আবরারের বয়স তখন মাত্র চৌদ্দ। নবম শ্রেণিতে পড়ে, কিন্তু ওর চিন্তাভাবনা অনেক গভীর। বাড়ি থেকে স্কুল, স্কুল থেকে কোচিং এই ছোট্ট বৃত্তেই আবদ্ধ ছিল ওর দিনগুলো। বাবা–মা দুজনেই শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত। সংসারে শৃঙ্খলা আছে, কিন্তু কোথাও যেন একটুখানি শূন্যতা যা আবরার মাঝে মাঝে অনুভব করত, যদিও মুখে বলত না।
সেদিন বিকেলে স্কুল থেকে ফিরতে একটু দেরি হয়েছিল। হালকা বৃষ্টি হচ্ছিল, রাস্তাটা কাদা আর জলে ভরা। হঠাৎ করেই রাস্তার পাশে একটা নড়াচড়া দেখতে পেল আবরার। কাছে গিয়ে ভালো করে তাকাতেই বুঝল একটা ছোট্ট বিড়ালছানা, ভিজে কাঁপছে, একা। শরীরের রঙ ধূসর–সাদা, চোখদুটো ভয়ের আতঙ্কে বড় হয়ে আছে।
আবরার থমকে দাঁড়াল। বুকের ভেতর কেমন যেন একটা কষ্টের ঢেউ উঠল। ও নিজের ছাতাটা একটু পাশে সরিয়ে বিড়ালছানাটার কাছে গেল। ওর গায়ে কাঁদা, ঠাণ্ডায় কাঁপছে। কেউ হয়তো ফেলে গেছে, অথবা মায়ের কাছ থেকে হারিয়ে গেছে।
‘এই, ভয় পাস না… আমি কিছু করব না,’
আবরার ধীরে ধীরে বলল, যেন একটা ছোট বন্ধুর সঙ্গে কথা বলছে।
বিড়ালটা প্রথমে পিছু হটল, তারপর আবরারের আঙুলে মুখ ঘষল। ঠিক যেন বুঝে ফেলেছে একজন বন্ধু পেলো।
আবরার নিজের রুমালে গা মুছে, শার্টের ভেতর ঢুকিয়ে নিল বিড়ালটাকে। ভিজে শরীরের উষ্ণতা ছেলেটির বুকে মিশে গেল। সেই মুহূর্তে যেন ওদের মধ্যে এক অদৃশ্য সম্পর্ক গড়ে উঠল।
বাড়িতে ঢুকতেই মা অবাক।
‘এটা কী এনেছো?’
‘মা, একটা বিড়ালছানা পেয়েছি। ভিজে কাঁপছিল।’
‘আরে, এইসব পশুপাখি ঘরে রাখলে ঝামেলা হবে!’
আবরার মাথা নিচু করে বলল,
‘মা, ও অসুস্থ… একটু যত্ন পেলে ঠিক হয়ে যাবে।’
মা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর নরম গলায় বললেন,
‘আচ্ছা, রাখো দেখি… তবে পরিষ্কার রাখবে যেন।’
ওই রাতে আবরার পুরনো একটা টিফিনবক্সে দুধ ঢেলে দিল বিড়ালের জন্য। বিড়ালটা চুপিচুপি এসে দুধ চেটে খেতে লাগল। আবরার ওর নাম দিল তুলতুল কারণ ওর চোখ দুটো ছিল ঠিক তুলোর মতো নরম আর চকচকে।
সেই থেকে শুরু। প্রতিদিন সকালে তুলতুল আবরারের বিছানায় উঠে যায়, মুখে ছোট্ট ‘ম্যাঁও’ দিয়ে ওকে জাগায়। স্কুল থেকে ফিরে আবরার প্রথমেই খোঁজ নেয় ওর খাবারের। মায়ের হাতের রান্না থেকে একটু ভাত–দুধ আলাদা করে রাখে। সন্ধ্যায় পড়তে বসলে তুলতুল এসে টেবিলের কোণে বসে থাকে। ওর মিউমিউ শব্দ যেন আবরারের মনোযোগে ছন্দ জোগায়।
সময় কেটে যাচ্ছিল। তুলতুল ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠল। তার লোম এখন চকচকে, চোখে আত্মবিশ্বাস। আবরার স্কুলে ভালো করছে, কিন্তু জীবনের সবচেয়ে আনন্দের সময়টা আসে সন্ধ্যায় যখন তুলতুল এসে তার কোলে ঘুমায়।
ওর নরম শরীরের স্পর্শ আবরারের মনে অদ্ভুত শান্তি এনে দেয়। বাবার ব্যস্ততা, মায়ের দুশ্চিন্তা, পড়াশোনার চাপ সব ভুলে যায় সে। মাঝে মাঝে ডায়েরিতে লিখে রাখে
‘তুলতুল আমার কথা বোঝে, কিন্তু মুখে কিছু বলে না।
তবুও ওর চোখের ভেতরে আমি নিজের প্রতিচ্ছবি দেখি
একটা জীবনের, যেখানে ভালোবাসাই ভাষা।’
একদিন স্কুল থেকে ফিরতে দেরি হয়েছিল আবরারের। দরজায় ঢুকেই মায়ের উদ্বিগ্ন মুখ দেখল।
‘তুলতুল বাইরে বেরিয়েছিল সকালে… এখনো ফেরেনি।’
আবরারের বুক ধক করে উঠল। সারারাত সে খুঁজল গলির ভেতর, পাশের মাঠে, দোকানের পাশে কোথাও নেই তুলতুল।
বৃষ্টি পড়ছিল টিপটিপ করে। কাদামাখা রাস্তায় ছেলেটা হাঁটতে হাঁটতে ডাকছিল,
‘তুলতুল… কোথায় তুমি?’
অবশেষে এক কোণে, ময়লার পাশে, কাঁপতে থাকা ধূসর শরীরটা দেখতে পেল। একটা সাইকেল বোধহয় ধাক্কা দিয়েছিল। তুলতুলের নিঃশ্বাস ক্ষীণ। আবরার ওকে কোলে তুলে ঘরে আনল, কাপড়ে মুছে, গরম দুধ দিল।
ওর চোখে জল এসে গেল। হাত বুলিয়ে বলল,
‘তুমি ঠিক হয়ে যাবে, তুলতুল। আমি আছি।’
মা এসে পাশে বসলেন, নরম গলায় বললেন,
‘তুই সত্যিই মন দিয়ে ওকে ভালোবাসিস, তাই না?’
আবরার শুধু মাথা নেড়ে বলল,
‘ও আমার পরিবারের অংশ, মা।’
তুলতুল ধীরে ধীরে সেরে উঠল। কিন্তু সেই দুর্ঘটনার পর আবরারের ভেতরে কিছু বদলে গেল। সে বুঝল প্রাণীদেরও জীবনের মূল্য আছে, তাদেরও নিরাপত্তা, যত্ন, আর ভালোবাসা দরকার।








