দৌড়তে দৌড়তে সভায়। তাতেও সভায় ৫ মিনিট দেরি। এজন্য পুরো জাতির কাছে ক্ষমা চাইলেন জাপানের প্রতিমন্ত্রী। সামপ্রতিক এই সংবাদে জানা যায়, জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে মাত্র পাঁচ মিনিট দেরিতে পৌঁছেছিলেন অর্থনৈতিক নিরাপত্তাবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী কিমি ওনোদা। একটি সড়ক দুর্ঘটনার কারণে তিনি নির্ধারিত সময়ের প্রায় ৫ মিনিট পরে সেখানে পৌঁছান। ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায়, অনোদা গাড়ি থেকে নেমে দ্রুত দৌড়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দিকে যাচ্ছেন। বারবার সময়ের দিকে তাকাচ্ছিলেন তিনি। বৈঠক শুরু হয়ে যাওয়ার পর তিনি সেখানে পৌঁছান। সাংবাদিকদের সামনে তিনি দেরি হওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চান। তিনি বলেন, অনাকাঙ্ক্িষত পরিস্থিতির কারণে দেরি হয়েছে, তবে এমন ঘটনা যাতে আর না ঘটে– সে বিষয়ে তিনি আরও সতর্ক থাকবেন।
আসলে এটাই জাপানে বহুল চর্চিত অভ্যাস। জাপানে দায়িত্ব পালনে সময়ানুবর্তিতাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাই মাত্র কয়েক মিনিট দেরি হলেও অনেক সময় সংশ্লিষ্টদের প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে দেখা যায়! আমরা আজ খতিয়ে দেখি কতোটা গুরুত্বপূর্ণ আসলে এই অভ্যাস তথা সময়জ্ঞান!
শুরুতেই দেখি– কিছু মানুষ কেন সব সময়ই দেরি করে?
মানুষের এই দেরি করার প্রবণতার পেছনে রয়েছে বিভিন্ন কারণ, যেমন ব্যক্তিত্ব, সময় ও স্থান সম্পর্কে ব্যক্তির নিজস্ব ধারণা কিংবা সময় ব্যবস্থাপনা। বিশেষজ্ঞরা মানুষের এই নেতিবাচক স্বভাবকে কীভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, চলুন সেটাই জেনে নেওয়া যাক লাইভসায়েন্স ডটকম সূত্রে।
গোলমেলে দেহঘড়ি
‘নেচার রিভিউজ নিউরোসায়েন্স’ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণাকর্মে দাবি করা হয়, হিপোক্যাম্পাস অঞ্চলে যে নিউরনগুলো থাকে, তা মূলত ‘টাইম সেল’ হিসেবে কাজ করে। এই সেল আমাদের পূর্ব অভিজ্ঞতা মনে রাখতে সাহায্য করে। মস্তিষ্কের এই বিশেষ প্রক্রিয়া কোনো কারণে সঠিকভাবে কাজ না করলে ব্যক্তির সময়জ্ঞানে অসংগতি দেখা দিতে পারে। মনোযোগের ঘাটতির কারণে রোগী কোনো কাজ করতে কতটুকু সময় লাগে, তার কোনো স্বচ্ছ ধারণা রাখতে পারে না। ফলে নিজের অজান্তেই দেরি হয়ে যায়।
স্থান, দূরত্ব নির্ণয়ে আপেক্ষিকতা
অচেনা জায়গায় নির্দিষ্ট স্থান খুঁজে বের করতে সময় লাগতে পারে, তাই নির্ধারিত সময়ের আগেই আপনি পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। তাই এ রকম পরিস্থিতিতে ব্যক্তির দেরি করার আশঙ্কা কম। কিন্তু চেনা জায়গায় পৌঁছাতেও আমরা অনেক সময় দেরি করে ফেলি। হুগো স্পিকারের গবেষণায় দেখা গেছে– স্পিয়ার্স লন্ডন শহরে নবাগত ২০ জনকে তাদের কলেজ এলাকার একটি ম্যাপ এঁকে সেখান থেকে বিভিন্ন স্থানে যাওয়ার সময় নির্ণয় করতে বলেছিলেন। দেখা যায়, তুলনামূলক পরিচিত স্থানে যাতায়াতের জন্য অংশগ্রহণকারীরা কম সময় নির্ধারণ করেছিলেন। এ ক্ষেত্রে দূরত্ব যা–ই হোক না কেন, স্থান যত অপরিচিত, ব্যক্তি সেখানে পৌঁছানোর জন্য তত বেশি সময় নির্ধারণ করে থাকেন। তাই অনেকে পরিচিত স্থানে যাতায়াতে সময় ব্যবস্থাপনা নিয়ে দায়সারা ভাব দেখান।
অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস
নিত্য যেসব কাজ করা লাগে, তা আমরা পূর্ব অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করেই করি, সময় অনুমানও সে অনুযায়ী করা হয়। কিন্তু যাঁরা নিত্যদিনের কাজেও দেরি করেন, তাঁরা মূলত অনুমানে ভুল করেন। নিজের অনুমানও যে ভুল হতে পারে, তা তাঁরা কখনো আমলে নেন না। ‘মেমোরি অ্যান্ড কগনিশন’ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণাকর্ম থেকে জানা যায়, আমরা অতীতে যে কাজগুলো করতে যতটা সময় নিয়েছিলাম, সে ধারণাই আমাদের পরবর্তী সময়ে কাজটি আবার করতে কত সময় লাগবে তা নির্ধারণ করে দেয়; কিন্তু আমাদের স্মৃতি ও উপলব্ধি সব সময় সঠিক না।
সময় বিভ্রান্তি
২০২২ সালে ‘ভার্চ্যুয়াল রিয়েলিটি’ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের সিমুলেটেড পাতালরেল ভ্রমণের দূরত্ব অনুমান করতে বলা হয়েছিল। তাঁরা দুই ধরনের ভ্রমণের ব্যবস্থা করেন। প্রথমটিতে যাত্রীর সংখ্যা ছিল কম, আর দ্বিতীয়টি ছিল জনাকীর্ণ। দেখা গেছে, যে ভ্রমণপথটি জনাকীর্ণ ছিল তার দূরত্ব কম জনবহুল রাইডটির চেয়ে ১০ ভাগ বেশি মনে হয়েছে গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের কাছে। অর্থাৎ অপ্রীতিকর ঘটনার সম্মুখীন হলে ব্যক্তির কাছে সময়কে মনে হয় ধীর, ফলে অনুমানে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়।
সব কাজের কাজী কিন্তুৃ
একই সময়ে বিভিন্ন কাজে যুক্ত থাকাকে মাল্টিটাস্কিং বলে। কর্মক্ষেত্রে আপনার এই গুণ আপনাকে অন্যদের থেকে এগিয়েও রাখবে। কিন্তু বিপত্তি বাধে যখন আপনি সব দিক সামলাতে গিয়ে কোনো একটি কাজের ডেডলাইন মিস করে ফেলেন। ‘অ্যাডভান্সেস ইন কগনিটিভ সাইকোলজি’ জার্নালে প্রকাশিত একটি সমীক্ষা বলছে, যে ব্যক্তিরা একসঙ্গে অনেক ক্রিয়াকলাপে যুক্ত থাকেন, তাঁদের ক্ষেত্রে অন্যান্য পরিকল্পিত কাজ মনে রাখা এবং সময়মতো সম্পন্ন করার সম্ভাবনা থাকে কম।
আজ না হলে কাল?
আজকের কাজ কালকের জন্য ফেলে রাখাকে ইংরেজিতে একটি সুন্দর শব্দের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়, ‘প্রোক্রাস্টিনেশন’! মানুষ এই স্বভাবের কারণে বেশির ভাগ সময় গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু অপছন্দনীয় কাজকে আগামীর জন্য ফেলে রাখে। বিপরীতে তুলনামূলক কম প্রয়োজনীয় ও পছন্দনীয় কাজ নিয়ে নিজেকে ব্যস্ত রাখে, ফলে দিন শেষে পড়তে হয় বিপদে।
প্রবাদে আছে, ‘সময় এবং নদীর স্রোত কারও জন্য অপেক্ষা করে না।’ সময় নদীর স্রোতের মতো প্রবহমান। একই জলপ্রবাহে যেমন দুবার ডুব দেওয়া যায় না, তেমনি একই সময়কে দুবার পাওয়া যায় না। পৃথিবীর কোনো শক্তিই সময়ের গতিশীলতাকে রোধ করতে পারে না। তারপরও সময়কে বেঁধে রাখার কিছু টিপস্ চেষ্টা করা যেতে পারে।
সময় মেনে গুছিয়ে কাজ করতে পারেন এমন কিছ ব্যক্তিকে নিয়ে জীবনযাপন–বিষয়ক ওয়েবসাইট ‘রেডবুক’ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। যেখানে সেসব মানুষের সময় ব্যবস্থাপনার কৌশলগুলো তুলে ধরা হয়:
পরনের পোশাক নির্ধারণ করে রাখা:
দিনের শুরুতে কর্মক্ষেত্রে রওনা দেওয়া আগে, কোথাও বেড়াতে কিংবা দাওয়াতে যাওয়ার আগে প্রতিদিনই কিছু সময় ব্যয় হয় পোশাক নির্বাচন করতে। তাই এটি আগেভাগে করে রাখা দরকার। শেষ মুহূর্তের জন্য এই কাজটি ফেলে রাখা উচিত না।
একাধিক কাজের তালিকা:
প্রতিদিন কাগজে কলমে একটি কাজের তালিকা সবসময় সঙ্গে রাখা যায়, ‘গুগল ক্যালেন্ডার’ এর মাধ্যমে বিভিন্ন দৈনিক ও মাসিক কাজের ব্যাপারে আগেভাগেই সতর্ক হওয়া যায়। বাসায় একটি ‘ক্যালেন্ডার’রাখা যায়, যাতে পরিবারের সবাই তাদের দৈনন্দিন কাজগুলো লিখে রাখে। এতে করে পরিবারের সবাই সবার কাজ সম্পর্কে অবগত থাকে।
প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ গোছানো:
লেখাপড়ার সরঞ্জাম, বাচ্চাদের খেলার সামগ্রী, অফিসের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, রান্না, কেনাকাটা ইত্যাদি সকল কাজের জন্য বিশেষভাবে প্রয়োজনীয় বস্তুর জন্য আলাদা জায়গা নির্ধারণ করে গুছিয়ে রাখা যায়।
মূল কাজের মাঝে অন্য কাজ:
এক কাজে বের হলে অন্য্য কাজও এসে পড়তে পারে। এই সম্ভাব্য বিষয়গুলোর জন্য কিছুটা সময় বরাদ্দ রাখা উচিত।
অনলাইনে যাওয়ার নির্দিষ্ট সময়:
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কত সময় নষ্ট হয় তার কোনো হিসাব নেই। অনলাইনে কতক্ষণ থাকবেন তার সময় বেঁধে নিন নিজের মতো করে।
গুরুত্বপূর্ণ তারিখ:
নির্ধারিত দিনে নির্ধারিত কাজগুলো করা প্রয়োজন। দিনগুলো মনে রাখার জন্য মোবাইল ফোনে ‘রিমাইন্ডার’ রাখতে পারেন। কিংবা দেয়ালে ঝোলানো ক্যালেন্ডারে লিখে রাখতে পারেন।
পরিবারের সদস্যদের কাজে লাগান:
পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের হাতে তুলে দিতে পারেন গৃহস্থালী কিছু টুকিটাকি কাজ।
সময়ের সদ্ব্যবহার করে সম্পদ অর্জন করা যায়। কিন্তু সম্পদ দিয়ে সময় কেনা যায় না। ফ্রাঙ্কলিন বলেছিলেন, “জীবনকে তুমি যদি ভালোবাস, তবে সময়ের অপচয় করো না। কারণ, সময় হচ্ছে জীবনের সমষ্টি মাত্র।” তাই সুনীলের মতো “আমার খানিকটা দেরি হয়ে যায়” হয়তো মানা যায়, কিন্তু আবুল হাসানের বয়ানের মতো যেন বলতে না হয় “আমার কেবলই শুধু রাত হয়ে যায়।”
লেখক: উপ–পরিচালক (জনসংযোগ), চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)













