‘একটা চাবি মাইরা দিছে ছাইড়া, জনম ভইরা চলতে আছে’– জানতাম এখানকার এ খবর আগেই। তবে কোন কিছুতে ডিপ ডাইভ দেওয়া বলতে যা বোঝায়, দিতে পেরেছি তা আজই সকালে, অফিসে আসার পর। কুয়ালালামপুর থেকে ঢাকা হয়ে গতসন্ধ্যায় রিয়াদে পৌঁছুবার আগের আড়াইদিন ছিলাম দারাপুত্রপরিবার সান্নিধ্যে। ডিপডাইভের মধ্যে ক্ষণস্থায়ী ঐ মুহূর্তগুলো ক্ষণে ক্ষণে মনে উঁকি দিয়ে দিচ্ছে তাল কেটে। সিগারেটের মুখাগ্নি করতে করতে মনে হল এখন যেমন– আমাগো আব্দুর রহমান বয়াতির এই গানের মতোই অবস্থা, এই বৈশ্বিক কর্পোরেশনটির! অবশ্য, জ্ঞানী অর্থনীতিবিদ, সমাজতাত্ত্বিকদের মতে, আধুনিক পুঁজিবাদের এক অজর অমর সৃষ্টি হল কর্পোরেশন নামের দানব। একবার জন্মাবার পর, মৃত্যু নাই যার। সমাজ, রাজনীতি, রাষ্ট্র, অর্থনীতি টেকনলজি বদলের সাথে কর্পোরেশনগুলো ভোল পাল্টিয়ে পার করে দেয় অনায়সে শতাব্দীর পর শতাব্দী। আমার কোম্পানিটিরই তো বয়স ২৫০ বছর! তদুপরি বিশেষত উন্নত বিশ্বের কোম্পানিগুলো নানান প্রসেস, সিস্টেম, পলিসি দিয়ে এমনভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা থাকে যে, কর্মকর্তা কর্মচারীরা পরিণত হয় অবশেষে, খুচরা যন্ত্রাংশেই। জ্ঞানীদের এ কথা যে কতোটা ঠিক, দেখতে পাচ্ছি স্বচক্ষে! সৌদি এসাইনমেন্টের আমার দ্বিতীয় বছরটি শুরু হয়েছে আরো সপ্তাহ তিনেক আগে, ছিলান যখন ঢাকায়। তুমুল দৌড়ঝাঁপে ছিলাম ব্যস্ত তখন, সৌদি ভিসা নবায়নের সাথে মালয়েশিয়া আর ইংল্যান্ডের ভিসাভিযানে। সঙ্গী ছিল সাংসারিক ও সামাজিক কাজও। কিন্তু আমার এই দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে তেমন কোন সমস্যা হয়নি কোম্পানির। এমনকি গত একসপ্তাহ এখানকার গোটা সেলস মার্কেটিং টিমের সকলেই যে ছিল মালয়েশিয়ায় বাৎসরিক কনফারেন্সে, তারপরও কাটেনি তাল কোম্পানির গতিতে!
আজকালকার ডিজিটাল টেকনোলজির যুগে সব খবরই পৌঁছে যায় নিমিষে দিকে দিকে। অনুপস্থিতির কালে পাচ্ছিলাম তাই নিয়মিত, এখানকার আপডেট। জানি তাই গতবছরটা ভালোয় ভালোয় শেষ হবার পর এ বছরের শুরুতেই খেয়েছিলাম জোর ধাক্কা এক! ঘাবড়েই গিয়েছিলাম তাতে! তুমুল প্রতিযোগিতামূলক এইসব কোম্পানিতে, দিন শেষে কথা একটাই। বাংলায় তা হল– ‘বৃক্ষ তোমার নাম কী? ফলে পরিচয়!’ কেউ সারা বছর কি করলো না করলো, কতোটা মাথার ঘাম তার পায়ের কতোটা নীচে কি রকম গড়ালো, তা নিয়ে কদাচিৎই মাথা ঘামায় কোম্পানি, যদি না পাকা ফলটি তুলে দেয়া যায় তার হাতে। এমনকি যাবতীয় সতর্কতা সত্ত্বেও পাকার আগেই ঐ ফল যদি যায়, কাক বা বাদুরের পেট বা চোরের থলেতে, প্রায়শই হয় তাও, উপেক্ষিত।
ঘটনা ঘটেছিল প্রায় ঐরকমই। গত বছরের শেষের দিকে, আমাদের হেড কোয়ার্টারে সর্বজনকথিত এক মামুর বেটা বড়কর্তার, সৌদি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সাথে ফ্লু ভ্যাক্সিন নিয়ে করা বালখিল্যতার মাসুল হিসেবে বছরের শুরুতেই, আমাদের একটা জেতা টেন্ডার বাতিল হয়ে গিয়েছিল! তিন মিলিয়ন ডলারের ঐ সেলসটি হওয়ার কথা ছিল, জানুয়ারিতেই। দেশে বসে সে খবর পেয়ে পড়েছিল মাথায় বাজ। তড়িঘড়ি তাই করতে হয়েছিল গোটা কয়েক টেলিকনফারেন্সেও। মাঝে, লাকাংভির মিটিঙয়ে জেনেছিলাম, ঐ ধাক্কার অনেকটাই সামলানো গেছে। স্বস্তি পেয়েছিলাম তাতে।
গত সন্ধ্যায় রিয়াদে আসার পর, আজ অফিসে এসেই তা নিয়েই দিয়েছিলাম ডুব। দেখছি এখন তাতে ১০০ মিটার দৌড়ের স্প্রিন্ট্রারদের মতো, হুইসিল পড়ার সাথে সাথে একটু হোঁচট খেলেও, অবশেষে সে ক্ষতি উৎরে যাওয়া যাবে মনে হচ্ছে।
এ বিষয়ে কৃতিত্ব প্রথমেই দিতে হয়, হেড অব সেলস খলিলকে। বছরের শেষে টুক করে সে কিছু আধুলি তুলে লুকিয়ে রেখেছিল, আস্তিনে। হ্যাঁ বছরের শেষদিকে, আমার টিমের তালাত ও বাসেম আর তার টিমের দাম্মামের হানি বালাগ বেশ কিছু অতিরিক্ত অর্ডার এনেছিল। তার পুরোটাই ছেড়ে দেয়নি খলিল তখন।
বছর শেষ করার জন্য যতোটা লাগে ওটুকুই দিয়ে বাকীটা ধরে রেখেছিল। বড় কাজ দিয়েছে তা। এছাড়া আমার স্টার, আহমেদ নাশাত নভেম্বরে যে নতুন প্রডাক্ট লঞ্চ করেছিল, তাতে পেটাচ্ছে সে একের পর এক দমাদম ছক্কা! নাহ, এদের নিয়ে অচিরেই একটা লাঞ্চ পার্টি দিতে হবে।
ইস গরম লাগছে। কোটের নীচের অতিরিক্ত স্তর, সুয়েটারটা খুলে রাখি। মাফলারও দরকার নাই। ভোরে ঘুম থেকে উঠে, নীচে নেমেছিলাম গাড়িটা আরিফ মিয়া আমার অনুপস্থিততে ধুয়ে মুছে রেখেছিল কি না দেখার জন্য। পেয়েছিলাম টের তখনই মরুতে পঞ্চগড়িয় শীতের প্রকোপ। মনে পড়েছিল তাতে, নিজ পেশাগত জীবনের শুরুতে পাওয়া উত্তরবঙ্গীয় শীতের কামড়ের কথা। নিয়েছিলাম তাই বাড়তি সতর্কতা।
আচ্ছা! ট্যালেন্ট ম্যানেজার মাহা আল কাহতানির খবর কী? সে তো জানে আসবো আজ। লাকাংভিতে তো ঠিকই, হলভর্তি মানুষের সামনে মিলিয়েছিল হাত, অধমের সাথে। এরপর লাকাংভি ও কুয়ালালামপুরের আমার ফাঁকা সময়গুলো, সারাক্ষণ ভরিয়ে রাখার পর, এখন তো দেখছি নিজ দেশে ফিরে সে কোন খোঁজই নিচ্ছে না এই আজনবির। সাধে কি আর কবিগুরু বলেছিলেন– ‘রমণীর মন সহস্রবর্ষেরই, সখা সাধনার ধন’– নাহ, ওরকম কিছু বলা ঠিক হবে না। ক্ষণস্থায়ী আমাদের ঐ ঘোরাঘুরি ছিল পেশাদারিত্বেই মোড়া। মালয়েশিয়ায় পায়ের নীচে শক্ত মাটি পেয়ে, আবায়া কেটে বেরিয়ে পরী হয়ে সারাক্ষণ উড়াউড়ি ঘোরাঘুরি করলেও, যেই না পড়েছে পা ফের তার মরুবালিতে, ঢুকে গিয়েছে সে আবায়ার ভেতরে। শুধু তো তাই না, দুস্প্রাপ্য ধরনের মুক্তো হয়ে ঝিনুকের ভেতরে ঢুকে, ডুব দিয়েছে সে লোহিত সাগরের গহীনে!
কর্মক্ষেত্রে নারীর উপস্থিতি নিয়ে এখানে শরিয়াহ পুলিশের আছে কড়া বিধিনিষেধ। অন্যদিকে বস ফিল, কোম্পানির বৈশ্বিক ডাইভারসিটি বিষয়ক পলিসির করতে চান, স্থানিক প্রয়োগ। সে কারনেই মাসকয়েক আগে এই অফিসের ভেতরে তৈরি করা হয়েছে জেনানামহল। নিশ্চিত, অফিসে যদি এসেই থাকে মাহা, আছে সে ওখানেই।
আচ্ছা, দেবো নাকি গিয়ে টোকা ওখানে? নাহ, তা মোটেও ঠিক হবে না। কোন পুরুষকেই ওমুখো হতে দেখিনি। কালেভদ্রে অতীব প্রয়োজনে জেনানারই বের হন, ঐ সিন্দুক থেকে। এ অবস্থায় আমি কী করে দেই টোকা? তদুপরি কে জানে, এর মধ্যে মালয়েশিয়াকাহিনী এই মরুতে মেলেছে কি রকম ডালাপালা! আচ্ছা ফোন করবো নাকি? মালয়েশিয়ায় বেচারি আগ বাড়িয়ে আমার সাথে ঘোরাঘুরি করলো, এখন তাকে একটা ফোন করা সামান্য ভদ্রতাই তো।
নাহ তাও ঠিক হবে না। মোবাইলে তো করাই যাবে না। অফিসের পিএবিএক্সও নিরাপদ নয়। ঘরের শত্রু বিভীষণ, শুধুই লংকাতে থাকে, তা তো নয়। আবার এই মরুরই অন্যপ্রান্তেই জন্মেছিল জুডাস! ‘গুড আফটারনুন মিঃ সেলিম!’
ওহ বিজয়! ইয়েস, আই এম সাপোজড টু বি উইথ ইয়উ নাউ। বসো, বসো। কী খাবে? চা নাকি কফি?
ভারতের মধ্য প্রদেশের বিজয় কাপাই, যোগ দিয়েছে টিমে এই মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে আমার অনুপস্থিতিতে। রিক্রুটমেন্টের সবকিছুই ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ফাইনাল করে, যোগ দিতে বলেছিলাম তাকে। কিন্তু সে তার পূর্বতন কোম্পানিতে বছরটা শেষ করতে চাইছিল। না হলে ঐ কোম্পানি থেকে প্রাপ্য তার পারফর্মেন্স বোনাস যাবে কমে। দ্বিমত করিনি।
দুজনের জন্য মিন্ট টিয়ের অর্ডার করে, বলি– কত বছর যেন হল বিজয় তোমার এই মরুতে? উনিশ নাকি বিশ। ইন্টারভিউর সময় অবশ্য বলেছিলে। ‘একুশে পা দিলাম।’ পেশাগত জন্ম তোমার এই সৌদিতেই তাহলে?
‘বাহরাইনে। দেশে ফার্মেসি পড়া শেষ করেই, সে সময়কার ওয়েথ কোম্পানির মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ হয়ে যোগ দিয়েছিলাম মানামায়।’ আরবিতে নিশ্চয় হাফেজ তুমি। এদের রীতিনীতিও ভালই বোঝ। ভালই হল তোমার কাছ থেকে জানা যাবে। ‘স্পোকেন ফ্লুয়েন্ট। রিডিং ওকে। রাইটিং জিরো। হা হা হা।’ আচ্ছা, আমার অনুপস্থিতিতে যে জয়েন করলে তাতে কী কী সমস্যা হয়েছে শুনি? ‘না, না। মিঃ গিউসি, মেইড ইট ভেরি স্মুথ। এছাড়া সৈয়দ রাজভি ও আনন্দ বেশ সহযোগিতা করেছে। ওহ আমির শামিমও খুব হেল্পফুল। অবশ্য সবাই বেশ ওয়েলকামিংই ছিল।’ বাহ, এই মরুতে বারোজাতির এই কোম্পানিতেও ঠিকই বার্ডস অফ সেইম ফিদার ফ্লক্স টুগেদার। আমার টিমের ভারতীয় সৈয়দ রাজভি, আর ফিনান্সের আনন্দ যে বিজয়ের ব্যাপারে বড়ই আনন্দিত হয়েছিল, তা তো তারা সাথে সাথেই জানিয়েছিল। বিজয় এখন আলাদাভাবে পাকিস্তানি আমিরের নাম বলায় এই মরুতে দ্বিতীয়বারের মতো বুঝলাম, এখানে ভারত পাকিস্তান, একে অপরের গলা টিপে ধরতে উদ্ধত হওয়ার বদলে গলা জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করে! বেশ অভিজ্ঞ তুমি। অতো খুঁটিনাটি তে যাচ্ছি না তাই। নিজে নিজেই বুঝে যাবে সব। তুমি তো অবশ্যই জানো, সমুদ্রে ঝড় উঠলে তীরে ভেড়ানো জাহাজের বুদ্ধিমান নাবিক কী করেন?
‘পাল ঠিক করেন। জাহাজের মেরামতি করেন।’ এক্সাক্টলি। বাইরের ঝড় নিয়ে আর কথা না বলি। ওটাও সময়ে বুঝে যাবে। শুধু এটুকু জেনে রাখো, সৌদিতে আমরাই হতে যাচ্ছি প্রথম কোম্পানি, যেটি অচিরেই গ্লোবাল মালিকানায় চলে যাবে। পাশেই যে আমাদের ডিস্ট্রিবিউটরের অফিস, তারা কিন্তু এটি মোটেও ভাল চোখে দেখছে না। অর্থাৎ ঘরের মধ্যে থেকেই আসবে বাঁধা। এরই মধ্যে চালাতে হবে কাজ। স্বাধীনভাবে কোম্পানির কাজ চালাতে গেলে, গ্লোবাল বিজনেস প্রসেস এবং কমপ্লায়েন্স ফ্রেমওয়ার্কে নিয়ে যেতে হবে সব, আমাদের। সিএফও আমিন আর আমি গত কয়েকমাসে ওসব তৈরি করেছি। তোমাকে তো ঐসব ডকুমেন্টস পাঠিয়েছিলাম, পড়ে কি মনে হয়েছে? ‘কমপ্লায়েন্স ফ্রেমওয়ার্কটা আমার চেনা। একই ফ্রেমওয়ার্কে কাজ করেছি। ওটা কোন বিষয়ই না। তবে বিজনেস প্রসেসের অনেক কিছুই নতুন মনে হচ্ছে।’
ওটা নিয়ে ভেব না। আমার যা দরকার, তা হল ঐ কমপ্লায়েন্স ফ্রেমওয়ার্কে কাজ করতে যে এটিচ্যুড আর প্র্যাক্টিস দরকার, টিমে তা যাতে তৈরি হয়, তা নিয়ে তুমি মনোযোগ দিবে। এটা করতে হবে তোমার অপারেশনাল দায়িত্ব পালনের সাথে সাথে।
লেখক : প্রাবন্ধিক, ভ্রমণসাহিত্যিক।












