রাশিয়া থেকে এলএনজি-এলপিজি কিনতে অগ্রসর হচ্ছে সরকার

জ্বালানি নিরাপত্তা । বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা বড় চ্যালেঞ্জ

হাসান আকবর | শনিবার , ৭ নভেম্বর, ২০২৬ at ৫:২৩ পূর্বাহ্ণ

দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার রাশিয়া থেকে এলএনজি ও এলপিজি কেনার ব্যাপারে অগ্রসর হচ্ছে। তবে বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে। বিকল্প পেমেন্ট সিস্টেম গড়ে তোলা সম্ভব হলে রাশিয়ার সাথে বাংলাদেশের শুধু ব্যবসা সম্প্রসারণ নয়, দেশের কৃষি ও জ্বালানি খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

সূত্র জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার সাথে স্বাভাবিক ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেন কঠিন। এ সমস্যার কেন্দ্রে রয়েছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঋণ পরিশোধ। প্রায় ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলারের এ প্রকল্পে রাশিয়া ঋণ হিসেবে দিয়েছে ১১ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার। প্রকল্পের অর্থ পরিশোধে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে একাধিকবার জটিলতা তৈরি হয়েছে। ২০২৩ সালে চীনা মুদ্রা ইউয়ানে ঋণ পরিশোধের একটি ব্যবস্থা নিয়ে দুই দেশ সমঝোতায় পৌঁছালেও শেষ পর্যন্ত তা চালু করা সম্ভব হয়নি। নিষেধাজ্ঞাজনিত জটিলতায় রূপপুর প্রকল্পের ঋণের প্রায় ১০০ কোটি ডলারের অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংকের এসক্রো হিসাবে জমা রয়েছে, যা স্থানান্তর নিয়ে সমস্যা চলছে। রাশিয়া ভারতীয় মুদ্রায় বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছে।

এ অবস্থায় রাশিয়া থেকে এলএনজি এবং এলপিজি আমদানি করলে নতুন পেমেন্ট ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যা বাণিজ্য সম্প্রসারণের পাশাপাশি বিদ্যমান বড় প্রকল্পের আর্থিক দায় মেটানোর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক, পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ, আসবাবপত্র ও খাদ্যপণ্য। অন্যদিকে রাশিয়া থেকে বাংলাদেশ মূলত গম, সার, কৃষিপণ্য, শিল্পের যন্ত্রপাতি এবং পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম আমদানি করে। বিশেষ করে গম আমদানিতে রাশিয়া বাংলাদেশের অন্যতম বড় উৎস।

জ্বালানি খাতে রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতা দীর্ঘদিনের। ২০১২ সাল থেকে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গ্যাজপ্রম বাংলাদেশে গ্যাস অনুসন্ধান ও কূপ খননের কাজে যুক্ত রয়েছে। ভোলাসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রতিষ্ঠানটি অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। অন্যদিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত অংশীদারত্বের সবচেয়ে বড় প্রকল্প। ২০১৩ সালের ১৫ জানুয়ারি প্রকল্পটির কারিগরি ও আর্থিক সহযোগিতার জন্য দুই দেশের মধ্যে রাষ্ট্রীয় রপ্তানি ঋণ চুক্তি সই হয়। ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতার এ বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনার লক্ষ্য নিয়ে নির্মিত হচ্ছে।

গত বৃহস্পতিবার ঢাকায় অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ–রাশিয়া আন্তঃসরকার কমিশনের (আইজিসি) বাণিজ্য, অর্থনীতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতায় বিষয়ক পঞ্চম সভায় বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়। এতে বাংলাদেশ রাশিয়া থেকে এলপিজি এবং এলএনজি আমদানির আগ্রহ দেখালে রুশপক্ষ বিকল্প পেমেন্ট সিস্টেম চালু করার কথা বলে। এর আগেও তারা একই ধরনের প্রস্তাব দিয়েছিল।

এবারের আলোচনায় তেল–গ্যাস অনুসন্ধান, সার সরবরাহ এবং কৃষি গবেষণায় সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ও গুরুত্ব পেয়েছে উল্লেখ করে সূত্র বলেছে, বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য রাশিয়া থেকে গম ও পটাশ সার আমদানি করা হয়। দুই দেশের প্রতিনিধিরা সার সরবরাহ বাড়ানো, কৃষি গবেষণায় যৌথ উদ্যোগ এবং শিল্প উৎপাদনে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়েও আলোচনা করেন।

বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ে নতুন উদ্যোগ নেওয়ার ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে উল্লেখ করে সূত্র জানায়, রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন করপোরেশন ভিইবি.আরএফ এবং ইনভেস্ট বাংলাদেশের মধ্যে তথ্য বিনিময় ও বিনিয়োগ সহযোগিতার জন্য সমঝোতা স্মারক সইয়ের উদ্যোগ নেওয়ার ব্যাপারেও কথাবার্তা হয়েছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি খাতে রুশ বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। দুই দেশের ব্যবসায়ী সংগঠন ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যেও যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর বৈঠকে গুরুত্বারোপ করা হয়।

বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশন (এফবিসিসিআই) এবং রাশিয়া–বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিলের মধ্যে ব্যবসা–বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতার জন্য ইতোপূর্বে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ, বাণিজ্য মেলা, বিনিয়োগ সম্মেলন এবং যৌথ প্রকল্পের তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে বাণিজ্যিক সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতেও সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। রাশিয়ার উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য সুযোগ সম্প্রসারণ এবং গবেষণায় অভিজ্ঞতা বিনিময়ের বিষয়গুলোও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে বলে উল্লেখ করে সূত্র বলেছে, কোন প্রকল্প থেকে কী দামে গ্যাস পাওয়া যাবে, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির শর্ত কী হবে, জাহাজ ও বিমা সুবিধা কতটা নিশ্চিত করা সম্ভব এবং অর্থ পরিশোধ কোন ব্যবস্থায় হবে এসব বিষয় নিয়ে আরো আলোচনা হবে। বিশেষ করে নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যাংকের সঙ্গে লেনদেনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইন ও বাংলাদেশের আর্থিক খাতের স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করেই এ ব্যাপারে অগ্রসর হতে হবে বলে সূত্র মন্তব্য করে।

রাশিয়ার সঙ্গে এবারের আলোচনা বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, জ্বালানি সংগ্রহের উৎস বাড়ানো এবং দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্কের নতুন ক্ষেত্র তৈরির সুযোগ তৈরি হবে উল্লেখ করে সূত্র বলেছে, সাখালিন–২ ও পোর্টোভায়া থেকে এলএনজি আমদানির প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ হবে। এছাড়া বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থা কার্যকর করা গেলে গম, সার, জ্বালানি ও শিল্পপণ্যের বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং পুরনো দায় মেটানোর পথ সহজ হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধনির্বাচন উপযোগী ইউপির তালিকা যাচাইয়ে ইসির নির্দেশ