চিকিৎসা বিজ্ঞানে একটা প্রচলিত আছে ‘প্রতিরোধই সর্বোত্তম প্রতিকার’। শারীরিক অসুস্থতার ক্ষেত্রে আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থায় সবচেয়ে প্রথম এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ইন্টারনাল মেডিসিন বা সাধারণ মেডিসিন বিভাগ। একজন ইন্টারনাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞ রোগের চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানে একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞই হচ্ছেন কেন্দ্রীয় চিকিৎসক। রোগীর বিস্তারিত ইতিহাস নিয়ে রোগ নির্ণয়ের মাধ্যমে জ্বর, বিভিন্ন ধরনের সংক্রামক–অসংক্রামক রোগ, ডায়াবেটিস, থাইরয়েড, উচ্চ রক্তচাপ, লিভার, কিডনি, নিউমোনিয়া, অ্যাজমা, অ্যানিমিয়া, গ্যাস্ট্রিক, আলসার ও হজমের সমস্যাসহ নানা রোগের চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। তবে রোগের মাত্রা ও ধরন অনুযায়ী যদি কোনো ইন্টারভেনশনাল কাজের প্রয়োজন হয় তখন রোগীকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞের কাছে রেফার (প্রেরণ) করেন একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ।
বিশ্বজুড়ে এটিই রীতি। কিন্তু আমাদের দেশে এই রেফারেল প্রথা না থাকায় বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের দুয়ারে দুয়ারে ভিড় করছেন রোগীরা। এতে রোগীরা সঠিক চিকিৎসা না পেয়ে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে পালিত হচ্ছে জাতীয় ইন্টারনাল মেডিসিন দিবস। জানা গেছে, বাংলাদেশে রোগীদের মেডিসিনের বিভিন্ন শাখা যেমন নিউরোলজি, নেফ্রোলজি, কার্ডিওলজি, এন্ডোক্রাইনোলজি, হেপাটোলজি, গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি ও সাইকিয়াট্রিসহ নানা বিভাগের চিকিৎসকদের চেম্বারে ভিড় করতে দেখা যায়। কিন্তু এই উন্নত বিষয়ে রোগীকে প্রথমে দেখেন ইন্টারনাল মেডিসিনের চিকিৎসকরা। তারা রোগ নির্ণয় করে প্রয়োজন অনুযায়ী মেডিসিনের বিভিন্ন শাখার বিশেষজ্ঞদের কাছে রেফার করেন। এখন রোগী যদি নিয়মতান্ত্রিকভাবে প্রথমে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ বা জেনারেল প্র্যাকটিশনারের কাছে যান, তবে তিনি প্রয়োজন মতে অন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে রেফার করতে পারেন। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, পায়ের ব্যাথা নিয়ে একজন রোগী শুধুমাত্র অজ্ঞতার কারণে একবার নিউরোলজিস্টের কাছে যাচ্ছেন, একবার ফিজিক্যাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞের কাছে যাচ্ছেন। আবার যাচ্ছেন রিউমেটোলজিস্টের কাছে। আবার কেউ কেউ যাচ্ছেন অর্থোপেডিকস বিশেষজ্ঞের কাছে। অথচ রোগ নির্ণয় শেষে কার কাছে যাবেন, সেই সিদ্ধান্তটি মেডিসিন বিশেষজ্ঞেরই দেওয়ার কথা। এতে রোগীদের সময়ের সাথে সাথে অর্থেরও অপচয় হচ্ছে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, মেডিসিন বিভাগের অধীনে ওয়ার্ড রয়েছে তিনটি। এই তিনটি ওয়ার্ডে সরকার অনুমোদিত বেড রয়েছে ১৯২টি। কিন্তু তিন ওয়ার্ডে রোগী ভর্তি থাকে প্রায় আড়াই গুণ। স্থান সংকুলান না হওয়ায় ওয়ার্ডের প্রতিটি কোনায় রোগী ভর্তি দিতে হচ্ছে। শুধু তাই নয়, হাঁটা–চলার পথ, এমনকি বারান্দার মেঝেতেও রোগী ভর্তি থাকছে। ওয়ার্ডের বাইরে হওয়ায় অনেক রোগী প্রয়োজনীয় অঙিজেন সরবরাহও পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেন স্বজনেরা।
মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসকরা বলছেন, জায়গার সংকুলান না হলেও আমরা তো চাইলে কোনো রোগীকে ভর্তি না দিয়ে ফেরত দিতে পারি না। ফলে মেঝেতে বসে আমাদের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সেবা দিতে হচ্ছে।
চমেক হাসপাতাল মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. এ এস এম জাহেদ আজাদীকে বলেন, আমরা মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসকরা কেবল রোগীর চিকিৎসা দেওয়ার কাজ করছি না, একইসাথে রোগের উৎপত্তি ও প্রতিরোধের বিষয়ে গবেষণার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কাজ করছি। এছাড়া আমরা সাপে কাটা রোগীর চিকিৎসার পাশাপাশি অ্যান্টিভেনম তৈরিতে গবেষণার সাথে যুক্ত আছি। আবার অতীতে কোভিড মোকাবেলা, সাম্প্রতিক সময়ে ডেঙ্গু–চিকুনগুনিয়াসহ ম্যালেরিয়া ও বিভিন্ন রোগ মোকাবেলায় সব সময় কাজ করে যাচ্ছি।
তিনি বলেন, চমেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ওয়ান স্টপ ইমারজেন্সি সেন্টার (ওসেক) আমাদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে। এর বাইরে হাইপারটেনশন ক্লিনিক, স্নেক বাইট ক্লিনিক, এসএলই ক্লিনিক, ফিভার ক্লিনিক ও আইসোলেশনের ওয়ার্ডও আমরা তত্ত্বাবধান করছি। ভবিষ্যতে একিউট মেডিসিন ওয়ার্ড এবং বয়স্কদের জন্য জেরিয়াট্রিক ওয়ার্ড করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এদিকে ইন্টারনাল মেডিসিন দিবস উপলক্ষে গতকাল চট্টগ্রাম মেডিকেল মাঠে মিনি ম্যারাথন ও ফুটবল ম্যাচের আয়োজন করে বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিসিন চট্টগ্রাম শাখা ও চমেক হাসপাতাল মেডিসিন বিভাগ। মিনি ম্যারাথন উদ্বোধন করেন সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক ডা. শাহাদাত হোসেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সোসাইটির আহ্বায়ক ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন, চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন, চট্টগ্রাম বিএমএর সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট মেম্বার ডা. খুরশিদ জামিল চৌধুরী, চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট মেম্বার ডা. তমিজ উদ্দিন চৌধুরী, অধ্যাপক ডা. বেলায়েত হোসেন ডালী, সহযোগী অধ্যাপক ডা. ইফতেখার লিটন প্রমুখ।
ইন্টারনাল মেডিসিন দিবস উপলক্ষে আজ চমেকে র্যালি ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. ওমর ফারুক ইউসুফ।












