন যুদ্ধ চায় না। পেন্টাগনে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, আপাতত যুদ্ধবিরতি বহাল আছে। তবে তিনি ইরানকে সতর্ক করে বলেন, বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা হলে কঠোর জবাব দেওয়া হবে। হেগসেথ আরও বলেন, ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ মূলত বাণিজ্যিক জাহাজকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য নেওয়া একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা। তবে একইসঙ্গে তিনি হুঁশিয়ারি দেন, হরমুজ প্রণালিতে কোনো হামলা হলে ইরানকে ভয়াবহ সামরিক প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়তে হবে।
এদিকে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের নির্ধারিত রুট ছাড়া অন্য পথে জাহাজ চলাচল না করার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। তাদের মতে, নির্ধারিত পথ এড়িয়ে চললে কঠোর জবাব দেওয়া হবে।
উত্তেজনার মধ্যেই সংযুক্ত আরব আমিরাতে সামপ্রতিক হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। আমিরাত দাবি করেছে, ইরান থেকে ছোড়া একাধিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে, তবে একটি ড্রোন ফুজাইরার একটি তেল স্থাপনায় আঘাত হানে। এতে কয়েকজন আহত হন। যদিও এই হামলার দায় এখনো স্বীকার করেনি তেহরান। এই ঘটনায় উপসাগরীয় দেশগুলোতে নতুন করে যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কাতার, সৌদি আরব, কুয়েতসহ বিভিন্ন দেশ এই হামলার নিন্দা জানিয়েছে এবং সংযমের আহ্বান জানিয়েছে।
এদিকে হরমুজ প্রণালিতে সামপ্রতিক সংঘর্ষ নিয়ে নতুন দাবি তুলেছে তেহরান। ইরানের দাবি, মার্কিন বাহিনী বেসামরিক নৌযানে হামলা চালিয়েছে, যাতে অন্তত পাঁচজন বেসামরিক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। তেহরান থেকে আল–জাজিরার প্রতিনিধি রেসুল সরদার আতাস এ তথ্য জানিয়েছেন। ইরানের ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র যেসব নৌযান লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে, সেগুলো আইআরজিসির নয়, বরং সাধারণ বেসামরিক মানুষের ব্যবহৃত নৌযান ছিল। তেহরান আরও দাবি করেছে, মার্কিন ডেস্ট্রয়ারগুলো রাডার বন্ধ রেখে হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশের চেষ্টা করেছিল। তবে ইরানি নৌবাহিনীর নজরদারির কারণে সেগুলো শনাক্ত করা সম্ভব হয়। এরপর সতর্কবার্তা হিসেবে ইরান কমব্যাট ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট ব্যবহার করে গোলাবর্ষণ করে, যার ফলে মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো এলাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়। পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে ইরানের অভ্যন্তরীণ একটি ঘটনা। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের দায়ের বন্দরের একটি জেটিতে থাকা কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজে অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়া গেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে জানানো হয়, আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে ফায়ার সার্ভিস। দায়ের বন্দর ফায়ার সার্ভিসের প্রধান মজিদ ওমরানি মেহর নিউজকে জানিয়েছেন, অগ্নিকাণ্ডের কারণ এখনো জানা যায়নি এবং ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনকারী পাকিস্তান উভয় পক্ষকে উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানিয়েছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ বলেছেন, যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে সামান্য ভুল পদক্ষেপও বড় ধরনের সংঘাতে রূপ নিতে পারে। যদিও উভয় পক্ষই সরাসরি যুদ্ধ এড়ানোর কথা বলছে, তবুও চলমান সামরিক তৎপরতা, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং আঞ্চলিক অস্থিরতা মধ্যপ্রাচ্যকে আবারও এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।












