বাংলাদেশের বিভিন্ন কারাগারে বর্তমানে প্রায় ৩০০ শিশু তাদের বন্দি মায়ের সঙ্গে বসবাস করছে। এই শিশুদের কেউ কোনো অপরাধ করেনি। তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই, আদালতে বিচারও চলছে না। তবু জীবনের শুরুর কয়েকটি বছর কাটছে কারাগারের সীমানার মধ্যে। মায়ের সান্নিধ্যে থাকার প্রয়োজন এবং কারাগারের বাইরে স্বাভাবিক শৈশব পাওয়ার অধিকার–এই দুই বাস্তবতার মাঝখানে আটকে আছে তাদের জীবন।
গত ১২ অক্টোবর হাইকোর্টে জমা দেওয়া সমাজসেবা অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনে দেশের কারাগারগুলোতে বন্দি মায়েদের সঙ্গে প্রায় ৩০০ শিশুর অবস্থানের তথ্য উঠে এসেছে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের শিশু সুরক্ষা ইউনিট ও প্রবেশন শাখার যৌথভাবে প্রস্তুত করা প্রতিবেদনে শিশুদের সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনায় নিকটাত্মীয়ের তত্ত্বাবধান কিংবা সরকারি শিশু পরিবারে বিকল্প পরিচর্যার সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনটি একটি পুরোনো কিন্তু জটিল প্রশ্নকে আবার সামনে এনেছে। একজন নারী কারাবন্দি হলে তাঁর ছোট সন্তানের কী হবে? শিশুকে মায়ের সঙ্গে কারাগারে থাকতে দেওয়া হবে, নাকি মায়ের কাছ থেকে আলাদা করে বাইরে বড় হওয়ার ব্যবস্থা করা হবে? দুটির কোনোটিই সব শিশুর জন্য এককভাবে সঠিক সমাধান নয়। বাংলাদেশের কারাবিধি অনুযায়ী, নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত শিশুরা মায়ের সঙ্গে কারাগারে থাকতে পারে। সাধারণভাবে চার বছর পর্যন্ত থাকার বিধান রয়েছে; বিশেষ অনুমতিতে এই সময়সীমা ছয় বছর পর্যন্ত বাড়ানো যায়। ছয় বছর বয়সে পৌঁছানোর পর শিশুর বাইরে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হয়। কিন্তু বয়সের একটি সীমারেখা নির্ধারণ করলেই শিশুর মানসিক ও সামাজিক প্রয়োজনের সমাধান হয় না।
জীবনের প্রথম কয়েক বছর শিশুর বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ে মা কিংবা প্রধান পরিচর্যাকারীর সঙ্গে নিরাপদ সম্পর্ক, নিয়মিত আদর–যত্ন, খেলাধুলা, ভাষা শেখা এবং চারপাশের মানুষের সঙ্গে মেলামেশার মধ্য দিয়ে শিশুর সামাজিক ও মানসিক বিকাশ ঘটে। কারাগারের নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে এসব সুযোগ নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে যেখানে পর্যাপ্ত জায়গা, শিশুদের উপযোগী পরিবেশ বা প্রশিক্ষিত পরিচর্যাকারীর অভাব রয়েছে। অন্যদিকে মায়ের কাছ থেকে হঠাৎ বিচ্ছিন্ন করাও শিশুর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। যে শিশু জন্মের পর থেকে মায়ের সঙ্গেই রয়েছে, তাকে অপরিচিত পরিবেশে পাঠানো হলে নিরাপত্তাহীনতা ও বিচ্ছেদের কষ্ট তৈরি হতে পারে। শিশুর বয়স, মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক, পরিবারের অবস্থা এবং বিকল্প পরিচর্যার মান বিবেচনা না করে নেওয়া সিদ্ধান্ত তাই নতুন সংকটের জন্ম দিতে পারে।
এখানে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। কারাগারে থাকা সব নারী দন্ডপ্রাপ্ত নন। অনেকে বিচারাধীন মামলার আসামি। অর্থাৎ তাঁদের অপরাধ আদালতে এখনো প্রমাণিত হয়নি। বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা কিংবা জামিনসংক্রান্ত জটিলতার কারণে কোনো মা দীর্ঘদিন কারাগারে থাকলে তার প্রভাব সন্তানের জীবনেও পড়ে। বিশেষত ছোটখাটো বা অহিংস অপরাধের অভিযোগে আটক মায়েদের ক্ষেত্রে প্রচলিত কারাবাসের বিকল্প ব্যবস্থা বিবেচনার সুযোগ রয়েছে কি না, সেটিও আলোচনার দাবি রাখে।
জাতিসংঘের ২০১০ সালে গৃহীত ‘ব্যাংকক রুলস’ নারী বন্দিদের অধিকার এবং তাঁদের সঙ্গে থাকা শিশুদের সুরক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নির্দেশনা। এর ৪৯ নম্বর বিধিতে বলা হয়েছে, কোনো শিশুকে মায়ের সঙ্গে কারাগারে থাকতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হবে শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থের ভিত্তিতে। মায়ের সঙ্গে কারাগারে থাকা শিশুকে কখনো বন্দি হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। একই নির্দেশনার ৫১ নম্বর বিধিতে শিশুর নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা, বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে বিকাশ পর্যবেক্ষণ এবং কারাগারের বাইরের পরিবেশের যতটা সম্ভব কাছাকাছি পরিচর্যার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথা রয়েছে। ৫২ নম্বর বিধিতে মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করার সিদ্ধান্তও প্রতিটি শিশুর পরিস্থিতি অনুযায়ী নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিচ্ছেদের পরও মা ও সন্তানের যোগাযোগ বজায় রাখার সুযোগ রাখতে বলা হয়েছে।
বাংলাদেশে কারাগারের শিশুদের জন্য কিছু উদ্যোগ ইতিমধ্যে রয়েছে। কারা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, কয়েকটি কারাগারে ডে–কেয়ার কেন্দ্র চালু আছে। শিশুদের জন্য খেলনা, পোশাক, পুষ্টিকর খাবার ও প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থাও করা হয়। গত ১০ অক্টোবর বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, কারা অধিদপ্তর পর্যায়ক্রমে দেশের ৭৫টি কারাগারে ডে–কেয়ার কেন্দ্র স্থাপন, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ এবং নার্সের সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এসব উদ্যোগ প্রয়োজনীয়। কিন্তু শুধু ডে–কেয়ার কেন্দ্র স্থাপন করলেই শিশুবান্ধব পরিবেশ তৈরি হয় না। শিশুর নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, বয়স অনুযায়ী পুষ্টি, খোলা জায়গায় খেলাধুলা, প্রাক–প্রাথমিক শিক্ষা এবং মানসিক বিকাশের সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি শিশুর যত্নে নিয়োজিত কারাকর্মীদের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। কারাগারের বাইরে বিকল্প পরিচর্যার ব্যবস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সমাজসেবা অধিদপ্তর নিকটাত্মীয় বা সরকারি শিশু পরিবারে শিশুদের রাখার সুপারিশ করেছে। কিন্তু আত্মীয়ের কাছে পাঠালেই শিশু নিরাপদ থাকবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। পরিবারটির আর্থিক সামর্থ্য, শিশুর প্রতি আচরণ, নিরাপত্তা এবং মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার সুযোগ যাচাই করা প্রয়োজন। সরকারি শিশু পরিবারে রাখার ক্ষেত্রেও ব্যক্তিগত যত্ন ও মানসিক সহায়তার বিষয়টি গুরুত্ব পেতে হবে। কারাবন্দি মায়েদের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায় প্রায়ই একটি বিষয় আড়ালে থেকে যায়–সন্তানকে নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে মায়ের মতামত। একজন নারী কারাবন্দি হলেও তাঁর মাতৃত্বের অধিকার বিলুপ্ত হয় না। সন্তানের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তাঁকে অবহিত করা, তাঁর বক্তব্য শোনা এবং প্রয়োজনীয় আইনি ও সামাজিক সহায়তা দেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে মায়ের ইচ্ছার পাশাপাশি শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থকে সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে রাখতে হবে।
এ সমস্যার সমাধান তাই শুধু কারাগারের ভেতরে শিশুদের সুযোগ–সুবিধা বাড়ানো কিংবা তাদের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রয়োজন প্রতিটি মা ও শিশুর পরিস্থিতি আলাদাভাবে মূল্যায়ন, বিচারাধীন নারীদের মামলার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ, উপযুক্ত ক্ষেত্রে কারাবাসের বিকল্প ব্যবস্থা বিবেচনা এবং শিশুদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা পরিকল্পনা। একটি শিশুর শৈশব তার নিজের। মায়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ কিংবা মায়ের কারাদন্ডের কারণে সেই শৈশব সংকুচিত হওয়া অনিবার্য বলে মেনে নেওয়া যায় না। রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু শিশুকে বাঁচিয়ে রাখা নয়; তার বেড়ে ওঠার উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করাও।
কারাগারে থাকা প্রায় ৩০০ শিশুর সংখ্যাটি তাই কেবল একটি প্রশাসনিক পরিসংখ্যান নয়। এর পেছনে রয়েছে প্রায় ৩০০টি আলাদা জীবন, আলাদা প্রয়োজন এবং ভবিষ্যৎ। তাদের প্রত্যেকের জন্য এমন সিদ্ধান্ত প্রয়োজন, যেখানে মায়ের সান্নিধ্য এবং শিশুর স্বাধীন বিকাশ–কোনোটিকেই অগ্রাহ্য করা হবে না।












