আমাদের গ্যালাক্সি কত বড়

শঙ্কর প্রসাদ দে | বৃহস্পতিবার , ৭ মে, ২০২৬ at ৯:১০ পূর্বাহ্ণ

১৬১০ সাল ৭ জানুয়ারি। গ্যালিলিও ইটালির একদল জ্যোর্তিবিদকে ভেনিস শহরে জড়ো করলেন। গ্যালিলিও’র আবিষ্কৃত দুরবীণে চোখ রেখে সবাই হতবাক। বুঝা গেল রাতের আকাশে দৃশ্যমান তারাগুলো হয় উপগ্রহ অথবা গ্রহ অথবা তারা (নক্ষত্র) অথবা নীহারিকা বা নেবুলা। সবার সাথে গ্যালিলিও একমত হয়ে বললেন সবগ্রহ তারারা এক একটি পৃথক পরিবারের সবাই মিলে একটি বড় পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। রাতের ঝক ঝকে আকাশে দুধসাধা সর্পিল আকৃতির চতুর্দিকে সমস্ত গ্রহ তারা আবর্তিত হয় বিধায় এই গ্রহ তারা নীহারিকার বাসস্থানের নাম দেয়া হয়েছে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সী। গঙ্গানদী শত শত খাল নদ নদীকে আত্মস্থ করে ভারতবর্ষকে কোলে করে রেখেছে। মিল্কীওয়ে গ্যালাক্সীকে পরিষ্কারভাবে মহাকাশে স্রোতস্বিনী নদীর মতো দেখায় বলে বাংলায় নাম রাখা হল ‘আকাশগঙ্গা গ্যালাক্সি’। দুধ সাদা বলে ইংরেজি নাম ‘মিল্কীওয়ে গ্যালাক্সী’।

টেলিস্কোপ বীক্ষণে বিপ্লবের সূচনা করেছে আইনজীবী ও সৌখিন মহাকাশ বিজ্ঞানী এডুইন হাবল। তাঁর টেলিস্কোপ ছিল গ্যালিলিও’র টেলিস্কোপ থেকে অনেক উন্নত ও আধুনিক। ততোদিনে আইনস্টাইনের স্থির মহাবিশ্ব তত্ব, ল্যামেত্রের বিগব্যাং তত্ব পদার্থবিজ্ঞানে সাড়া ফেলে দিয়েছে। নাসা (NASA) এবং ইসা (ESA) যৌথভাবে পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে অর্থাৎ ভূপৃষ্ঠ থেকে ৩৪০ মাইল উপরে টেলিস্কোপটি স্থাপন এবং এর ফলে বিশাল মহাবিশ্বের অনেকটুকুই ক্যামেরার সামনে ভেসে উঠতে লাগল। টেলিস্কোপ থেকে পাঠানো ছবি ও সিগনাল ব্যাখা করে দেখা গেল গ্যালিলিও দেখেছিলেন আমাদের গ্যালাক্সী মিল্কিওয়ে অথচ হাবল টেলিস্কোপে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে মিল্কিওয়ের বাইরে আরো লক্ষ লক্ষ গ্যালাক্সী শুধু নিজ নিজ ব্ল্যাক হোলের চতুর্দিকে ঘুরছে আর একটি গ্যালাক্সি ক্রমশ প্রতিবেশীর নিকট থেকে দুরে সরে যাচ্ছে।

কোপার্নিকাস ভয়ে ভয়ে বলেছিলেন পৃথিবী নয়, বরং পৃথিবী, শুক্র, বুধ, মঙ্গল, বৃহষ্পতি সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। খুলে গেল আকাশ দেখার দৃষ্টিভঙ্গি। সূর্যের মতো বা সূর্যের চেয়ে বড় লক্ষ লক্ষ তারা (নক্ষত্র) জ্বলছে মহাশূন্যে। ধরে নেয়া যায় ‘মিল্কিওয়ে’ গ্যালাক্সিতে সূর্যের মতো তারার সংখ্যা লক্ষ লক্ষ এবং এদের প্রত্যেকেরই পরিবার রয়েছে। সৌর পরিবারের মতো ঘূর্ণায়মান সূর্যের সংখ্যা লক্ষ লক্ষ। প্রশ্ন আসল লক্ষ লক্ষ সৌর পরিবার মিল্কিওয়ের সদস্য হওয়ায় এরা কাকে কেন্দ্র করে ঘুরে? আরো সোজা কথায় মিল্কিওয়ের কেন্দ্র বিন্দুতে কি আছে বা কাকে কেন্দ্র করে মিল্কিওয়ে ঘুরছে? আকাশগঙ্গা বা মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সীর কেন্দ্রে অবস্থিত ব্লাকহোলের নাম ‘স্যাজিটেরিয়াস এ’ ১৭৮৩ সালে জন মিশেল ইঙ্গিত করেন যে মহাবিশ্বের কোথাও না কোথাও অন্ধকূপের মতো কোন জায়গা আছে সেখানে ধুমকেতু, উপগ্রহ, গ্রহ, তারা চিরতরে হারিয়ে যায়। ১৯১৬ সালে আইনস্টাইন জন মিশেলের তত্ত্বকে সমর্থন করেন। কার্ল শোয়াজচাইল্ড জন মিশেলের প্রস্তাবকে গাণিতিকভাবে প্রমাণ করলে জন হুইলার এই অদৃশ্য মহাজাগতিক রাক্ষসের নাম দিলেন ‘ব্ল্যাক হোল।’ এতোদিন বিজ্ঞানীরা মনে করেছিলেন ব্ল্যাকহোলে যা পতিত হবে তা আর কোন দিন ফেরৎ আসবে না। এমন কি আলো’ও ব্ল্যাক হোলে চিরকালের জন্য বিলীন হয়ে যায়। এবার সামনে আসলেন স্টিফেন হকিং। তিনি বললেন সবকিছু ঠিক আছে তবে ব্ল্যাক হোল যা গ্রাস করে তার কিয়ৎ পরিমাণ মহাকাশে নিক্ষেপ করে। এটিই বিখ্যাত ‘হকিং রেডিয়েশন’। সর্বশেষ ব্লাকহোল গাণিতিক মডেলের জন্য বৃটিশ বিজ্ঞানী রজার পেনরোজ ২০২০ সালে নোবেল পুরস্কার লাভ করেছেন।

বুঝলাম ‘স্যাজিটেরিয়াস এ’ ব্লাকহোলকে কেন্দ্র করে মিল্কিওয়ে ঘুরছে। প্রশ্ন আসে মিল্কিওয়েতে সূর্যের মতো কতো তারার পরিবার বা সৌর পরিবার রয়েছে? আনুমানিক ১০০ বিলিয়নের চেয়ে বেশী সূর্য বা সূর্য পরিবার রয়েছে। আমাদের সৌরমণ্ডল মিল্কিওয়ের কেন্দ্র থেকে কত দূরে? আনুমানিক ২৭ হাজার আলোকবর্ষ দূরে। এই কেন্দ্রকে প্রদক্ষিণ করতে সূর্যের কত সময় লাগে? আনুমানিক ২৫ কোটি বছর। মিল্কিওয়ের ব্যাস অর্থাৎ এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তের পুরুত্ব কত? আনুমানিক দেড় লাখ আলোকবর্ষ। এর পুরত্ব কত? আনুমানিক ১ হাজার আলোকবর্ষ। সর্বশেষ তথ্য হলো জিলাপীর মতো দৃশ্যমান চাকতির মিল্কিওয়ে আনুমানিক ৫ লক্ষ আলোকবর্ষ পর্যন্ত অদৃশ্য ডার্ক মেটারে ভরপুর। ডার্কমেটারের মহাকর্ষ, চৌম্বকক্ষেত্র ও এনার্জির ধরন নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখনো অন্ধকারে।

আমাদের প্রতিবেশী ৫৪টি গ্যালাক্সীর মধ্যে নিকটতম প্রতিবেশী হল ‘এন্ড্রোমেডা’। এটি মিল্কিওয়ের প্রায় দ্বিগুন তারা বা নক্ষত্র নিয়ে গঠিত। নিকটতম হওয়ায় মিল্কিওয়ে ও এন্ড্রোমিডা পরষ্পর ক্রমশ নিকটতর হচ্ছে। একসময় দু’টো একত্রিত হয়ে ‘মিল্কিমিডা’ নামে আত্মপ্রকাশ করবে। মহাবিশ্বে গ্যালাক্সীর সংখ্যা কত? আবার ফিরে আসে আইনজীবী এডুইন হাবলের কৃতিত্ব। তাঁর বিখ্যাত ‘রেডশীপ’ বা লোহিত স্বরণ তত্ত্ব অনুযায়ী বর্তমান জ্যোতির্বিদদের ধারণা গ্যালাক্সীর সংখ্যা ন্যূনতম ১০০ বিলিয়ন। আমাদের মতো সাধারণ মানুষ যখন ব্রহ্মাণ্ড নিয়ে কল্পনা করি তখন রসিকতার সুরে বলতে হয় মাথার তার ছিড়ে যাবার উপক্রম হয়।

লেখক: আইনজীবী, আপীল বিভাগ, প্রাবন্ধিক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধদেশের কথা ভাবো
পরবর্তী নিবন্ধভূত যখন কায়াহীন ছায়ায়