মানুষের মধ্যে দুটি সত্তা নিরন্তর ক্রিয়াশীল সুর ও অসুর, অর্থাৎ সৎপ্রবৃত্তি ও কুপ্রবৃত্তি। কুপ্রবৃত্তি যখন মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, তখন সমাজে সৃষ্টি হয় অস্থিরতা, বিশৃঙ্খলা ও বিপর্যয়। আজকের সমাজবাস্তবতায় অশুভ শক্তির আস্ফালন দেখে মনে হয়, তার বিনাশে মহাশক্তি মা দুর্গার আবির্ভাব যেন অনিবার্য।
পুরাণ অনুসারে, রাবণ বধের উদ্দেশ্যে শ্রীরাম শরৎকালে অকালবোধনের আয়োজন করেন। বোধন বা কল্পারম্ভের মধ্য দিয়ে দেবীকে জাগ্রত করে পূজার সূচনা হয়। বিশ্বাস, নিষ্ঠা ও আরাধনার মাধ্যমে মহাশক্তির আশীর্বাদ লাভ করে শ্রীরাম রাবণকে পরাস্ত করতে সক্ষম হন। কিন্তু আজ আমরা সেই মহাশক্তির আরাধনা করেও যেন ক্রমে শক্তিহীন হয়ে পড়ছি। কারণ, শক্তি অর্জনে যে ভক্তি, নিষ্ঠা ও আত্মশুদ্ধি প্রয়োজন, তা আমাদের মধ্যে অনেকাংশেই অনুপস্থিত।
ছোটবেলায় মা বলতেন, শুধু বেঁচে থাকার জন্য বেঁচে থাকার কোনো অর্থ নেই। জীবন হলো মানুষের সৃজনশীলতা, সৌন্দর্য ও সম্ভাবনার এক অপূর্ব ক্যানভাস। দুর্গাপুজোর ঢাকের শব্দে আজও মায়ের সেই কথাগুলো মনে পড়ে। মা শিখিয়েছেন, শক্তি মানে অন্যকে দখল করা কিংবা ধ্বংস করার ক্ষমতা নয়; শক্তি হলো ধর্ম, ন্যায় ও সত্যের ভিত্তিতে সঠিক চিন্তা ও কর্মের সামর্থ্য।
দুর্গাপুজোর পৌরাণিক কাহিনিতে দেবী দুর্গা নয় দিন–নয় রাত যুদ্ধ করে মহিষাসুরকে পরাস্ত করেন। বিজয়া দশমীতে সেই বিজয়ের আনন্দ উদ্যাপিত হয়। এই যুদ্ধের তাৎপর্য কেবল বাহ্যিক অশুভ শক্তির বিনাশে সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের অন্তরেও প্রতিনিয়ত শুভ ও অশুভের সংঘাত চলে। অহংকার, লোভ, অন্ধকার ও আত্মপ্রবঞ্চনার বিরুদ্ধে জয়ী হওয়াই প্রকৃত সাধনা।
আজ মাতৃশক্তির আরাধনা যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে। নারীকে সম্মান, ভালোবাসা ও মর্যাদা দেওয়া এবং পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে ন্যায় ও মানবিকতা প্রতিষ্ঠা করাই হোক দুর্গাপুজোর প্রকৃত শিক্ষা। ধর্মান্ধতা নয়, সত্য ও মানবকল্যাণের পথেই গড়ে উঠুক শান্তিময় পৃথিবী।
মা দুর্গা আমাদের অহংকার জয় করার শক্তি দিন, অন্তরের অন্ধকার দূর করুন এবং ভেতরের শত্রুর বিরুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার সাহস জোগান। দুর্গাপুজোর প্রার্থনা ধ্বনিত হোক সর্বত্র ‘রূপং দেহি, জয়ং দেহি, যশো দেহি, দ্বিষো জহি’। সবার দুর্গাপুজো আনন্দময় হোক।












