দেশ হতে দেশান্তরে

লাংকাভির বিচে আবায়াকাটা পরি

সেলিম সোলায়মান | রবিবার , ২৫ অক্টোবর, ২০২৬ at ৮:০৮ পূর্বাহ্ণ

‘আসসালামুয়ালাইকুম, গুড মর্নিং ড. সেলিম, মে আই জয়েন উইথ ইউ ?’ কাটেনি ঘুম ঘুম ভাব এখনো। শেষমুহূর্তে ঢাকার ভিসাভিযানে তিন ভিসার ফয়সালা করে, ধরতে পেরেছিলাম মালয়েশিয়ার ফ্লাইট গত মধ্যরাতে। এরপর কুয়ালামপুর থেকে কানেক্টিং ধরে এসে পৌঁছেছি লাংকাভি আজই ভোরে। এয়ারপোর্ট থেকে হোটেলে পৌঁছেই ভাবলাম, ব্রেকফাস্ট সেরে নেই। ঠিক এক ঘণ্টা দশ মিনিট পর, বলরুমে উঠবে পর্দা, আড়াইদিনব্যাপী আমাদের বাৎসরিক সেলস মার্কেটিং কনফারেন্স ও ট্রেনিংয়ের। প্লেটে দ্রুত কিছু পছন্দের আইটেম তুলে, এক কোণে বিচমুখী দুজনের ধারণক্ষমতাসম্পন্ন এই টেবিলটার দখল নিতেই, রমণীয় কিন্নরকণ্ঠ চমকে দিয়েছিল!

আরে, এতো দেখছি ডানাকাটা না আবায়াকাটা পরি! আমাদের সৌদি টিমে যে অল্প কয়েকজন নারী আছেন, তাদেরই কেউ হবেন নিশ্চয়। না হয় এই আন্দামান সাগরপাড়ে ভুতো আমাকে চিনবে আর কে? কিন্তু এই পরি যে কে? তা তো পারছি না বুঝতে! এক জর্ডানি, এক ফিলিস্তিনি ও এক মিশরি এই তিন অতীব সাহসিনী ছাড়া নারী সহকর্মীদের আর কারোই মুখশ্রী দেখার সৌভাগ্য হয়নি এতোদিনেও। তা হলেও যে কণ্ঠের সাথে চেহারা মেলাতে পারতাম, ঐ রকম কাবিলও নই এই শর্মা। কারণ কথাবার্তাও হয়েছে সামান্যই।

ওয়াআলাইকুম আস সালাম, প্লিজ ফিল ফ্রী, থতমত ভাব কাটিয়ে, উঠে গিয়ে অত্যন্ত তমিজের সাথে ওপাশের চেয়ার টেনে ইশারায় বলি, বসতে আজ্ঞা হোক।

একহাতে ব্রেকফাস্টের প্লেট, অন্যহাতে কফিকাপ। গোলাপি রঙ্গয়ের মিনি সাইজের টি শার্টের গলার কাছের ফর্সা অংশটায়, যে লকেটটা ঝিকমিক করছে ওটা কি হীরা? একইরকম দুটো হীরা দুলছে কানেও। ঐগুলোর ঝিকিমিককে ম্লান করে দেয়া হাসিতে, জিন্সের শর্টস, পায়ে ফ্লিপফ্লপ গলানো পরী বসলেন, ওপাশে চেয়ারে। মুখোমুখি। ব্রেকফার্স্ট করতে করতে, যেরকম ভঙ্গিতে কথা বলছেন পরী, ওরকম কথা হয় পরিচিতজনদের মধ্যেই। এমতাবস্থায় যদি বলি, আপনাকে তো চিনতে পারছি না! তাহলে এ আমড়া কাঠের ঢেঁকির কারইে গোটা পুরুষজাতিরই কপালে পড়ে কলঙ্কতিলক। বলছি কথা তাই এমনভাবে, যেন ঘুণাক্ষরেও টের না পান এই বেকুবের অজ্ঞতা।

ঝটপট নাস্তা শেষ করে, সকালটিকে আলোকিত করে তোলার জন্য তাঁকে ধন্যবাদ দিয়ে বললাম, দ্রুত তৈরি হয়ে হাজিরা দিতে হবে বলরুমে। একটা টেকএওয়ে কফি নিয়ে তাই যেতে চাচ্ছি রুমে এক্ষুণি।

‘তাইতো, তাইতো। স্মার্ট আইডিয়া। আমিও তাহলে টেকএওয়ে কফি নিয়ে, রুমে গিয়ে তৈরি হই।’ বলেই নিলেন পিছু।

চলছে ফিল রাশীয় ভঙ্গিতে তাঁর ওপেনিং স্পিস। দারুই কিক অফ করছেন, বস। অতোটা তড়িঘড়ি না করলেও হতো। বেশ আগেই এসে পৌঁছেছিলাম চমৎকারভাবে সাজ্জিত বলরুমে। উদ্দেশ্য ছিল নানানজনের সাথে টুকটাক হাই, হ্যালো, করতে করতে, অচেনা এই রুমের আবহের সাথে, স্টেজে উঠার আগে একটু খাপ খাইয়ে নেয়া নিজেকে। করেছিও। তাতে একটু আগেও কনফিডেন্সের কোন অভাব ছিল না।

কিন্তু যেই না মনে হল অচিরেই ফিলের বক্তব্য শেষ হতেই, পড়বে ডাক অধমের, শুরু হল বুকে ধুকপুক। যে দৌড়ঝাঁপে কেটেছে গত আড়াই, তিন সপ্তাহ, তার মধ্যে প্রেজেন্টেশনের স্লাইডগুলো শেষ করতে পারলেও, সুস্থির হয়ে প্রস্তুতি নেবার সুযোগ পাইনি। এরকম সমাগম কেন? এর চেয়ে বড় সমাগমেও দিয়েছি বক্তৃতা ঢের। তবে ছিল ও সবই নিজ দেশে। বারোজাতির এরকম সমাগমে এই তো উঠছি প্রথম স্টেজে। তদপুরি এদের অনেকেই যে আমাকে মিসকিন জ্ঞান করে, জানি তাও।

ব্রিটিশ কৌতুকে মোড়ানো ফিলের লাগসই ওপেনিং শেষ হতে, ইংরেজিতে যাকে বলে স্ট্যান্ডিং অভেশন, সেটির সাথে তুমুল হর্ষধ্বনিতে ফেটে পড়লো বলরুম। এরই ফাঁক গলে অধমের নাম ঘোষণা হতেই, ধাই করে বসলো চেপে কাঁধে সেই টেনশন, আচ্ছন্ন করেছিল যা বহুকাল আগে, স্কুলে প্রথম বক্তৃতা প্রতিযোগিতায় নাম লেখানোর মহাভুল করার পর, স্টেজ থেকে এসেছিল ডাক যখন।

হাতের কাছের ছোট্ট পানির বোতল থেকে, এক ঢোক পানি খেয়ে সেটি হাতে নিয়েই, যা আছে কপালে বলে দৃপ্ত পদক্ষেপে এগুতে থা মঞ্চের দিকে।

আগামী আড়াই দিনের এই কনফারেন্সের মুল সুরটা আমাকেই বেঁধে আসতে সঠিক সুরে। বসের চমৎকার শুরুটাকেও গুবলেট করা যাবে না কিছুতেই। আওড়াতে থা মনে মনে, বি এন্ড ইউরসেলফ, স্টে ইউরসেলফ সেলিম!

তিরিশ মিনিট কী পার হয়ে গেল নাকি? নাকি করেছি শেষ আগে? হলভর্তি সহকর্মীদের অনেকেই দাঁড়িয়েই তুমুল হাততালির সাথে, মাশাআল্লাহ, গ্রেট, আন্তা লাবিক উচ্চারন করতে শুরু করলে, পড়লাম ধন্দে। আসলেই বাঁধতে পেরেছি কী, সুর ঠিক ঠিক? নাকি এ হল আরবিয়দের নিতান্তই সাংস্কৃতিক আচার? ঘড়ি বলছে, আর সব যাই হোক, করেছি শেষ কাঁটায় কাঁটায় ঠিক সময়ে। আগেও না পরেও না!

স্টেজ থেকে নামতে নামতে দেখি ফিল উঁচু করেছে জোড়া বুড়ো আঙুল! সাথে একগাল হাসির নড। ঐদিকে, হেড অব সেলস, বন্ধু খলিল, দুই হাত বাড়িয়ে উঠে দাঁড়িয়ে এগুতে এগুতে বলছে, ইয়া মারহাবা, মাশাল্লাহ, হাবিবি সেলিম মাই ফ্রেন্ড, মাই ব্রাদার–

তখনি বা পাশের মহিলাঙ্গন থেকে, চমৎকার কালো এক্সিকিউটিভ স্যুট পরা একজন, দ্রুততর গতিতে এগিয়ে ওয়াও, গ্রেট মিস্টার সেলিম, বলে হাত মেলানোর জন্য হাত বাড়াতেই, মুহূর্তের জন্য নেমে এলো হঠাৎ নীরবতা

আর যেই না, মিলে গেল দুজনের হাত, ফেটে পড়লো রুম ফের তুমুল হাততালিতে!

পরিবর্তিত পোশাক ফের ফেলেছিল ধন্দে। রক্ষা পেলাম লকেটের ও কানের দুলের হীরের দ্যুতিতে। সাথে কথা বলার ভঙ্গিটি, চট করে মনে পড়তেই, চিনলাম খাস সৌদি ট্যালেন্ট ম্যানেজার মাহা আল কাহতানিকে। কিছুকাল আগেই এইচ আর হেড গিউসির টিমে যোগ দিয়েছিলেন, মূলত নারী সহকর্মীদের দেখভালের জন্যেই। তবে শুধু ঐজন্যই তো কোন ম্যানেজার নিয়োগ দেয়া যায় না, তাই দেয়া হয়েছিল ট্যালেন্ট ম্যানেজারের পদ। বুঝলাম, তার পণ্ডিতি কানেকশনও।

এটা কী ঠিক হলো? এই কাজ রিয়াদে করলে এতক্ষণে যেতে হত নির্ঘাত শরিয়াহ পুলিশের হাজতে। অফিসে বারকয়েক অত্যন্ত নিরাপদ দূরত্বে রেখে কথাবার্তা হলেও, মুখই তো দেখেনি। আর আজ কি না মেলালাম হাতে হাত! নির্ঘাত এ খবর পৌঁছুবে রিয়াদে, আজ হোক, হোক তা কাল। সেক্ষেত্রে রিয়াদে ফিরলে আছে যে কী কপালে!

আর ধুর! যা হয় হোক। “শির দেগা নেহি দেগা আমামা”। একজন সৌদি নারী যে সাহস দেখালো, সে জায়গায় এই বাংগাল যদি পিছু হটে, তাতে চুনকালি পড়বে বাঙ্গালী জাতির মুখে। থাকিতে প্রাণ এ দেহে , তা কি হতে দিতে পারি?

আশার কথা হল, খলিল, ফাহাদ ও রাইদের বরাতে জেনেছি, মাহা অত্যন্ত প্রভাবশালী শেখ পরিবারের কন্যা। পড়াশোনা, বিশেষত এম বি এ করেছে ইংল্যান্ডে। ব্যক্তিগত জীবনে ডিভোর্সড মাহাকে, সৌদি সহকর্মীরা সম্‌ভ্রমে এড়িয়েই চলে দেখেছি। তাঁকে নিশ্চয় কেউ ঘাটাবে যাবে না।

তা না হলে, মাহাই হয়তো করতো না এ কাজ। নাকি মরুকন্যা পায়ের নীচে লাংকাভিংর শক্ত মাটি পাওয়াতেই, করলো এই দুঃসাহস! আচ্ছা তাই যদি তুমি করবে, করতে তা কোন আমেরিকান বা ইউরপিয়ানের সাথে। বেহুদা এই বাঙ্গালের সাথে ওটা করার কী মানে আছে?

বেশ ভালভাবেই হয়েছে শেষ, লাংকাভি কুয়ালালামপুর পর্ব। গোটা টিমকে যথেষ্ট এনারজাইজড করা গেছে, নতুন বছরের জন্য। বের হয়েছে এরই মধ্যে, পারফরমেন্সের ভিত্তিতে হেড কোয়ার্টার থেকে প্রকাশিত কান্ট্রি ক্লাস্টারের ট্রাফিক সিগনাল লিস্ট।

হলুদ গ্রুপে মানে এচিভার লিস্টে যে থাকবোই, তা নিশ্চিত ছিলাম। জোর আশা ছিল হয়তো যেতে পারি সবুজ গ্রুপেও। ঐ গ্রুপে যেতে হলে যে সব ক্রাইটেরিয়া পূরণ করতে হয়, তার সবগুলো না হলেও বেশ কয়টাই পূরণ হয়েছে। যার উপর ভিত্তি করে হেডকোয়ার্টার কী সব সমীকরণ যেন করে। তাতে কোন কোন সময় কোন কোন দেশ শেষমুহূর্তে ঢুকে পড়ে সবুজ লিস্টিতে। ঘটেছে তাই আমাদেরও। ফুরফুরে মেজাজে তাই রওয়ানা দিয়েছে সৌদিতে সবাই নানান ফ্লাইটে আজই, নানান সময়ে। শেষ ব্যক্তি হিসেবে করেছি রওয়ানা এ অধম কুয়ালালামপুর এয়ারপোর্টের দিকে। গন্তব্য ঢাকা। আড়াই দিন পর, ঢাকা থেকে ধরবো এমিরেটস, দুবাই হয়ে রিয়াদে যাওয়ার। যার মানে হচ্ছে নতুন বছরের প্রথম মাসের শেষ সপ্তাহে পৌঁছুব সৌদিতে। তারপর, সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যে যাবো লন্ডনের গ্লোবাল মিটিংয়ে।

ইচ্ছা ছিল, লাকাংভিতে না হলেও কুয়ালালামপুরে ফিল, খলিল, গিউসি সহ একটা স্পেশাল পার্টিতে বসবো। তা আর হয়ে উঠেনি। প্রথমত লাংকাভির শেষদিন আর কুয়ালালামপুরের দিনগুলো ছিল ফ্রি ডে। ঐ দিনগুলোতে ফ্রি বার্ড হয়ে ঘুরতে চাচ্ছিল সবাই। ছিল একই ইচ্ছা খলিল ও গিউসিরও।

দ্বিতীয়ত, প্রথমদিনের ব্রেকফাস্ট থেকে শুরু করে আমার ফ্রি সময়ের বেশিরভাগটাই জুড়ে ছিল মাহা। এ নিয়ে আড়ালে আবডালে নানান ইঙ্গিতপূর্ণ কথা যে হচ্ছে, টের পেয়েছি। আশার বিষয়, শেখের বেটি মাহাকে নিয়ে কেউ খুব বেশি ঘাটাঘাটি করবে না। তারপরও যে খুব স্বস্তিতে ছিলাম বা আছি এখনো তাও না।

বিশেষত লাংকাভিতে গালা ডিনারের রাতে, বেশিরভাগজনই যখন বলরুমে ব্যস্ত রক ব্যান্ডের তালে তালে নৃত্যগীতে, টুপ করে বেরিয়ে পড়েছিলাম ঐ হুল্লোড় থেকে। ভেবেছিলাম এই ফাঁকে যাই বারে। একই কাজ করেছে ফিল, খলিল ও গিউসি আগেই। আমি শুধু আটকা পড়েছিলাম, আমারই টিমে নতুন যোগ দেয়া, আহমেদ আল আসকারী ও আহমেদ আব্দেল মাক্সুদের সাথে। নতুন বসকে ফাঁকা পেয়ে, দুজনেই নাচ গান বাদ দিয়ে জমিয়েছিল আলাপ।

বেশ কসরত করে ওদের কাছ থেকে মুক্ত হয়ে, আলো আঁধারিতে মোড়া করিডোর ধরে এগুচ্ছিলাম যখন, তখনই অন্ধকার ফুঁড়ে কোত্থেকে যেন উদয় হয়েছিল মাহা!

“হাই, মিস্টার সেলিম, আমি কি আসতে পারি তোমার সাথে?”

সাথে সাথেই বারের মতলব ধামাচাপা দিয়ে বলেছিলাম, এই একটু বিচে যাচ্ছি। তোমার আপত্তি বা সমস্যা না থাকলে, অবশ্যই আসতে পারো । “আমিও ওখানে যেতে চাচ্ছিলাম।” বাহ, চলেই তো এসেছি এয়ারপোর্টে।

এ সময়টায় কি ভিড় কম থাকে নাকি? বেশ দ্রুত হয়ে গেল চেক ইন আর সিকিউরিটি চেকিং। লাউঞ্জে এসে বসেছি একটা নির্জন কোণে। নাহ মার্টিনি রোসো পেলাম না। বলেছিলাম বারটেন্ডারকে তাই দিতে সিংগাপুর স্লিং। মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের লাউঞ্জে সিংগাপুর স্লিং চাওয়াতে অবাকই হয়েছিল সে, মনে হল।

এইমাত্র দিয়ে যাওয়া গোলাপি স্লিংয়ে চুমুক দিতে দিতে ঠিক করলাম, এবার ঢাকায় পৌছুবার পর থেকে রিয়াদের উদ্দেশ্যে এয়ারপোর্টে যাওয়ার আগ পর্যন্ত গোটা সময়টাই দেবো পরিবারকে।

লেখক : প্রাবন্ধিক, ভ্রমণসাহিত্যিক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধপ্রবারণার আলোয় আলোকিত হোক বাংলাদেশ