বে টার্মিনাল প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে সরকার

প্রথম টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্ব দিতে সিঙ্গাপুরের পিএসএর সঙ্গে এমওইউ সই চূড়ান্ত চুক্তি তিন-চার মাসের মধ্যে

হাসান আকবর | বুধবার , ২৮ অক্টোবর, ২০২৬ at ৬:৫৫ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে বে টার্মিনাল প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে সরকার। তিনটি টার্মিনাল নিয়ে পরিকল্পিত এ মেগা প্রকল্পের প্রথম টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্ব দিতে সিঙ্গাপুরের বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান পিএসএর সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে এ বিষয়ে চূড়ান্ত চুক্তি হতে পারে। টার্মিনালটি ২০৩০ সালে চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে বে টার্মিনালের থ্রিডি সিমুলেশন বা ডিজিটাল মডেল তৈরির কাজ চলছে। এ কাজ শেষ হলে প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে ব্রেক ওয়াটার, প্রবেশপথের নেভিগেশন চ্যানেল এবং প্রয়োজনীয় মূল অবকাঠামো নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু হবে। প্রায় ৬ কিলোমিটার এলাকায় এসব অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীর একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, থ্রিডি সিমুলেশনের প্রতিবেদন পাওয়ার পর টেন্ডার ডকুমেন্ট তৈরির কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে। একই সঙ্গে নেভিগেশন চ্যানেল ও ব্রেক ওয়াটার নির্মাণের প্রক্রিয়াও শুরু হবে।

তিনি জানান, এসব অবকাঠামো নির্মাণের জন্য বিশ্বব্যাংক ইতোমধ্যে ৬৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ অনুমোদন করেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, নেভিগেশন চ্যানেল ও ব্রেক ওয়াটার নির্মাণ করবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে দায়িত্বপ্রাপ্ত বিদেশি প্রতিষ্ঠান টার্মিনাল নির্মাণ, হ্যান্ডলিং সরঞ্জাম স্থাপন এবং নির্ধারিত মেয়াদে পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবে।

পতেঙ্গা ও উত্তর হালিশহর এলাকার সমুদ্র উপকূল ঘেঁষে প্রায় আড়াই হাজার একর জমিতে বে টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারি–বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। নির্মাণ ও পরিচালনায় প্রয়োজনীয় বিপুল বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে।

প্রস্তাবিত তিনটি টার্মিনালের মধ্যে একটি হবে মাল্টিপারপাস টার্মিনাল। এখানে কন্টেনারের পাশাপাশি খোলা পণ্যও হ্যান্ডলিং করা যাবে। বাকি দুটি হবে কন্টেনার টার্মিনাল। প্রথম টার্মিনাল পরিচালনায় পিএসএর সঙ্গে সমঝোতার পাশাপাশি অন্য দুটি টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার ক্ষেত্রেও একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের আগ্রহ রয়েছে।

সম্প্রতি চট্টগ্রামে এক অনুষ্ঠানে নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানিয়েছিলেন, বে টার্মিনালের প্রথম টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার বিষয়ে পিএসএর সঙ্গে আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে চুক্তি হতে পারে।

বে টার্মিনাল চালু হলে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করে সূত্র বলেছে, বর্তমানে বন্দরের চ্যানেলের গভীরতা সীমিত হওয়ায় বড় জাহাজের প্রবেশ ও বহির্গমন জোয়ারের ওপর নির্ভরশীল। বে টার্মিনালে নেভিগেশন চ্যানেলের গভীরতা বাড়ানো হলে ভাটার সময়ও জেটিতে জাহাজ ভেড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

প্রকল্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৮০০ থেকে ১২০০ মিটার প্রস্থের চ্যানেল দিয়ে ১২ মিটার ড্রাফট এবং ২৮০ মিটার দৈর্ঘ্যের জাহাজ চলাচল করতে পারবে। একসঙ্গে প্রায় ছয় হাজার কন্টেনার বহনে সক্ষম জাহাজও এ টার্মিনালে ভিড়তে পারবে।

বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে ১০ মিটার ড্রাফট ও ২০০ মিটারের বেশি দৈর্ঘ্যের বড় জাহাজ চলাচলে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে বে টার্মিনাল চালু হলে আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যে বড় জাহাজ ব্যবহারের সুযোগ বাড়বে এবং পণ্য পরিবহন ব্যয় কমে আসবে।

বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে বছরে প্রায় ৩৪ লাখ টিইইউএস কন্টেনার হ্যান্ডলিং করা হয়। বে টার্মিনাল পুরোপুরি চালু হলে বছরে অতিরিক্ত সক্ষমতা তৈরি হয়ে ৩০ লাখ থেকে ৫০ লাখ টিইইউএস পর্যন্ত কন্টেনার হ্যান্ডলিংয়ের সুযোগ তৈরি হবে বলেও প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

বে টার্মিনাল পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে দীর্ঘমেয়াদে দেশের আমদানি–রপ্তানি পণ্য পরিবহনে গতিশীলতা তৈরি হবে এবং আন্তর্জাতিক সমুদ্রবাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনার দ্বারও উন্মুক্ত হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে আগামী কয়েক দশকের দেশের বর্ধিত চাহিদা সামাল দেওয়াও সহজ হবে। বিদ্যমান চট্টগ্রাম বন্দর অবকাঠামো দিয়ে আগামী কয়েক বছর পর দেশের চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে না বলেও সূত্রগুলো আভাস দিয়েছে।

বন্দর ব্যবহারকারীরা বলেছেন, আধুনিক অবকাঠামো, গভীর নেভিগেশন চ্যানেল এবং আন্তর্জাতিক অপারেটরের অংশগ্রহণের সমন্বয়ে বে টার্মিনাল দেশের সমুদ্রবন্দর ব্যবস্থাপনা এবং বৈদেশিক বাণিজ্যে নতুন মাত্রা যোগ করবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসারা দেশে ডেঙ্গুতে ১১ মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ২০৭১
পরবর্তী নিবন্ধস্ত্রীকে গলা টিপে হত্যার কথা স্বীকার করলেন স্বামী, বোনসহ কারাগারে