দেহাতীত প্রেমে ভাস্বর ময়ুখ চৌধুরীর কবিতা

অমিত মামুন | শুক্রবার , ৩০ অক্টোবর, ২০২৬ at ৮:৩৭ পূর্বাহ্ণ

ময়ুখ চৌধুরী মেধাবী রোমান্টিক কবি। তাঁর কাব্যের প্রধান বিষয়বস্তু প্রেম। তাঁর অন্যান্য কবিতার মতো প্রেম বিষয়ক কবিতাগুলোকেও অনেকেই দুর্বোধ্য মনে করেন। এই প্রসঙ্গে তাঁর একটি মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য–

“কবিতা বোঝার বিষয় নয়। কবিতা হচ্ছে অনুধাবন করার বিষয়। মনে করো, কোনো এক দুপুরে সূর্য ঠিক তোমার মাথার উপরে অবস্থান করছে। চারদিকে কোনো গাছপালা নেই, কোনো ছায়া নেই। তুমি হাঁটছো কোনো এক বিজন প্রান্তরে। ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত। এমন সময় কচুরিপানায় আবৃত একটি পুকুর খুঁজে পেলে। পুকুরের উপরের আগাছা দেখে তুমি ফিরে আসতে পারো, কিন্তু কচুরিপানা সরালে দেখবে নিচে টলটলে শীতল জল। সে জল মুখে ছিটালে তুমি লাভ করবে গভীর প্রশান্তি। এমনও হতে পারে, তোমার হাত ছুঁয়ে চলে যেতে পারে বিশাল মাছের শরীর। তুমি শিহরিত হবে। কবিতা মানেও ঠিক তাই।”

তিনি আরও বলেন, কবিতা হচ্ছে শব্দের খেলা। কবিরা নিজ খেয়ালে এই খেলা খেলে থাকেন। সচেতন পাঠক না হলে সেই খেলা অনুধাবন করা কঠিন।

ময়ুখ চৌধুরীর কাব্যগ্রন্থের প্রথম সংকলনটি ‘ডান হাতের পাঁচটি আঙুল’ নামে প্রকাশিত হয় ২০১৬ সালে। এতে ১৯৮৯ সাল থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত পাঁচটি কাব্যগ্রন্থ স্থান লাভ করেছে। পাঁচটি কাব্যগ্রন্থ হলো: কালো বরফের প্রতিবেশী, ‘অর্ধেক রয়েছি জলে, অর্ধেক জালে’, তোমার জানলায় আমি জেগে আছি চন্দ্রমল্লিকা, প্যারিসের নীলরুটি ও আমার আসতে একটু দেরি হতে পারে। দ্বিতীয় সংকলনটি প্রকাশিত হয় ‘পঞ্চবটী বনে’ নামে ২০২২ সালে। এ সংকলনেও স্থান পায় পাঁচটি কাব্যগ্রন্থ। যেমন: পলাতক পেণ্ডুলাম, ক্যাঙ্গারুর বুকপকেট, পিরামিড সংসার, জারুলতলার কাব্য ও চরণেরা হেঁটে যাচ্ছে মুণ্ডুহীন।

ময়ুখ চৌধুরীর কাব্যে প্রেম চেতনা দেহজ প্রেম থেকে দেহাতীত প্রেমে রূপ লাভ করেছে। তিনি কামকে অস্বীকার করেননি। তাঁর প্রথম দিকের কবিতায় শরীরী অনুষঙ্গের উপস্থিতি স্পষ্ট হলেও ধীরে ধীরে রক্তমাংসের শরীর হয়ে উঠেছে একটি বিমূর্ত ধারণা। প্রেম হয়ে উঠেছে সাধনার অপর নাম।

১৯৮৯ সালে কবি ময়ুখ চৌধুরীর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘কালো বরফের প্রতিবেশী’ প্রকাশিত হয়। কাব্যগ্রন্থটি তিনভাগে বিভক্ত। যথা: অভিমানী মেঘের রুমাল, প্লাবনের পটভূমি ও অনিদ্র জলাশয়। ‘অভিমানী মেঘের রুমাল’ অংশটি প্রেম ও বিরহের রসে ভরপুর। এ অংশের প্রথম কবিতা ‘ভালোবাসার প্রথম অধিবেশন’ কবিতায় কবি ভালবাসার কথা অকপটে স্বীকার করেছেন। কিন্তু হৃদয়ের জমানো চাপা দুঃখকে তিনি স্বীকৃতি দিতে চাননি। প্রেম ভেঙে গেলেও তার রেশ থেকে গেছে। তাইতো কবি আক্ষেপ করে বলেন–

‘‘শুধু, চোখের জলের কথা সংসদের প্রস্তাবে বলা হবে না।

এতে সকলেরই জানা হয়ে যাবে:

ভালোবাসা মরে,

তবু, পিছুটান কখনো মরে না।’’

কবির ভাবনায় সর্বদা দার্শনিক প্রেম ও চিত্রকল্প খেলা করেছে। প্রেম বিষয়ে তাঁর ১৭টি ভাবনা স্থান পেয়েছে ‘বিচ্ছিন্ন প্রতিমাগুলি’ কবিতায়। এই কবিতার প্রতিটি লাইন ব্যঞ্জনা রসে সমৃদ্ধ এবং গভীরতায় বিশাল। ৬ নং প্রতিমায়:

‘‘আমি ঠিক দুপুরকেই রাত্রি মনে করে ঘুমোতে যাচ্ছিলাম,

রেলিঙে তোমার এলানো চুল দেখে ভেবেছিলাম

রাত্রি নেমেছে।’’

‘পারদ, স্পর্শ ও বিশ্বাস সম্পর্কিত তথ্য’ নামক কবিতায় কবি স্বীকার করেছেন, প্রেমিকাকে পরিপূর্ণভাবে পাওয়ার সুযোগ পেয়েও শুধু স্পর্শের মাঝেই ভালোবাসার সার্থকতা খুঁজেছেন। কবিতায়:

‘‘অতঃপর সে আমার হাত নিজের বুকে চেপে ধরে শব্দহীন কান্নায় ভাঙতে লাগলো। আমি পাঁচটি আঙুল দিয়ে তার চোখের ফোঁটাগুলি ধীরে ধীরে মুছে দিলাম। এবং এইভাবে প্রথমবার পারদ স্পর্শ করলাম।’’

বিজ্ঞানের তত্ত্ব মতে, চাঁদের আকর্ষণের ফলে নদীতে জোয়ার–ভাটা হয়। এতে নদীর কিছু করার থাকে না। গ্রহ–নক্ষত্র যেমন কক্ষপথে একে অপরের সাথে বাঁধা থাকে, তেমনি থাকে প্রেমিক যুগল। এ বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়া কবির পক্ষেও অসম্ভব। তাইতো কবি স্বগত সংলাপে বলেন–

“জোয়ারের চাঁদ টানছে নদীর বক্ষকে,

তোমার কক্ষ টানছে আমার কক্ষকে।

তরঙ্গে ডুব দিয়েছে বুকের চাঁদ,

তুমিই বলো–না জলের কি অপরাধ?

(ভরাকোটাল/আমার আসতে একটু দেরি হতে পারে)

কবির কাব্যে মিশে আছে বাস্তবের চরম সত্য। মানুষের জীবনের কঠিন লড়াইগুলো একাই লড়তে হয়। এতে ভয় পেলে মানুষ পরাজিত হয়, না হলে লাভ করে সফলতা। কবিতায়–

“যেখানে প্রকৃত যুদ্ধ, সেখানে তো মানুষ একাই

তাই,

ছায়াকে বলেছি, সরে যাও।

(একা এবং একক/ ক্যাঙ্গারুর বুকপকেট)

ময়ুখ চৌধুরীর কাব্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো নাটকীয়তা ও ব্যঞ্জনা। কবি তাঁর কাব্যে রোদকে নিজের সত্তা হিসেবে কল্পনা করেছেন। রোদকে কেউ ফেলে দিতে পারে না। সে আগে থেকেই ঘাসের উপর পরম মমতায় শুয়ে আছে। তাকে কোথাও ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার সাধ্য কারো নেই। কবি যেভাবে তাঁর প্রেমিকাকে ভালোবেসেছেন পরম যত্নে সেখান থেকেও তাকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া অসম্ভব। কবিতায়–

“কাকে ধাক্কা মেরে বলো, মাটিতে ফেলতে চাও–শুনি!

ওই দ্যাখো, শুয়ে আছে রোদ

ঘাসের ওপরে।

যাও, চেষ্টা করে দ্যাখো।”

(মেঘভাঙা রোদ/ ক্যাঙ্গারুর বুকপকেট)

প্রকৃতির রূঢ় বাস্তবতার চেয়ে কবিকে প্রেমিকার দেওয়া সূক্ষ্ম বিরহই বেশি পুড়িয়েছে। সূর্যের তেজ যা পারেনি, চাঁদের কোমলতা তা পেরেছে। কবিতায়–

“ছোট নদী ডুবে মরি; পারেনি বিশদ কোনো ঝিলও,

সূর্যের বেগুনি রং পোড়াতে পারেনি

চাঁদের কুসুম পেরেছিল।”

(কুসুম/পিরামিড সংসার)

বিশ্বাসী প্রেমিক ময়ুখ চৌধুরীর কাব্যভাষা অনন্য। ভালোবেসে প্রেমিকাকে ছুঁতে চেয়েছেন, কিন্তু পরক্ষণে আবার পেছনে ফিরে এসেছেন আত্মসমালোচনায়। প্রাথমিকভাবে তাঁর প্রেম দেহজ মনে হলেও শেষ পর্যন্ত তা দেহাতীত প্রেমে রূপ লাভ করেছে। কবিতায়–

“ভালোবাসা ছুঁতে গিয়ে বারবার শরীর ছুঁয়েছি।

আমি তাই অন্ধকারে জোনাকির মতো

প্রেমিকাবিহীন প্রেম খুঁজি।”

(প্রেমের কবিতা/চরণেরা হেঁটে যাচ্ছে মুণ্ডহীন)

ময়ুখ চৌধুরীর কাব্যে সংলাপধর্মিতা,নাটকীয়তা ও নিজস্ব কাব্যভাষা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তিনি কখনো স্বগতোক্তির মাধ্যমে তাঁর কবিতাকে সামনে নিয়ে এসেছেন, কখনো ব্যঞ্জনায় শব্দকে করেছেন বিস্তৃত। কখনো তাঁর নিপুন ছোঁয়ায় শব্দ হয়ে উঠেছে নাটকীয়তায় সমৃদ্ধ, আবার কখনো কবির নিজস্ব স্টাইলে তা হয়ে উঠেছে আরও প্রাণবন্ত। তাঁর দেহাতীত প্রেম–চেতনা উত্তর–আধুনিক কাব্যে এর স্বতন্ত্র মাত্রা যোগ করেছে। কালের প্রশ্নে তাঁর সৃষ্টি কতটুকু উত্তীর্ণ হবে, তা সময় বলে দেবে। তবে নিঃসন্দেহে সচেতন পাঠকের কাছে তাঁর দেহাতীত প্রেমের ভাবনা গভীর অনুরণন সৃষ্টি করেছে। এ কারণেই বর্তমান সময়ে ময়ুখ চৌধুরী আরও প্রাসঙ্গিক ও শ্রুতিগ্রাহ্য হয়ে উঠেছেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধরোহিঙ্গা গান ও চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান:
পরবর্তী নিবন্ধহাটহাজারীতে এক সপ্তাহে দুই ট্রান্সফরমার চুরি