খরস্রোতা কর্ণফুলী নদী। যার তীর ঘেঁষে বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল। ঠিক তার কোল ঘেঁষেই কাপ্তাই সড়কের উত্তর পাশে সবুজে ঘেরা রাঙ্গুনিয়া উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্স। দিনভর কর্ণফুলীর চরে অবাধ বিচরণ শেষে দিনশেষে এই প্রাঙ্গণেই ফিরে আসে হাজার হাজার ডানা মেলে দেওয়া পাখি। যুগ যুগ ধরে গড়ে ওঠা এই সহাবস্থানে পুরো ক্যাম্পাস এখন যেন রূপ নিয়েছে এক জীবন্ত ও অনন্য পাখির রাজ্যে।
সমপ্রতি এক পূর্ণিমার জোছনা রাতে উপজেলা ক্যাম্পাসে গিয়ে দেখা মেলে এক মায়াবী দৃশ্যের। চাঁদের আলোয় সুউচ্চ গাছগুলোর প্রতিটি ডালপালায় বসে রয়েছে হাজার হাজার সাদা বক। বাদামগাছ, ইউক্যালিপটাস ও আশপাশের উঁচু গাছগুলোর শাখায় শাখায় জোছনার দ্যুতি আর সাদা বকের এই মেলা যে কারও চোখ জুড়িয়ে দেয়। শীতের আমেজে কর্ণফুলীর চর থেকে আসা এই বকগুলো রাতের নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বেছে নিয়েছে ক্যাম্পাসের নিঝুম গাছগুলোকে।
ক্যাম্পাসের ভেতর দিয়ে হেঁটে চলার সময় মানুষের গায়ে পাখির বিষ্টা পড়া কিংবা ছাদ ও গাছের পাকা ফল খেয়ে ফেলা–এখানকার দৈনন্দিন পরিচিত দৃশ্য। কিন্তু এত ঝক্কি সত্ত্বেও স্থানীয়রা বা কর্মকর্তা–কর্মচারীরা কেউই পাখিদের ওপর বিরক্ত হন না। বরং পুরো এলাকাজুড়ে সারাবছর ধরে চলা এই কলকাকলিকে তারা দেখেন প্রকৃতির অপার আশীর্বাদ হিসেবে।
ক্যাম্পাসে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি প্রকৃতির এমন নৈসর্গিক রূপ প্রত্যক্ষ করেন উপজেলা কর্মকর্তারাও। উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সুজাত কুমার চৌধুরী অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, সারাদিনের কাজের শেষে বিকেলে আমরা যখন নিজ গন্তব্যে ফিরি, তখনই দেখা যায় পাখিরা নীড়ে ফিরছে এই ক্যাম্পাসে। মনে হয় যেন আমাদের শূন্যস্থান তারাই পূরণ করে মুখর করে রাখছে পুরো চত্বর। শুধু রাতেই নয়, দিনেও কাজের ফাঁকে এই হাজারো পাখির কলকাকলি দারুণ এক প্রশান্তি এনে দেয়।
উপজেলা ক্যাম্পাসে অবস্থিত রাঙ্গুনিয়া প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক নুরুল আবছার চৌধুরী বলেন, যুগ যুগ ধরে এই ক্যাম্পাসে পাখিদের এমন অবাধ বিচরণ ও অভয়ারণ্য গড়ে ওঠা আমাদের রাঙ্গুনিয়াবাসীর জন্য এক অনন্য গৌরব ও প্রকৃতির সেরা উপহার। সন্ধ্যা নামতেই বাদাম ও অন্যান্য গাছের ডালপালায় জমে ওঠে শালিক, টিয়া, ঘুঘু ও কাকের সান্ধ্যকালীন আসর। পদুয়া থেকে উপজেলা ক্যাম্পাসে কাজে আসা দর্শনার্থী মো. রাসেল বলেন, নাগরিক যান্ত্রিকতার মাঝে এমন চোখজুড়ানো দৃশ্য নিমিষেই মন ভালো করে দেয়।
এলাকার স্থানীয় পরিবেশ তুলে ধরে মো. ইলিয়াস হোসেন বলেন, পাখিরা বাড়ির ছাদ ও গাছের ফল নষ্ট করলেও আমরা কেউ ওদের তাড়াই না। এরা আমাদের পরিবারের মতো নিরাপদে আছে। প্রতিদিন বিকেলে পাখির কিচিরমিচির উপভোগ করতে আসা স্থানীয় এক কলেজ শিক্ষার্থী জানান, মানুষের কোলাহলের মাঝে পাখিদের এমন স্বচ্ছন্দ বিচরণ দেখতে দারুণ লাগে। তবে সমপ্রতি কিছু গাছের ডালপালা কাটার ফলে পাখির এই চিরাচরিত নিরাপদ আশ্রয়ে কিছুটা বিঘ্ন ঘটেছে বলেও জানান অনেকে। বন বিভাগের রাঙ্গুনিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা মেহেরাজ হোসেন জানান, এলাকাটিকে নিরাপদ মনে করেই পাখিরা যুগে যুগে এখানে আশ্রয় বানিয়ে নিয়েছে।
রাঙ্গুনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহাদাৎ হোসেন আশ্বাস দিয়ে বলেন, উপজেলা ক্যাম্পাসের জলাশয় ও গাছে ফিরে আসা পাখিদের নিরাপদ বিচরণ নিশ্চিত করতে আমরা সতর্ক রয়েছি। তাদের স্বাভাবিক আশ্রয়ে যাতে কোনো বিঘ্ন না ঘটে, তা নিবিড়ভাবে তদারকি করা হচ্ছে।












