গ্রামাঞ্চলে প্রয়োজন উন্নত চিকিৎসাসেবা

অসংক্রামক রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি

| শনিবার , ৩১ অক্টোবর, ২০২৬ at ১০:৪৩ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে অসামান্য অবদান রাখা সুগঠিত গ্রামীণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থা আজ নানা সমস্যায় জর্জরিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রয়োজনীয়সংখ্যক ডাক্তার, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্টসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর সংকট, অবকাঠামোগুলোর জরাজীর্ণতা, পর্যাপ্ত ওষুধের ঘাটতি, ডাক্তারের অনুপস্থিতি, ইনপুট মিক্স ও স্কিল মিক্স সমস্যা, ডায়াগনস্টিক সুবিধার অপর্যাপ্ততা, দক্ষ জনবলের ঘাটতি, প্রশিক্ষণের ঘাটতি, মেডিকেল যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামাদির অকার্যকারিতা ও ঘাটতি, মান নিয়ন্ত্রণহীন বেসরকারি খাতের উত্থান ইত্যাদি সমস্যার কারণে এখনো বেশ বড় একটি গ্রামীণ জনগোষ্ঠী গুণগত স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে উপজেলা হাসপাতাল সমপ্রসারণ ও গ্রামীণ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নে প্রায় ৫৭ হাজার কোটি টাকার দুটি প্রকল্পের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সমপ্রসারণে ৪৪ হাজার ৭৫৭ কোটি টাকা এবং গ্রামীণ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে ১১ হাজার ৯৯৩ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়, দুই প্রকল্পে মোট ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে ৫৬ হাজার ৭৫০ কোটি ২৬ লাখ টাকা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি আইসিইউ, হৃদরোগের চিকিৎসা, কিডনি ডায়ালিসিসসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত সেবা চালু এবং গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামো সমপ্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে। তবে বিদ্যমান সরকারি স্বাস্থ্য খাতেই চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর ২৩ হাজারের বেশি পদ শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে শুধু চিকিৎসকের পদই খালি ৯ হাজারের বেশি। এমন পরিস্থিতিতে নতুন অবকাঠামো পরিচালনা, বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা চালু এবং প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, গত মঙ্গলবার পরিকল্পনা কমিশনের আর্থ–সামাজিক অবকাঠামো বিভাগের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় দুটি প্রকল্পের প্রস্তাব মূল্যায়নের কথা ছিল। একটি প্রকল্প উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর অবকাঠামো নির্মাণ, পুনর্নির্মাণ, উন্নীতকরণ, সংস্কার ও মেরামত নিয়ে। অন্যটি সমন্বিত গ্রামীণ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নেটওয়ার্কের আওতায় বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র নির্মাণ ও সংস্কারসংক্রান্ত।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, শহর বা গ্রামের কোনো অংশের মানুষকে সেবার বাইরে রেখে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা সম্ভব নয়। অথচ নগর এলাকাতেও বহু মানুষ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার বাইরে বসবাস করছেন। তা ছাড়া মোটাদাগে গ্রাম ও শহরের স্বাস্থ্যসেবার মধ্যে বিভাজন রয়ে গেছে। বাংলাদেশে ৬৭ শতাংশ মৃত্যু অসংক্রামক রোগে হচ্ছে উল্লেখ করে তাঁরা বলেন, অসংক্রামক রোগ বিষয়ে সরকারের বরাদ্দ স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দের মাত্র ৪.২ শতাংশ। দেশের বহু মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য খারাপ অবস্থায় থাকলেও এ বিষয়ে বরাদ্দ স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দের এক শতাংশের কম। অন্যদিকে অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের কারণে এর কার্যকারিতা হ্রাস পেয়েছে। ২০১৯ সালে শুধু এ কারণেই দেশে ২৬ হাজার ২০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বাংলাদেশে জিডিপির ০.৭ শতাংশ বরাদ্দ হয় স্বাস্থ্য খাতে। এই বরাদ্দ দক্ষিণ এশিয়ার সব কটি দেশের তুলনায় কম। তাঁরা ছয়টি বিষয়ের উপর গুরুত্বারোপ করেন। এগুলো হচ্ছে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পদ্ধতি, অসংক্রামক রোগ ও মানসিক স্বাস্থ্য, অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা হ্রাস, স্বাস্থ্য খাতে অর্থায়ন, ডিজিটালাইজেশন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব।

এ সময় স্বাস্থ্য খাতে দুই ধরনের ব্যর্থতা দেখা গেছে বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলেন, স্বাস্থ্য খাতে দুই ধরনের ব্যর্থতা দেখা গেছে। তা হচ্ছে নিয়ন্ত্রণজনিত ব্যর্থতা এবং ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত ব্যর্থতা। অনিয়ন্ত্রিত বেসরকারি খাত, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে দুটি বিভাগ, মহাপরিচালকদের কাজে সমন্বয়হীনতা, জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান গড়ে না ওঠা, গবেষণার ফলাফল কাজে না লাগা, লাগামহীন ওষুধ কোম্পানি–এগুলো নিয়ন্ত্রণজনিত ব্যর্থতার উদাহরণ। মোটাদাগে গ্রাম ও শহরে স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে বিভাজন দেখা যায়। গ্রামাঞ্চলের প্রতিষ্ঠানে চাপ বেশি, কাজের দ্বৈততা আছে। কমিউনিটি ক্লিনিকে যারা সেবা দিচ্ছেন, তাদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নেই। অনেক স্থানে ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো প্রায় অকেজো অবস্থায়, অনেক স্থানে পদ খালি। তাঁরা বলেন, অসংক্রামক রোগের প্রকোপ বাড়ায় গ্রামাঞ্চলে উন্নত চিকিৎসাসেবার প্রয়োজন রয়েছে। তবে প্রয়োজনীয় জনবল তৈরি না করে নতুন ভবন ও যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হলে সেগুলো অব্যবহৃত পড়ে থাকার আশঙ্কা থাকবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধশচীনদেব বর্মণ: কিংবদন্তী কণ্ঠশিল্পী