চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় জ্বালানি তেল পরিবহনে ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকায় নির্মিত পাইপলাইন পরিচালনায় প্রয়োজনীয় জনবল সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। অনুমোদিত জনবলকাঠামোর ৭২ শতাংশই শূন্য রয়েছে। ২৫১ জনের অনুমোদিত জনবলকাঠামোর বিপরীতে মাত্র ৬৯ জন কর্মরত রয়েছেন। এতে করে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় জ্বালানি তেল পরিবহনে দীর্ঘদিনের নৌপথনির্ভরতার অবসান ঘটাতে নেওয়া প্রকল্পটি পুরোদমে এবং পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ইতোমধ্যে ৮৪টি চালানে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল চট্টগ্রাম থেকে নারায়ণগঞ্জে প্রেরণ করা হলেও নৌপথ–নির্ভরতা পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।
সূত্রে জানা যায়, দেশের চাহিদার ৭০ লাখ টন জ্বালানির অন্তত ৩০ লাখ টন ব্যবহৃত হয় ঢাকা ও কুমিল্লা অঞ্চলে। এসব জ্বালানির বেশির ভাগ বেসরকারি অয়েল ট্যাংকারের মাধ্যমে নৌপথে পরিবাহিত হয়। ওখানে কোটি কোটি টাকার তেল চুরিসহ নানা অপকর্ম ঘটে। ট্যাংকারে জ্বালানি তেল পরিবহনের ক্ষেত্রে পয়েন্ট ১৭ শতাংশ সিস্টেম লস বিপিসি মেনে নেয়। বছর শেষে পয়েন্ট ১৭ শতাংশ বড় অংক হয়ে দাঁড়ায়। সিস্টেম লস কিংবা তেল চুরির এই লোকসান থেকে দেশের জ্বালানি তেল সেক্টরকে বাঁচাতে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পর্যন্ত পাইপলাইন নির্মাণ করা হয়। ৫০ লাখ টন ধারণক্ষমতার পাইপলাইনে বর্তমানে ৩০ লাখ টন জ্বালানি তেল সরবরাহ করার কথা।
প্রায় ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় জ্বালানি তেল সরবরাহের জন্য চট্টগ্রাম–ঢাকা পাইপলাইন নির্মাণ প্রকল্প (সিডিপিএল) বাস্তবায়ন করেন সেনাবাহিনীর প্রকৌশলীরা। চট্টগ্রামের পতেঙ্গা থেকে নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল হয়ে ঢাকার ফতুল্লা পর্যন্ত ২৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইনটিতে ইতোমধ্যে ৮৪টি চালানে লক্ষ লক্ষ টন জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাষ্ট্রায়ত্ত তিন তেল বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান পদ্মা অয়েল, মেঘনা পেট্রোলিয়াম ও যমুনা অয়েলের পতেঙ্গায় অবস্থিত প্রধান ডিপো থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে কুমিল্লা ও নারায়ণগঞ্জের ডিপোগুলোতে এই জ্বালানি তেল পাঠানো হয়। প্রকল্পটি উদ্বোধন করা হয় ২০২৫ সালের ১৪ আগস্ট। পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয় চলতি বছরের জুলাইয়ে। ফলে উদ্বোধনের পর প্রাথমিক পর্যায় পেরিয়ে এখন প্রকল্পটির কার্যক্রম পুরোদমে চালু করার সময় এসে গেছে। এই পাইপলাইনের মাধ্যমে চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লার বারুড়া হয়ে জ্বালানি তেল যাবে নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল এবং ঢাকার ফতুল্লায়। কুমিল্লার বরুড়ায় স্থাপন করা হয়েছে সর্বাধুনিক প্রযুক্তিসমৃদ্ধ অটোমেটেড ডিপো। সর্বাধুনিক এই ডিপো থেকে চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ সন্নিহিত অঞ্চলের প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হবে, যা এখন নৌপথে চাঁদপুরে পাঠানো হয়। এই ডিপোতে জ্বালানি তেল গ্রহণ এবং সরবরাহের সবকিছু নিয়ন্ত্রিত হবে সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে। তেলের ওজন, তাপমাত্রা, সরবরাহ পরিচালিত হবে কম্পিউটারাইজড প্রযুক্তিতে। ম্যানুয়ালি কোনো কাজ হবে না। চট্টগ্রামের ডেসপ্যাচ টার্মিনালের স্ক্যাডা মাস্টার কন্ট্রোল স্টেশন থেকে পুরো পাইপলাইনের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ এবং পরিচালনা করা হবে। স্ক্যাডা, টেলিকমিউনিকেশন এবং লিক ডিটেকশন করতে এই পাইপলাইনের সাথে অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল লাইন সংযুক্ত রয়েছে।
২৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইনের ২৪১ কিলোমিটার অংশে ১৬ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপ বসানো হয়েছে, যা পতেঙ্গা থেকে নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল পর্যন্ত বিস্তৃত। পাশাপাশি গোদনাইল থেকে ফতুল্লায় ডিপো পর্যন্ত ৮.২৯ কিলোমিটার পৃথক ১০ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপলাইন স্থাপন করা হয়েছে।
বিপিসির একজন কর্মকর্তা জানান, ভূগর্ভস্থ এই পাইপলাইন ২২টি নদী ও খালের নিচ নিয়ে এসেছে। পুরো রুটে ৯টি পাম্পিং স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে।
অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে পরিচালনার ফলে সিস্টেম লস শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনা সম্ভব হবে। ইতোমধ্যে পদ্মা অয়েল কোম্পানি কয়েক দফায় জিরো সিস্টেম লসে জ্বালানি তেল চট্টগ্রাম থেকে গোদনাইলে নিয়ে গেছে। অর্থাৎ চট্টগ্রাম থেকে যে পরিমাণ তেল পাইপলাইনে পাম্প করা হয়েছে ঠিক সেই পরিমাণ তেল গোদনাইলে রিসিভ করেছে।
পূর্বে তেলবাহী ট্যাংকারে চট্টগ্রাম থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত তেল পরিবহনে প্রায় ২৪ ঘণ্টা সময় লাগত। কিন্তু নতুন পাইপলাইনের মাধ্যমে মাত্র ৪ ঘণ্টায় তেল পৌঁছানো যাবে। বর্তমানে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পর্যন্ত তেল পরিবহনে বিপিসির বার্ষিক খরচ হয় প্রায় ৩২৬ কোটি টাকা। পাইপলাইন চালু হলে খরচ হবে ৯০ কোটি টাকা। ফলে বছরে অন্তত ২২৬ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। এছাড়া সিস্টেম লস এবং চুরি ঠেকানোর মাধ্যমেও কোটি কোটি টাকা রক্ষা পাবে।
কিন্তু ব্যবস্থাটিতে সংকট তৈরি করেছে জনবল। প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে প্রকল্পটি পুরো সক্ষমতা চালানো চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে প্রকৌশল, অপারেশন ও প্ল্যানিং বিভাগে কর্মীস্বল্পতা প্রকল্পটির নিয়মিত তদারকি, রক্ষণাবেক্ষণ ও নির্বিঘ্ন পরিচালনা নিয়ে সমস্যা তৈরি করেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাইপলাইনে জ্বালানি তেল পরিবহনের মাধ্যমে সময় ও অর্থ সাশ্রয়ের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তা দীর্ঘমেয়াদে কাজে লাগাতে হলে পরিচালনব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা জরুরি। কারণ, এ ধরনের অবকাঠামোর নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন কার্যক্রম নিশ্চিত করতে নিয়মিত কারিগরি পর্যবেক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং দক্ষ জনবলের বিকল্প নেই। জনবল সংকটের কারণে এসব কার্যক্রম ব্যাহত হলে প্রকল্পটির প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে।
পেট্রোলিয়াম ট্রান্সমিশন কোম্পানি পিএলসি (পিটিসি) প্রকল্পটি পরিচালনা করছে। প্রতিষ্ঠানটির একজন কর্মকর্তা বলেন, সিডিপিএলে জনবল সংকট প্রকট। বিশেষ করে অপারেশন, প্ল্যানিং এবং প্রকৌশল বিভাগে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম কর্মী রয়েছেন। প্রকৌশল বিভাগে ১১৯ জনের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৩১ জন। অপারেশন ও প্ল্যানিং বিভাগে ৮৭ জনের জায়গায় রয়েছেন ৩০ জন। পুরো প্রকল্পে ২৫১টি পদের বিপরীতে কর্মরত ৬৯ জন।
তিনি বলেন, এটি অত্যাধুনিক একটি প্রকল্প। সিস্টেমও প্রযুক্তিনির্ভর। এটিকে নিয়মিত তদারকি এবং যথাযথভাবে পরিচালনা করা না গেলে সংকট প্রকট হবে। আমাদের লোকবল সংকট রয়েছে। এটি একটি আধুনিক প্রকল্প। এটিকে নিয়মিত তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে।












