ছোটবেলার দুর্গাপূজা: স্মৃতির রঙিন অ্যালবাম

পান্না দাশ | শনিবার , ১৭ অক্টোবর, ২০২৬ at ১০:৩৫ পূর্বাহ্ণ

শরৎ এলেই মনের আকাশে ভেসে ওঠে একরাশ সাদা মেঘ, শিউলির সুবাস, কাশফুলের দোলা আর ঢাকের সেই চিরচেনা আওয়াজ। মনে পড়ে ছোটবেলার দিনগুলোর কথা যখন শারদীয় দুর্গোৎসব মানেই ছিল আকাশসমান আনন্দ। আজ সময়ের স্রোতে অনেকটা পথ পেরিয়ে পেছন ফিরে তাকালে মনে হয়, ছোটবেলার দুর্গাপূজা যেন জীবনের এক রঙিন ছবির অ্যালবাম, যার রং আজও মলিন হয়নি; বরং স্মৃতিগুলো আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।

ছোটবেলায় পূজার অপেক্ষা শুরু হয়ে যেত অনেক আগে থেকেই। বাতাসে শিউলি ফুলের গন্ধ পেলেই মন বলে উঠত, পূজা আর দেরি নেই। কখন ষষ্ঠী আসবে, কখন নতুন জামা পরব, কখন ঠাকুর দেখতে যাব এই ভাবনাতেই কাটত দিন। নতুন জামা হাতে পাওয়ার পর কতবার যে তা খুলে দেখেছি, তার হিসাব নেই। সেই আনন্দের সঙ্গে আজকের অনেক প্রাপ্তির তুলনা চলে না। কারণ তখন অল্পতেই ছিল অপরিসীম সুখ, সামান্য পাওয়াতেই ছিল আকাশছোঁয়া উচ্ছ্বাস।

পূজার আগের দিনগুলোতে আত্মীয়স্বজনের আসা–যাওয়া, রান্নাঘরের নানা আয়োজন সব মিলিয়ে বাড়িটাই যেন হয়ে উঠত আনন্দের এক ছোট্ট পৃথিবী। আজও সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়লে মনে হয়, খাবারের স্বাদের চেয়েও বড় ছিল তার সঙ্গে মিশে থাকা মায়ের স্নেহ আর পরিবারের উষ্ণতা।

অপেক্ষার পালা শেষ করে যখন আসত প্রতীক্ষিত ষষ্ঠী, পাড়ার মণ্ডপে মণ্ডপে আলো জ্বলে উঠত, তখন শুরু হতো প্রতিমা দর্শনের জন্য আমাদের ছোটাছুটি। ঢাকের বাদ্যি, শঙ্খধ্বনি, ধূপের গন্ধ আর মণ্ডপের আলোর মধ্যে কী এক মায়াময় পরিবেশ তৈরি হতো, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। মনে হতো, পৃথিবীর সমস্ত দুঃখ যেন কিছুক্ষণের জন্য দূরে সরে গেছে।

পূজার দিনগুলোতে সময় যেন অন্য গতিতে চলত। অঞ্জলি দেওয়া, প্রসাদ নেওয়া, প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘুরে বেড়ানো, পরিচিতদের সঙ্গে দেখা হওয়া সবকিছুর মধ্যেই ছিল এক সহজ, অকৃত্রিম আনন্দ। আজকের মতো আধুনিক প্রযুক্তি কিংবা এত ঝলমলে আয়োজন হয়তো তখন ছিল না, কিন্তু মানুষের মধ্যে আন্তরিকতা ছিল অনেক নিবিড়। বয়স, সামর্থ্য কিংবা সামাজিক অবস্থানের পার্থক্য ভুলে সবাই যেন এক আনন্দের বন্ধনে আবদ্ধ হতো। সেই আনন্দের মধ্যেই প্রকাশ পেত বাঙালির চিরন্তন অসামপ্রদায়িক চেতনা।

সময় যতই বদলাক, ছোটবেলার সেই পূজার স্মৃতি আজও হৃদয়ের গভীরে অমলিন। কারণ সেই স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের শৈশব, পরিবার ও শিকড়। জীবনের ব্যস্ততা, দায়িত্ব আর সময়ের পরিবর্তনের মধ্যে আমরা ভুলে যাই, আনন্দের জন্য সব সময় বড় আয়োজনের প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন আপনজনের সান্নিধ্য, মানুষের প্রতি ভালোবাসা আর একসঙ্গে ভালো থাকার ইচ্ছা।

বিসর্জনের পর বাড়ি ফেরার পথে মনটা যখন ফাঁকা হয়ে যেত, ছোট্ট মনে তখন একটাই প্রশ্ন জাগত মা আবার কবে আসবেন? আজ বুঝি, বিদায় মানেই শেষ হয়ে যাওয়া নয়; বিদায়ের মধ্যেও থাকে ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি। তাই তো অপেক্ষার শেষে আবার শরৎ আসে, আবার কাশফুল দোলে, আবার শিউলি ঝরে, আবার আকাশে–বাতাসে বেজে ওঠে আগমনী সুর।

পূর্ববর্তী নিবন্ধশিল্পচর্চায় বেড়ে উঠুক শিশুরা
পরবর্তী নিবন্ধহৃদয়ে চিরজাগরুক শিল্পী আইয়ুব বাচ্চু