“মেয়েরা একটু মানিয়ে নেয়”, “সবাইকে নিয়ে চলতে হয়”, “একটু কষ্ট করলে কী এমন হবে?”-এ ধরনের বাক্য আমাদের সমাজে এতটাই স্বাভাবিক যে অনেক সময় এগুলোকে প্রশ্ন করার প্রয়োজনই অনুভূত হয় না। ছোটবেলা থেকেই বহু মেয়ে শিখে বড় হয়, নিজের চেয়ে অন্যের প্রয়োজনকে আগে রাখতে হবে। পরিবার, আত্মীয়স্বজন, কর্মক্ষেত্র–সব জায়গায় সহযোগিতাপরায়ণ হওয়া যেন একজন ‘ভালো নারী’র অন্যতম পরিচয়। কিন্তু এই প্রত্যাশা যখন এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে একজন মানুষ নিজের ইচ্ছা, ক্লান্তি, বিশ্রাম বা সীমাবদ্ধতার কথা বলতেই অপরাধবোধে ভোগেন, তখন সেটি আর কেবল ভদ্রতা থাকে না; তা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও ঝুঁকির কারণ হয়ে ওঠে। মনোবিজ্ঞানে এ ধরনের প্রবণতাকে পিপল–প্লিজিং (People pleasing) বলা হয়। এটি কোনো মানসিক রোগ নয়, বরং এমন একটি আচরণগত প্রবণতা, যেখানে অন্যের স্বীকৃতি বা অসেন্তাষ এড়ানোর তাগিদে একজন মানুষ বারবার নিজের চাহিদাকে পিছিয়ে দেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে এই প্রবণতা চলতে থাকলে উদ্বেগ, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, আত্মসম্মানবোধের সংকট, এমনকি বার্নআউটের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
এই প্রবণতা নারীদের মধ্যে তুলনামূলক বেশি দেখা যাওয়ার পেছনে সামাজিকীকরণের বড় ভূমিকা রয়েছে। শৈশব থেকেই অনেক পরিবারে ছেলেদের স্বাধীন সিদ্ধান্তকে উৎসাহ দেওয়া হলেও মেয়েদের শেখানো হয় সম্পর্ক রক্ষা করতে, মানিয়ে নিতে এবং বিরোধ এড়িয়ে চলতে। ফলে বড় হওয়ার পরও অনেক নারী মনে করেন, ‘না’ বলা মানে অভদ্রতা, অকৃতজ্ঞতা কিংবা সম্পর্ক নষ্ট করা। অথচ সুস্থ সম্পর্কের অন্যতম শর্তই হলো নিজের সীমাবদ্ধতা সৎভাবে জানাতে পারা। কর্মজীবী নারীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও স্পষ্ট। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বারবার উঠে এসেছে, বেতনভুক্ত কাজের পাশাপাশি অবৈতনিক গৃহশ্রমের বড় অংশ এখনও নারীর কাঁধেই থাকে। অফিস শেষে রান্না, সন্তানের পড়াশোনা, বয়স্ক সদস্যের পরিচর্যা, বাজারের হিসাব, অতিথি আপ্যায়ন–এসব কাজের অনেকটাই অদৃশ্য শ্রম, যার কোনো আর্থিক মূল্যায়ন হয় না। অথচ এই কাজগুলোই পরিবারকে সচল রাখে। শুধু কাজের পরিমাণ নয়, আছে আরেকটি অদৃশ্য চাপ–যাকে অনেক গবেষক মেন্টাল লোড বা মানসিক দায়িত্বের বোঝা বলেন। কোন ওষুধ শেষ হয়ে এসেছে, সন্তানের স্কুলে কী জমা দিতে হবে, কার জন্মদিন সামনে, ঘরে কী কী বাজার লাগবে–এসব পরিকল্পনা ও মনে রাখার কাজও অধিকাংশ পরিবারে নারীর ওপরই বর্তায়। ফলে শারীরিক বিশ্রামের সুযোগ পেলেও মানসিক বিশ্রাম অনেক সময় আর আসে না। এই অবস্থায় অনেক নারী নিজের ক্লান্তির কথাও বলতে পারেন না। কারণ, তাঁরা আশঙ্কা করেন–তাঁকে হয়তো অযোগ্য, অলস বা সংসারবিমুখ ভাবা হবে। কর্মক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যায়। অতিরিক্ত কাজের অনুরোধ, ছুটির দিনেও অফিসের দায়িত্ব, সহকর্মীর অসমাপ্ত কাজ–সবকিছুতেই রাজি হয়ে যাওয়াকে অনেকেই পেশাদারিত্ব মনে করেন। কিন্তু বাস্তবে এতে কাজের মান যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, তেমনি ব্যক্তি নিজেও দীর্ঘমেয়াদে মানসিকভাবে অবসন্ন হয়ে পড়েন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপকে শারীরিক নানা সমস্যার সঙ্গেও যুক্ত করেছে। পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব, উদ্বেগ, অনিদ্রা, উচ্চ রক্তচাপ কিংবা অবসাদ–এসবের পেছনেও দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত চাপ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই নিজের সীমাবদ্ধতার কথা বলা কোনো দুর্বলতা নয়; বরং সুস্থ থাকার একটি প্রয়োজনীয় উপায়। এখানেই আসে সীমারেখা (Health Boundaries) তৈরির প্রশ্ন। সীমারেখা মানে সম্পর্ক ছিন্ন করা নয়, কাউকে অপমান করাও নয়। বরং কোথায় নিজের সময়, শক্তি ও মানসিক সুস্থতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, তা পরিষ্কারভাবে জানানো। “আজ অতিরিক্ত কাজ নেওয়া সম্ভব নয়”, “এ মুহূর্তে একটু বিশ্রাম দরকার”, কিংবা “এই সিদ্ধান্তটি আমি নিজেই নিতে চাই”–এ ধরনের বাক্য সম্পর্কের দূরত্ব তৈরি করে না; বরং পারস্পরিক সম্মান বাড়ায়।
অবশ্য ‘না’ বলতে শেখা সহজ নয়। যারা বছরের পর বছর সবাইকে খুশি রাখার চেষ্টা করেছেন, তাঁদের জন্য এটি একটি মানসিক অনুশীলনের বিষয়। পরিবর্তন শুরু হতে পারে ছোট ছোট পদক্ষেপ থেকে। প্রতিটি অনুরোধের সঙ্গে সঙ্গে উত্তর না দিয়ে একটু সময় নেওয়া, নিজের সামর্থ্য বিবেচনা করা, সব দায়িত্ব একা কাঁধে না তুলে ভাগ করে নেওয়া কিংবা প্রয়োজনে বিনয়ের সঙ্গে অসম্মতি জানানো–এসব অভ্যাস ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে সাহায্য করে। এই পরিবর্তনের দায় শুধু নারীর নয়, পরিবারেরও। একজন নারী যদি নিজের জন্য কিছু সময় চান, সেটিকে বিলাসিতা নয়, প্রয়োজন হিসেবে দেখা উচিত। সন্তান লালন–পালন, ঘরের কাজ বা পরিবারের দায়িত্ব কেবল একজনের নয়; এগুলো ভাগাভাগি করার সংস্কৃতি তৈরি না হলে মানসিক চাপও কমবে না। আমাদের সমাজে এখনও আত্মত্যাগী নারীকে সহজেই আদর্শ হিসেবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু একজন মানুষ যদি সব সময় অন্যের প্রত্যাশা পূরণ করতেই ব্যস্ত থাকেন, তাহলে একসময় নিজের স্বপ্ন, আগ্রহ এবং পরিচয়ই ঝাপসা হয়ে যেতে পারে। সুস্থ সম্পর্কের জন্য যেমন ভালোবাসা দরকার, তেমনি দরকার পারস্পরিক সম্মান, দায়িত্বের ন্যায্য বণ্টন এবং ব্যক্তিগত সীমারেখার স্বীকৃতি।
সব অনুরোধে সম্মতি দেওয়াই ভালো মানুষ হওয়ার প্রমাণ নয়। কখনো কখনো একটি বিনয়ী কিন্তু দৃঢ় ‘না’ নিজের মানসিক সুস্থতা, আত্মসম্মান এবং ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয়ে উঠতে পারে। অন্যের প্রত্যাশা পূরণ করতে গিয়ে নিজের জীবনকে হারিয়ে ফেললে শেষ পর্যন্ত ক্ষতি সবারই হয়। তাই নিজের কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব দেওয়া কোনো স্বার্থপরতা নয়; সেটিই সুস্থ, মর্যাদাপূর্ণ ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনের ভিত্তি।












