ইসলামী ব্যাংকে চেয়ারম্যান নিয়োগ ঘিরে যে আন্দোলন ও অস্থিরতা চলছে, সে বিষয়টি এড়িয়ে গেলেও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, এ খাতের অস্থিরতা কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে আমানতকারীদের আস্থা ফেরানোর অপেক্ষায় থাকতে হবে। এর জন্য ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট কমাতে রিক্যাপিটালাইজ বা নতুন করে মূলধন যোগাতে সরকার কাজ করছে বলে দাবি করেছেন তিনি। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর পল্টনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ)-এর কার্যালয়ে সংগঠনের বাজেট বিষয়ক সেমিনারে অর্থমন্ত্রীকে এ নিয়ে সাংবাদিকরা বারবার প্রশ্ন করেন। তবে এটি বাজেট সংশ্লিষ্ট নয় বলে তিনি এড়িয়ে যান। অর্থমন্ত্রী বলেন, আমরা রিক্যাপিটালাইজ করতে কাজ করছি। রিক্যাপিটালাইজ করতে হবে। অস্থিরতা তখন কমবে, যখন ব্যাংকগুলো ক্যাপিটালাইজড হবে, যখন ডিপজিটররা টাকা ফেরত দিতে পারবে, ডিপজিটররা কনফিডেন্স পাবে, আবার ডিপজিট করবে, ব্যাংকগুলো লেন্ডিং করতে পারবে যে সময়–এভাবে সাইকেল হতে থাকবে যে সময়ে। খবর বাসস ও বিডিনিউজের।
এদিকে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসেই এক–দেড় মাসের মধ্যে বাজেট করতে যাওয়ায় এটি কঠিন হচ্ছে বলে সেমিনারে তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, কঠিন বলতে আমি যেটা বুঝাচ্ছি, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরে এই এক–দেড় মাসের মধ্যে বাজেট করা অলমোস্ট অসম্ভব ব্যাপার একটা। যে বাজেটের প্রক্রিয়া সাধারণত ছয় মাস ধরে থাকে। কমপক্ষে ছয় মাস ধরে থাকে। এক–দেড় মাসের মধ্যে বাজেট করা খুবই কঠিন। তার উপরে যে অবস্থায় আমরা দায়িত্বটা পেয়েছি, বিগত দুটি সরকারের থেকে পাওয়া, এগুলোর সমাধান কঠিন। ভঙ্গুর অবস্থা, সবাই আপনারাও বলছেন। তার সাথে সাথে এটার স্থিতিশীলতা, তারপরে সমৃদ্ধির পথ, কঠিন অবস্থা। তারপরও জুন মাসে বাজেট তো দিতে হবে, বাজেট তো আর অপেক্ষা করবে না। সুতরাং আমাদের সেই কাজটা করতে হচ্ছে, খুব ধৈর্য সহকারে।
বড় অঙ্কের বাজেট ঘোষণা নিয়ে যে আলোচনা হচ্ছে তার স্বপক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী অর্থনীতি যে খাদে পড়ে গেছে তার থেকে উত্তরণে এর প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। বড় বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে সক্ষমতার যে ঘাটতি ও সমালোচনা রয়েছে তার জবাবে তিনি বলেন, চিন্তা করছি, ব্রেইন স্টর্মিং করছি। দিনের পর দিন ব্রেইন স্টর্মিং করছি। আমাদের নিজেদের মধ্যে নিজের সঙ্গে ডিবেট করেছি অনেক সময়। আমি ডিবেট করেছি, কিভাবে এখান থেকে বের হব।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আসন্ন বাজেটের মূল দর্শন হচ্ছে অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণ এবং দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূলধারায় নিয়ে আসা। তিনি বলেন, বাংলাদেশের বাজেটে সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হয়েছে নিম্ন আয়ের মানুষ। তাই আমরা বাজেটে প্রথমেই দরিদ্র, নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠী এবং গৃহিণীদের অগ্রাধিকার দিয়েছি।
অর্থ মন্ত্রী বলেন, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতায় সরাসরি উপকারভোগীদের অ্যাকাউন্টে অর্থ স্থানান্তর করা হবে এবং এ প্রক্রিয়ায় কোনো রাজনৈতিক প্রভাব বা মধ্যস্বত্বভোগীর সুযোগ থাকবে না। তিনি আরও বলেন, কৃষকদের জন্য ‘ফার্মার্স কার্ড’ চালুর মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের জীবনমান উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাত প্রসঙ্গে আমির খসরু বলেন, দেশের মানুষ স্বাস্থ্যসেবায় নিজের পকেট থেকে অতিরিক্ত ব্যয় করছে। এ কারণে সরকার ইউনিভার্সাল ও প্রাইমারি হেলথ কেয়ার সম্প্রসারণে গুরুত্ব দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি খাত ও এনজিওগুলোকেও সম্পৃক্ত করা হবে।
অর্থ মন্ত্রী বলেন, কামার, কুমার, তাঁতি, ক্ষুদ্র কারুশিল্পী, থিয়েটারকর্মী ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করতে ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। তাদের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন, ঋণ প্রদান, ডিজাইন সহায়তা, ব্র্যান্ডিং ও বাজারজাতকরণে সহযোগিতা দেওয়া হবে। তিনি বলেন, জিডিপি শুধু শিল্প–কারখানা থেকে আসে না। সংস্কৃতি, ক্রীড়া, কারুশিল্পসহ সৃজনশীল খাতও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে ‘ডেমোক্রেটাইজেশন অব ইকোনমি’ বা অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণ যাতে দেশের সব মানুষ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ পায় এবং উন্নয়নের সুফল ভোগ করতে পারে। ব্যবসা–বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, বিভিন্ন অনুমোদন নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে দিতে হবে। বিনিয়োগ ও ব্যবসার ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে একটি নিয়ন্ত্রণমুক্ত অর্থনীতি গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বাজেট বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন প্রকল্প পর্যবেক্ষণে ড্যাশবোর্ড ব্যবস্থা চালু করা হবে। এর মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব বা দায়ী ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
পুঁজিবাজার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এঙচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) পুনর্গঠন করা হচ্ছে এবং শিগগিরই পেশাদার ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে নতুন কমিশন গঠন করা হবে। এর ফলে দেশি–বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে এবং পুঁজিবাজারের মাধ্যমে কোম্পানিগুলো সহজে তহবিল সংগ্রহ করতে পারবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকারের বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে।
ইআরএফ সভাপতি দৌলত আকতার মালার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন, ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী এবং বাংলাদেশ টেঙটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)-এর সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ইআরএফ সাধারণ সম্পাদক আবুল কাসেম।











