পাহাড়ের সরু খাঁজে জমে থাকা ঘুপচি গ্রাম আঁধারঘাট।
চারপাশের উঁচু পাহাড় আর ঘন কুয়াশায় বছরের বেশির ভাগ সময় গ্রামটিতে আবছা অন্ধকার ছড়িয়ে থাকত। গ্রামের মানুষের কাছে আলো বলতে ছিল বিশেষ একজাতীয় পাহাড়ি তেলের প্রদীপ। সেই তেল তৈরি করত এক বুড়ো কারিগর। দুর্গের চারপাশের পাহাড়ে ছিল তেলের একমাত্র উৎস, যার নাগাল সাধারণ মানুষের পক্ষে পাওয়া সম্ভব ছিল না।
দুর্গের গুদামে তেল আর সলতে মজুত করে রাখত কারিগর। প্রতিদিন মেপে মেপে প্রতিটি ঘরে সামান্য তেল পাঠানো হতো। তবে তার একটাই কড়া হুকুম, দিনের বেলাতেও কেউ ঘরের বাইরে প্রদীপ জ্বালাতে পারবে না।
কারিগর গ্রামের মোড়ে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করত, “পাহাড়ের ওপারে ঘন কুয়াশার আড়ালে ভয়ংকর এক দানব বাস করে। বাইরের আলো দেখলেই সে নিচে নেমে আসবে। তোরা যদি বাইরে প্রদীপ জ্বালাস, দানব এসে পুরো গ্রাম ছারখার করে দেবে। আমার দেওয়া তেল ঘরের ভেতরেই জ্বালাবি। বাইরে আলো জ্বালানোর দরকার নেই।”
ভয়ে মানুষ তার আদেশ মেনে চলত। ঘরের ভেতর নিভু নিভু প্রদীপের সামনে বসে তাদের দিন কাটত। পাহাড়ের ওপারে কী আছে, দিগন্ত কত দূর বিস্তৃত, তা জানার সুযোগ তাদের হতো না। তারা দানবকে কখনো দেখেনি, তবু তার ভয়ে বেঁচে থাকত।
দিনের পর দিন গ্রামের আলো নিয়ন্ত্রণ করতে করতে কারিগরের মধ্যে অদ্ভুত অহংকার জমল। দুর্গের প্রতিটি কক্ষে সে বড় বড় প্রদীপ আর মশাল জ্বালিয়ে রাখত। আলোয় ঝলমল করত তার আয়নামহল। চারপাশে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে তার মনে হতো, এই অন্ধকার রাজ্যে আলো মানেই ক্ষমতা, আর সেই ক্ষমতার একমাত্র মালিক সে।
এক রাতে প্রদীপের ঘন ধোঁয়ায় আয়নামহল ঝাপসা হয়ে এল। কারিগর চোখ কুঁচকে চারপাশে তাকাল। আয়নায় নিজের মুখটাও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল না।
সে ক্ষিপ্ত হয়ে চিৎকার করল, “আলো কমছে কেন? আরও আলো জ্বালাও!”
কেউ এগিয়ে আসার আগেই সে নিজেই বড় বড় জ্বলন্ত প্রদীপে অতিরিক্ত তেল ঢালতে শুরু করল। উপচে পড়া তেল গড়িয়ে পড়ল কাঠের পাটাতনে। তাড়াহুড়োয় তার হাত লেগে একটি জ্বলন্ত প্রদীপ উল্টে গেল।
আগুন ছড়িয়ে পড়ল মেঝেতে জমে থাকা তেলে। শুকনো কাঠের পাটাতন মুহূর্তেই জ্বলে উঠল।
আতঙ্কে কারিগর বেরোনোর পথ খুঁজতে গিয়ে একটার পর একটা ঝুলন্ত মশাল ফেলে দিল। আগুন ছড়িয়ে পড়ল পাশের কক্ষগুলোতে। ছাদের কাঠামো জ্বলে উঠল। চারদিকে ধোঁয়া আর আগুনের মধ্যে সে পথ হারিয়ে ফেলল।
যে আলো বাড়াতে গিয়ে সে নিজের দুর্গকে আগুনে ভরিয়ে তুলেছিল, সেই আগুনই এবার তার সামনে সব পথ বন্ধ করে দিল।
ভোর হওয়ার আগেই দুর্গের একাংশ ধসে পড়ল। কারিগর আর বেরিয়ে আসতে পারল না।
পরদিন সকালে ধোঁয়া পাতলা হলে গ্রামের মানুষ পাহাড়ের ওপর উঠে এল। এত দিন তারা দুর্গের উঁচু দেয়াল আর কুয়াশার আড়ালে আটকে থাকা দিগন্ত দেখেনি। ধসে পড়া প্রাচীরের ফাঁক দিয়ে এবার দূরের পাহাড় আর আকাশ চোখে পড়ল।
কোথাও কোনো দানব নেই।
কুয়াশার ওপারে ছড়িয়ে আছে ভোরের রোদ, নীল আকাশ আর দূরের পাথুরে টিলা।
মানুষগুলো চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
দলের মধ্য থেকে এক তরুণ ধীরে ধীরে ভাঙা পাথরের ওপর উঠে দাঁড়াল। তারপর হাত বাড়িয়ে দিল রোদের দিকে।
আলো এসে পড়ল তার আঙুলে।







