ইলিশের উৎপাদন কমায় নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন

জাটকা রক্ষায় ৮ মাসের জন্য নিষেধাজ্ঞা শুরু । ইলিশের জীবনচক্র নিরাপদ রাখা, জেলেদের সংরক্ষণ কার্যক্রমের স্টেকহোল্ডার করাসহ নিতে হবে বেশ কিছু উদ্যোগ

হাসান আকবর | রবিবার , ১ নভেম্বর, ২০২৬ at ৬:০৯ পূর্বাহ্ণ

দেশের নদ–নদী ও উপকূলীয় এলাকায় গত মধ্যরাত থেকে আগামী বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত ৮ মাসের জন্য জাটকা ধরায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। প্রতি বছর এই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জাতীয় মাছটির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে এই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। নিষেধাজ্ঞার ফলে ২৫ সেন্টিমিটারের ছোট ইলিশ আহরণ, পরিবহন, বাজারজাতকরণ, কেনাবেচা ও মজুত নিষিদ্ধ থাকবে। তবে বছরের পর বছর মা ইলিশ সংরক্ষণ, জাটকা নিধন বন্ধ এবং অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠাসহ নানা উদ্যোগ নেওয়ার পরও সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ায় এই নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শুধু নিষেধাজ্ঞা আর অভিযান চালিয়ে ইলিশের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব কি না, তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন মৎস্য গবেষক ও সংশ্লিষ্টরা।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় গতকাল জানিয়েছে, ৮ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এ সময় মা ইলিশের ডিম থেকে জন্ম নেওয়া পোনা আগামী কয়েক মাস দেশের উপকূলীয় নদ–নদী ও মোহনায় বিচরণ করবে। এসব পোনা নিরাপদে বেড়ে ওঠার সুযোগ পেলে ভবিষ্যতে ইলিশের উৎপাদন বাড়বে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।

ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য জারি করা ৮ মাসের নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করবে মৎস্য অধিদপ্তর। জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, নৌ পুলিশ, স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) এবং স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতায় দেশজুড়ে অভিযান পরিচালনার কথাও বলা হয়েছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে ইলিশের উৎপাদন ২০২২–২৩ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৫ লাখ ৭১ হাজার টনে পৌঁছেছিল। কিন্তু এরপর থেকে উৎপাদন নিম্নমুখী। ২০২৩–২৪ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন কমে দাঁড়ায় ৫ লাখ ২৯ হাজার টনে। পরের অর্থবছর ২০২৪–২৫ সালে তা আরও কমে প্রায় ৫ লাখ টনে নেমে আসে। ২০২৫–২০২৬ অর্থবছরের ইলিশ উৎপাদনের সরকারি হিসেব এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তবে মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা ইলিশের গত অর্থবছরের উৎপাদন কমে গেছে বলে স্বীকার করেছেন। এই কমার পরিমাণ উদ্বেগজনক বলে তারা মন্তব্য করেছেন।

একসময় ইলিশের উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে বাড়ছিল। ২০০৭–০৮ অর্থবছরে দেশে ইলিশ উৎপাদন ছিল প্রায় ২ লাখ ৯৫ হাজার টন। সংরক্ষণ কার্যক্রমের ফলে ২০২২–২৩ অর্থবছরে তা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে উৎপাদন কমতে শুরু করায় ইলিশের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে নির্বিচারে জাটকা নিধন, প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ ধরা, নিষিদ্ধ ও ক্ষতিকর জাল ব্যবহার, নদীর নাব্যতা হ্রাস, দূষণ, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং সমুদ্রে অতিরিক্ত মাছ আহরণ। বিশেষজ্ঞরা বলেন, শুধু জাটকা নিধন নয়, ছোট ফাঁসের জাল এবং অতিরিক্ত মাছ আহরণ ইলিশের স্বাভাবিক জীবনচক্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তারা মা ইলিশ ও জাটকা রক্ষায় বিদ্যমান কর্মসূচিগুলো আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করে বলেন, ইলিশের পাঁচটি অভয়াশ্রমের সীমানা ও ব্যবস্থাপনা নতুন করে পর্যালোচনার সময় এসেছে।

ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০০৩–০৪ অর্থবছর থেকে জাটকা সংরক্ষণ কর্মসূচি চালু হয়। পরে ২০০৮ সালে মা ইলিশ রক্ষায় ১১ দিনের নিষেধাজ্ঞা চালু করা হয়। গবেষণায় অমাবস্যার সময়ও ইলিশের প্রজননের বিষয়টি উঠে আসায় ২০১১ সাল থেকে নিষেধাজ্ঞার সময় বাড়িয়ে ২২ দিন করা হয়।

এসব উদ্যোগের সুফলও পাওয়া গেছে। ২০০৮–০৯ মৌসুমে মা ইলিশের ডিম ছাড়ার সাফল্যের হার ছিল ১৭ দশমিক ৬২ শতাংশ। ২০১৭–১৮ মৌসুমে তা বেড়ে ৪৭ দশমিক ৭৪ শতাংশে পৌঁছায়। ২০২৩ সালে এই হার ৫২ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল। সংরক্ষণ কর্মসূচি ইলিশের প্রজননে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, শুধু প্রজনন নিশ্চিত করলেই ইলিশের উৎপাদন বাড়বে না। ডিম থেকে জন্ম নেওয়া পোনা থেকে পূর্ণ বয়স্ক ইলিশে পরিণত হওয়া পর্যন্ত পুরো জীবনচক্র নিরাপদ রাখতে হবে।

এবারের ২২ দিনের মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযানে আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে বড় অভিযান পরিচালিত হয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, অভিযান চলাকালে ৫১ হাজার ৮৯৪ কেজি অবৈধভাবে আহরিত ইলিশ এবং প্রায় ৫ কোটি ৮০ লাখ ৪৩ হাজার ৯০০ মিটার নিষিদ্ধ জাল জব্দ করা হয়েছে। ১ হাজার ৩৩১টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা এবং ১ হাজার ৩৩৭ জন জেলেকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

এত বিপুল পরিমাণ মাছ ও নিষিদ্ধ জাল জব্দের ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও অবৈধভাবে মাছ আহরণ বন্ধ করা কতটা কঠিন ছিল। মাত্র ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার এই অবস্থা হলে আট মাসের নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব হবে? ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞায় সাগরে যাওয়া নিষেধ ছিল, ৮ মাসের নিষেধাজ্ঞায় শুধু জাটকা নিধন বন্ধ করা হবে। এতে কোন ট্রলার বা কোন নৌযান কোন ধরনের জাল দিয়ে জাটকা নিধন করছে নাকি বড় মাছ ধরছে তা নজরদারি করা আসলেই কঠিন হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, জেলেদেরকে শুধু নিষেধাজ্ঞার আওতায় না এনে তাদেরকে সংরক্ষণ কার্যক্রমের স্টেকহোল্ডার করা গেলে সুফল বেশি মিলবে। জেলেরা যাতে নিজেরাই অভয়াশ্রম ও প্রজননক্ষেত্র রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারেন, সে ধরনের স্থানীয় ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার উপর তারা গুরুত্বারোপ করেছেন।

ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও পরিবেশ রক্ষা জরুরি বলে মন্তব্য করে একাধিক বিশেষজ্ঞ বলেছেন, পদ্মা, মেঘনা, তেঁতুলিয়াসহ ইলিশের বিচরণক্ষেত্রগুলোর নাব্যতা কমে গেলে সাগর থেকে নদীতে ইলিশের চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে নদীদূষণ এবং খাদ্যশৃঙ্খলের পরিবর্তন ইলিশের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও প্রজননে প্রভাব ফেলে।

বাংলাদেশ ফিশারিজ রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষণার বরাত দিয়ে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, মেঘনা নদীতে ইলিশের খাদ্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাঙ্কটনের পরিমাণ ৬৮ শতাংশ কমেছে। নদীর দূষণ এর অন্যতম কারণ। খাদ্যের এই সংকট ইলিশের বৃদ্ধি ও আকারের ওপর প্রভাব ফেলছে।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, নদী খনন ও নাব্যতা পুনরুদ্ধার, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, নিষিদ্ধ জাল বন্ধ, সমুদ্রে অবৈধ ট্রলিং প্রতিরোধ এবং ইলিশের চলাচলের পথ সংরক্ষণে সমন্বিত উদ্যোগ নিলে হারানো ইলিশকে এখনো ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধহাত হারিয়েও হারেনি রাব্বি, পা দিয়ে লিখে জিপিএ-৫
পরবর্তী নিবন্ধযদি ছেলেপুলে পাঠাতে হয় ৫০ লাখ ১ কোটি হয়ে যাবে